ফিলিপাইনের ছোট্ট শহর বামবানের একসময়কার মেয়র অ্যালিস গুয়োকে ঘিরে যে রহস্যের শুরু, তা শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে প্রতারণা, মানবপাচার, অবৈধ অনলাইন জুয়া, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির ভয়ংকর এক জালে। একসময় তাকে চীনের গুপ্তচর বলে সন্দেহ করা হলেও পরে সামনে আসে আরও অস্বস্তিকর এক চিত্র। তদন্তে উঠে আসে, তিনি এমন একটি চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেখানে প্রতারণার পাশাপাশি বিদেশি শ্রমিকদের আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
সাধারণ শহর থেকে হঠাৎ বদলে গেল বামবান
ম্যানিলার উত্তরে অবস্থিত বামবান প্রায় ৮০ হাজার মানুষের একটি সাধারণ শহর। কিন্তু অ্যালিস গুয়ো মেয়র হওয়ার পর শহরটির চেহারা দ্রুত বদলে যেতে থাকে। নতুন নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, জমি ও সম্পত্তির দাম বাড়ে এবং শহরের কেন্দ্রজুড়ে দেখা দিতে থাকে ঝকঝকে দোকানপাট।
গুয়ো নিজেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতেন। তার দাবি ছিল, পরিবারের শূকর খামারের ব্যবসায় যুক্ত থেকে তিনি পরে মাছ ও মুরগির খামারেও বিনিয়োগ করেন।
কিন্তু ২০২১ সালের দিকে তার জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন দেখা যায়। দামি গাড়ি, হেলিকপ্টারে ভ্রমণ এবং দ্রুত বাড়তে থাকা সম্পদ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। তিনি অবশ্য বলতেন, নতুন এক ব্যবসায়িক অংশীদারের মাধ্যমে তার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।
পরের বছর মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়ে গুয়ো বামবানের প্রথম নারী মেয়র হন।
‘কল সেন্টার’ আসলে ছিল প্রতারণার ঘাঁটি
মেয়র হওয়ার আগেই শহরের এক এলাকায় ৩৬টি আধুনিক ভবনের একটি বিশাল স্থাপনা তৈরি হয়। বাইরে থেকে সেটিকে কল সেন্টার বলা হলেও সেখানে ফোনে কাজ করার জন্য স্থানীয় কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিয়েতনামের এক তরুণ মিন দুক নুয়েন ওই স্থাপনা থেকে পালিয়ে গিয়ে বিষয়টি সামনে আনেন। চাকরির প্রলোভনে তাকে ফিলিপাইনে আনা হলেও সেখানে রান্নার কাজের বদলে তাকে একটি প্রতারণা চক্রে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে তার বক্তব্যে উঠে আসে।
নুয়েন জানান, কর্মীদের আটকে রাখা হতো এবং পালাতে চাইলে মারধর ও বৈদ্যুতিক নির্যাতন করা হতো। তার মতো আরও বহু বিদেশি সেখানে আটকে ছিলেন বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন।
তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে বড় চমক ছিল, স্থাপনাটি আসলে একটি বড় ধরনের অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র। সেখানে কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পরিচিতি তৈরির মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে বলা হতো। পরে ধীরে ধীরে তাদের বিনিয়োগের নামে অর্থ পাঠাতে প্ররোচিত করা হতো।
কোটি কোটি টাকার প্রতারণার ব্যবসা
এই ধরনের প্রতারণায় প্রথমে ভুক্তভোগীর সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রাখা হয়। বন্ধুত্ব বা প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে তার আস্থা অর্জন করা হয়। এরপর তাকে অনলাইন বিনিয়োগে অর্থ দেওয়ার জন্য রাজি করানো হয়। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীর সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে প্রতারকেরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এমন প্রতারণা কেন্দ্র ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে অনেক সময় ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে বিদেশিদের আনা হয়। পরে তাদের আটকে রেখে প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
বামবানের কেন্দ্রটিতেও এমন একটি কাঠামো কাজ করছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
অভিযানে বেরিয়ে আসে মেয়রের নাম
তদন্তকারীরা যখন স্থাপনাটিতে অভিযান চালান, তখন এর অনেক কর্মকর্তা পালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে কম্পিউটার, নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ রেখে যেতে বাধ্য হন তারা।
সেখানেই পাওয়া যায় অ্যালিস গুয়োর নাম-সংবলিত একাধিক নথি। তদন্তে আরও উঠে আসে, কেন্দ্রটি যে জমিতে গড়ে উঠেছিল তার একটি অংশের মালিকানায় গুয়োর সংশ্লিষ্টতা ছিল। যে প্রতিষ্ঠান ভবনগুলো ভাড়া দিয়েছিল, তার সঙ্গেও তার মালিকানাগত সম্পর্ক ছিল বলে তদন্তকারীরা জানান।
এমনকি ওই কেন্দ্রকে অনলাইন জুয়ার বৈধ অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়াতেও তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
তার ব্যাংক হিসাব ঘেঁটে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের তথ্যও সামনে আসে। এর মধ্যে চীনে বড় অঙ্কের অর্থ পাঠানোর তথ্য ছিল।
জন্মপরিচয় নিয়েও তৈরি হয় বড় প্রশ্ন
এরপর গুয়োর পারিবারিক পরিচয় নিয়ে তদন্ত শুরু হলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। সিনেটের তদন্তে তার জন্মনিবন্ধন ও পারিবারিক নথিতে অসংগতি পাওয়া যায়।
তদন্তকারীদের দাবি, ফিলিপাইনের নাগরিক হিসেবে যে জন্মনিবন্ধন তিনি ব্যবহার করতেন সেটি ভুয়া ছিল। প্রকৃতপক্ষে তিনি চীনের ফুজিয়ান প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ছোটবেলায় চীনা পাসপোর্টে বাবা-মায়ের সঙ্গে ফিলিপাইনে প্রবেশ করেন।
তার শৈশব ও পারিবারিক পরিচয় নিয়েও তিনি তদন্তকারীদের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ফলে তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
গুপ্তচর তত্ত্ব কতটা সত্য?
