০৬:৩২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিমান হামলায় ৮৫ শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত করল মিয়ানমার উইটনেস, অভিযোগ তদন্তে এনইউজি অফশোর গ্যাস ও রুশ চুক্তিতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত জান্তার তহবিল বাড়বে, সতর্কতা কর্মীদের মার্কিন ক্রিপ্টো বিল হোঁচট খাওয়ায় সুযোগ দেখছে হংকং  গণতন্ত্র দিবসে সংলাপ ও স্বৈরশাসনের অবসান দাবি এনএলডির  নেপিদোয় জান্তার সঙ্গে আরসিএসএসের সংলাপ, প্রত্যাখ্যান চার সশস্ত্র গোষ্ঠীর দুইশো বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে সেমিকন ইন্ডিয়া উদ্বোধন করবেন মোদি চার বছরে নির্মিত পিংলু খাল চালু করল চীন, বদলে যাবে আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ ভারতে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি সরানোর আহ্বান পাকিস্তান হকি ফেডারেশনের জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসায় বসল থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া ইরানকে সমর্থনের পুনরাবৃত্তি চীনের, ইয়েমেনে সংকট ছড়ানো নিয়ে সতর্কতা

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের আয়ে নতুন গতি

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার খালবেষ্টিত কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভিমরুলী এলাকা বর্ষা এলেই রূপ নেয় এক অনন্য প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে। শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারা বাজার, বিস্তীর্ণ পেয়ারাবাগান এবং নৌকাভিত্তিক বেচাকেনার এই ব্যতিক্রমী পরিবেশ এখন শুধু কৃষির নয়, দেশীয় পর্যটনেরও অন্যতম আকর্ষণ। পর্যটকের আগমন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বেড়েছে, ফলে বদলে যাচ্ছে পুরো এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।

‘বাংলার আপেলের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পেয়ারা চাষের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভিমরুলী দেশের অন্যতম বৃহৎ পেয়ারা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যা স্থানীয় কৃষি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বর্ষায় জমে ওঠে ভাসমান বাজার

বাংলা শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে ভিমরুলীর বিখ্যাত ভাসমান বাজার হয়ে ওঠে এলাকার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। ভোর থেকেই কুড়িয়ানা, আটঘর, ভিমরুলী, জলাবাড়ি, ঢালহারসহ প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কৃষকেরা নৌকাভর্তি করে নিয়ে আসেন সদ্য তোলা পেয়ারা। এর পাশাপাশি আমড়া, লেবু, কলা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিসহ নানা কৃষিপণ্যও বাজারে আসে।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খালজুড়ে শত শত নৌকার ভিড়ে প্রাণ ফিরে পায় এই বাজার। পানির ওপর পরিচালিত এই ঐতিহ্যবাহী বেচাকেনা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে।

Covid-19 fallout: Floating guava market of Jhalakathi takes a dip in  pandemic

প্রকৃতি, কৃষি ও পর্যটনের অনন্য মিলন

খালের দুই পাশে সারি সারি পেয়ারাগাছ আর সবুজে ঘেরা জলপথ ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য তৈরি করেছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ছোট নৌকায় খালপথে ঘুরে বেড়ানো, বাগান থেকে সরাসরি তাজা পেয়ারা সংগ্রহ করা এবং পানির ওপর বসা ঐতিহ্যবাহী বাজার কাছ থেকে দেখার সুযোগ পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই এলাকার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশীয় পর্যটনের প্রসারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতি বর্ষায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ভিমরুলীর ভাসমান বাজার দেখতে আসছেন।

কৃষকের ভাগ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন

এক সময় ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক চরম হতাশায় পড়েছিলেন। লোকসানের কারণে কেউ কেউ নৌকাভর্তি পেয়ারা খালেই ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলেও স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে।

তবে সেই পরিস্থিতির এখন বড় পরিবর্তন এসেছে। পর্যটক বৃদ্ধি এবং এলাকার ব্যাপক পরিচিতি পেয়ারার চাহিদা বাড়িয়েছে। এর ফলে কৃষকেরা আগের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হয়েছে।

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজার দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরিত

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পেয়ারা চাষ করে আসা কৃষক সুধীর হালদার বলেন, পেয়ারা চাষই এই অঞ্চলের পরিচয় ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি। আরেক কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, আগে কম দামের কারণে কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তেন। এখন ভাসমান বাজারের পরিচিতি বেড়েছে, দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই এলাকার পরিচিতি বাড়িয়েছে। ফলে পেয়ারার চাহিদা ও দাম—দুটিই বেড়েছে।

ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতনতার আহ্বান

স্থানীয় বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র মণ্ডলের মতে, ভাসমান বাজার শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি কৃষি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক পটভূমির মানুষ একসঙ্গে কাজ করে স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন।

