প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ও শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়মের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরও এই আন্দোলন থামছে না বলে জানিয়েছেন সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতির দিল্লি শাখার সম্পাদক নেহা। তাঁর দাবি, অনশন ছিল আত্মত্যাগের বিষয় নয়, বরং সরকারের কাছে সরাসরি রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ।
২৩ দিনের অনশন, পাশে ছিলেন ছয় শিক্ষার্থী
দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনের মূল মঞ্চ থেকে কিছুটা দূরে ছয়জন শিক্ষার্থী অনশনে বসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ১৮ জুলাই পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। ওই দিন পুলিশ আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও অনশনকারীরা অবস্থান চালিয়ে যান।
২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময়ও তাঁদের কয়েকজন আন্দোলনস্থলে ছিলেন। সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতির সদস্যরা টানা ২৩ দিন অনশন করেন। এ সময় চিকিৎসকেরা নিয়মিত তাঁদের রক্তচাপ মাপেন, হৃদ্যন্ত্রের পরীক্ষা করেন এবং রক্তের নমুনা নেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে একাধিক ছাত্র সংগঠন

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংগঠন ‘ককোরোচ জনতা পার্টি’র ডাকে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন আন্দোলনে যুক্ত হয়। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্র ফেডারেশন, সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশন এবং ক্রান্তিকারী যুব সংগঠনও এতে অংশ নেয়।
তবে নতুন সংগঠনটির রাজনৈতিক অবস্থান ও উদ্দেশ্য নিয়ে বামপন্থী মহলে শুরু থেকেই কিছুটা সংশয় ছিল। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, এটি হয়তো তরুণদের ক্ষোভকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
সতর্কতা থাকলেও আন্দোলনে যোগ দেয় আইসা
সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতির দিল্লি শাখার সম্পাদক নেহাও শুরুতে পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সংগঠনটি আন্দোলনে যুক্ত হয়। নেহার মতে, গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীরা পাশে থাকলে আন্দোলনের মূল দাবি অন্য কেউ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না।
তাঁর আরেকটি বড় প্রত্যাশা ছিল, এই আন্দোলনের মাধ্যমে এমন তরুণদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে, যারা দীর্ঘদিন ধরে শুধু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভাষাই শুনে এসেছে।
অনশনে ক্ষুধার চেয়ে মানুষের আবেগ বেশি স্পর্শ করেছে
২৩ দিনের অনশনে খাবার না থাকলেও মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের অভিজ্ঞতা নেহার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক মানুষ আন্দোলনস্থলে এসে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ তাঁকে অনশনে বসে থাকতে দেখে কেঁদেও ফেলেছেন।
বিশেষভাবে এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যায় শোকাহত এক বাবার কথা তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে। ওই বাবা নেহাকে জানিয়েছিলেন, তিনি আগে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সেই দলকে ভোট দিতে বলেছিলেন। সন্তানের মৃত্যুর পর তিনি নিজের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন।

‘এটি আত্মত্যাগ নয়, সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ’
নেহার বক্তব্য, অনশনকে নিছক আত্মত্যাগ হিসেবে দেখলে আন্দোলনের আসল উদ্দেশ্য বোঝা যাবে না। তাঁদের মূল প্রশ্ন ছিল—সরকার কি শিক্ষার্থীদের ধীরে ধীরে অনশনে দুর্বল হয়ে পড়তে দেবে, নাকি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মতো রাজনৈতিক দায় স্বীকার করতে বাধ্য হবে?
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে তিনি আন্দোলনের শেষ ফল হিসেবে দেখছেন না। বরং এটি আরও বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের শুরু হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
দিল্লির মঞ্চ শেষ, আন্দোলন নয়
নেহার দাবি, যন্তর মন্তরের নির্দিষ্ট কর্মসূচি শেষ হলেও আন্দোলন শেষ হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবি এখন দিল্লির বাইরে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে।
ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি আদর্শ এম সাজি জানিয়েছেন, তাঁদের সংগঠন এই আন্দোলনকে রাজধানীর বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ২৪টি রাজ্যে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
গণতান্ত্রিক পরিসর ফেরানোর দাবি
এই আন্দোলনকে শুধু প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন না বামপন্থী নেতারাও। তাঁদের বক্তব্য, এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অধিকার, স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক পরিসর পুনরুদ্ধারের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
রাজ্যসভার বামপন্থী নেতা জন ব্রিটাসের মতে, আন্দোলনটি শুধু স্লোগান বা একটি নির্দিষ্ট দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গত এক দশকের বেশি সময়ে যে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে, তা আবার ফিরিয়ে আনার বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই এই প্রতিবাদকে দেখা উচিত।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন তাই এখন শুধু একটি পরীক্ষা বা একটি মন্ত্রণালয়ের বিষয় হয়ে নেই। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ, সরকারের জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার—এই তিনটি প্রশ্নকে সামনে রেখে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