পরবর্তীতে অ্যালিস গুয়োকে চীনের গুপ্তচর হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এমন দাবিও ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি চীনা সরকারের হয়ে কাজ করতেন।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তিনি চীনে পালিয়ে না গিয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বিভিন্ন দেশে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া থেকে তাকে আটক করে ফিলিপাইনে ফেরত আনা হয়।
তদন্তকারীদের কাছে তাই প্রশ্নটি বদলে যায়—তিনি গুপ্তচর ছিলেন কি না, সেটির চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে ওঠে তিনি কার হয়ে কাজ করছিলেন এবং কীভাবে এত বড় একটি অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হলেন।
রাজনীতির সঙ্গে অপরাধী চক্রের যোগসূত্র
তদন্তকারীদের ধারণা, অ্যালিস গুয়ো একা এত বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে পারেননি। তার সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিদেশি ব্যবসায়ীদের একটি অংশের যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
শহরের মানুষের জন্য উপহার, খাবার, উৎসবের আয়োজন এবং ভ্রমণের ব্যবস্থা করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও কর্মকর্তাদেরও বিভিন্ন সময় ভ্রমণ ও অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এতে তার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগের পরও বামবানের একটি অংশের মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা পুরোপুরি কমেনি।
পুরোনো অনলাইন জুয়া নীতিই কি দরজা খুলেছিল?
ফিলিপাইনে অনলাইন জুয়া শিল্পকে বৈধতা দেওয়ার পর বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়ানোর আশা করা হয়েছিল।
কিন্তু তদন্তকারীদের মতে, এই খাতের কিছু অংশ দ্রুত অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অনলাইন জুয়ার অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রতারণা ও অর্থপাচারের মতো কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হতে থাকে।
অ্যালিস গুয়োর ঘটনায় সেই দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বড় ধরনের সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযান হলেও শেষ হয়নি বিপদ
বামবানের ওই স্থাপনায় অভিযানের সময় শ্রমিকদের থাকার ঘর ছাড়াও বিলাসবহুল বাড়ি, বড় সুইমিং পুল, দামি গাড়ি, বিলাসপণ্য এবং বিনোদনের নানা ব্যবস্থা পাওয়া যায়।
অভিযানের খবর পেয়ে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যান বলেও তদন্তে উঠে আসে। তার বিরুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রতারণা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এমন অনেক ব্যক্তি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেয়রের সাজা, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে
২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যালিস গুয়োকে প্রতারণা ও মানবপাচারে সহযোগিতার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত অন্যদের বড় অংশের বিরুদ্ধে একই মাত্রায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বামবানের পুরোনো পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তাদের সবাইকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়নি। অনেককে অন্যত্র বদলি করে পুনরায় দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে প্রতারণা কেন্দ্র বন্ধ করার পরও একই ধরনের অপরাধী চক্র ফিলিপাইনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন ঘাঁটি গড়ে তুলছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুধু একজন মেয়রের গল্প নয়
অ্যালিস গুয়োর ঘটনা শেষ পর্যন্ত শুধু একজন মেয়রের উত্থান-পতনের কাহিনি নয়। এটি দেখিয়েছে, অপরাধী চক্র যখন বিপুল অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারে, তখন একটি ছোট শহরের প্রশাসনও কীভাবে তাদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শুধু একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেই এমন নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক আশ্রয়, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, ভুয়া নথি তৈরির ব্যবস্থা এবং অর্থের প্রবাহ—সবকিছুর বিরুদ্ধে একসঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