একই সঙ্গে এলাকাবাসী দর্শনার্থীদের প্রতি পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলার মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সবুজে ঘেরা কুড়িয়ানা ও ভিমরুলীর জলপথে ভ্রমণ শুধু মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতাই নয়, বরং কৃষি, নদীপথ এবং ঐতিহ্যনির্ভর শতবর্ষের গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

বিমান হামলায় ৮৫ শিশুর মৃত্যু নথিভুক্ত করল মিয়ানমার উইটনেস, অভিযোগ তদন্তে এনইউজি

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারে ফিরেছে প্রাণ, কৃষকের আয়ে নতুন গতি

০১:২৯:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার খালবেষ্টিত কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভিমরুলী এলাকা বর্ষা এলেই রূপ নেয় এক অনন্য প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে। শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারা বাজার, বিস্তীর্ণ পেয়ারাবাগান এবং নৌকাভিত্তিক বেচাকেনার এই ব্যতিক্রমী পরিবেশ এখন শুধু কৃষির নয়, দেশীয় পর্যটনেরও অন্যতম আকর্ষণ। পর্যটকের আগমন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয়ও বেড়েছে, ফলে বদলে যাচ্ছে পুরো এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।

‘বাংলার আপেলের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পেয়ারা চাষের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভিমরুলী দেশের অন্যতম বৃহৎ পেয়ারা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যা স্থানীয় কৃষি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বর্ষায় জমে ওঠে ভাসমান বাজার

বাংলা শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে ভিমরুলীর বিখ্যাত ভাসমান বাজার হয়ে ওঠে এলাকার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। ভোর থেকেই কুড়িয়ানা, আটঘর, ভিমরুলী, জলাবাড়ি, ঢালহারসহ প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কৃষকেরা নৌকাভর্তি করে নিয়ে আসেন সদ্য তোলা পেয়ারা। এর পাশাপাশি আমড়া, লেবু, কলা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিসহ নানা কৃষিপণ্যও বাজারে আসে।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খালজুড়ে শত শত নৌকার ভিড়ে প্রাণ ফিরে পায় এই বাজার। পানির ওপর পরিচালিত এই ঐতিহ্যবাহী বেচাকেনা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য চিত্র তুলে ধরে।

Covid-19 fallout: Floating guava market of Jhalakathi takes a dip in  pandemic

প্রকৃতি, কৃষি ও পর্যটনের অনন্য মিলন

খালের দুই পাশে সারি সারি পেয়ারাগাছ আর সবুজে ঘেরা জলপথ ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য তৈরি করেছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ছোট নৌকায় খালপথে ঘুরে বেড়ানো, বাগান থেকে সরাসরি তাজা পেয়ারা সংগ্রহ করা এবং পানির ওপর বসা ঐতিহ্যবাহী বাজার কাছ থেকে দেখার সুযোগ পর্যটকদের আকর্ষণ করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই এলাকার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশীয় পর্যটনের প্রসারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতি বর্ষায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ভিমরুলীর ভাসমান বাজার দেখতে আসছেন।

কৃষকের ভাগ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন

এক সময় ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক চরম হতাশায় পড়েছিলেন। লোকসানের কারণে কেউ কেউ নৌকাভর্তি পেয়ারা খালেই ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলেও স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে।

তবে সেই পরিস্থিতির এখন বড় পরিবর্তন এসেছে। পর্যটক বৃদ্ধি এবং এলাকার ব্যাপক পরিচিতি পেয়ারার চাহিদা বাড়িয়েছে। এর ফলে কৃষকেরা আগের তুলনায় ভালো দাম পাচ্ছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হয়েছে।

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজার দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখরিত

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পেয়ারা চাষ করে আসা কৃষক সুধীর হালদার বলেন, পেয়ারা চাষই এই অঞ্চলের পরিচয় ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি। আরেক কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, আগে কম দামের কারণে কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তেন। এখন ভাসমান বাজারের পরিচিতি বেড়েছে, দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই এলাকার পরিচিতি বাড়িয়েছে। ফলে পেয়ারার চাহিদা ও দাম—দুটিই বেড়েছে।

ঐতিহ্য রক্ষায় সচেতনতার আহ্বান

স্থানীয় বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র মণ্ডলের মতে, ভাসমান বাজার শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি কৃষি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সামাজিক পটভূমির মানুষ একসঙ্গে কাজ করে স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন।

একই সঙ্গে এলাকাবাসী দর্শনার্থীদের প্রতি পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলার মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সবুজে ঘেরা কুড়িয়ানা ও ভিমরুলীর জলপথে ভ্রমণ শুধু মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতাই নয়, বরং কৃষি, নদীপথ এবং ঐতিহ্যনির্ভর শতবর্ষের গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।