সন্তানকে শুধু নির্দেশ দিয়ে নয়, তার সঙ্গে কথা বলে, প্রশ্ন শুনে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত। তাঁর মতে, সময় বদলেছে, তাই পরিবারের সন্তান পালনের ধরনেও পরিবর্তন আনা জরুরি। আজকের তরুণেরা আদেশের চেয়ে আলোচনা ও যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
‘আজকের তরুণদের সঙ্গে আলোচনা দরকার’
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মোহন ভাগবত বলেন, বর্তমান সময়ে পরিবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করা। তাঁর ভাষায়, এখনকার তরুণদের সঙ্গে শুধু নির্দেশের ভাষায় কথা বললে হবে না; তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং মতের জায়গা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, একসময় পরিবারের বড়রা কোনো সিদ্ধান্ত দিলে সন্তানরা সাধারণত তা মেনে নিত। বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতার ওপর তাদের গভীর আস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের তথ্য, মতামত ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করছে এবং কোনো বিষয় জানতে চাইছে।

প্রশ্ন করাকে ভয় নয়, বোঝার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে
ভাগবতের মতে, তরুণদের প্রশ্ন করাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তাদের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে ভুল ধারণা দূর করার এবং সঠিক পথ দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আধুনিক গণমাধ্যম ও ভোগবাদী সংস্কৃতির নানা প্রভাব তরুণদের সামনে বিপুলসংখ্যক চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষা হাজির করছে। এসবের মধ্যে অনেক সময় তারা বিভ্রান্তও হয়ে পড়ে। পরিবারের দায়িত্ব হলো সেই বিভ্রান্তির মধ্যে তাদের সঠিক দিক খুঁজে পেতে সহায়তা করা।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু শাসন বা কর্তৃত্বের ওপর নির্ভর করলে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তাদের অনুভূতি, প্রশ্ন ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করাই এখন বেশি প্রয়োজন।
শুধু উপদেশ নয়, নিজেদের কাজেও উদাহরণ হতে হবে
মোহন ভাগবত আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্ম বাবা-মায়ের কথা শোনার পাশাপাশি তাদের কাজও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। ফলে শুধু ভালো কথা বললেই সন্তানকে প্রভাবিত করা সম্ভব নয়। বাবা-মা নিজেরা যা শেখান, তা নিজেদের জীবনেও অনুসরণ করছেন কি না, সেটিই সন্তানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অর্থাৎ সন্তানকে সততা, দায়িত্ববোধ বা মূল্যবোধের কথা বলার পাশাপাশি বাবা-মাকেও সেই মূল্যবোধ নিজেদের আচরণে দেখাতে হবে। কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকলে সন্তানের আস্থা তৈরি হয় এবং পারিবারিক বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়।
পরিবারে দরকার আস্থা ও আপন হওয়ার অনুভূতি
ভাগবতের মতে, সন্তানদের মধ্যে পরিবারের প্রতি গভীর আপন হওয়ার অনুভূতি তৈরি করা জরুরি। শুধু নিয়ম মানানো নয়, পরিবারের সদস্য হিসেবে তাদের মতামতের মূল্য রয়েছে—এমন বিশ্বাসও তাদের দিতে হবে।
তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে সন্তান পালনের ক্ষেত্রে আদেশের বদলে আলোচনা এবং একতরফা সিদ্ধান্তের বদলে পারস্পরিক সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে প্রজন্মের ব্যবধান কমবে এবং পরিবারে তৈরি হবে আরও স্বাভাবিক ও বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক।
পরিবারে সন্তান ও অভিভাবকের সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শাসনের বদলে বোঝাপড়া, নির্দেশের বদলে আলোচনা এবং কথার বদলে নিজেদের কাজের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে কার্যকর পথ—মোহন ভাগবতের বক্তব্যে এমন বার্তাই উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















