শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করলেও ওডিশার রাজনীতিতে ধমেন্দ্র প্রধানের প্রভাব এখনো অটুট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। কথিত নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে গত ২৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়েন তিনি। তবে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিলেও বিজেপির রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্ব খুব সহজে কমছে না।
ধমেন্দ্র প্রধান ওডিশা থেকে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকা রাজনীতিকদের একজন। দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করার কারণে রাজ্য রাজনীতিতেও তাঁর প্রভাব তৈরি হয়েছে। তাঁর পদত্যাগকে সাময়িক রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন অনেকে। তবে এর মধ্যেই তিনি ওডিশার রাজনীতিতে অন্যতম ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে থেকে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পদ ছাড়লেও কমেনি রাজনৈতিক গুরুত্ব
ধমেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে, এখন তিনি শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে আগের মতো প্রভাব ধরে রাখতে পারবেন না। কারণ রাজনীতিতে সরকারি পদ অনেক সময় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলের অবস্থান ভিন্ন। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং ওডিশায় দলের সংগঠন শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা তাঁকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রেখেছে।
ওডিশা বিজেপিতে দীর্ঘদিনের শিকড়
ছাত্রজীবন থেকেই ধমেন্দ্র প্রধান বিজেপির আদর্শিক ও সাংগঠনিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা দেবেন্দ্র প্রধানও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড তাঁকে ওডিশার রাজনীতিতে পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।
২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর ধমেন্দ্র প্রধান জাতীয় রাজনীতিতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। অরুণ জেটলির মতো কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।
গত এক যুগে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির সংগঠনে তাঁর অবস্থান ক্রমেই শক্ত হয়েছে। ওডিশায় বিজেপির নির্বাচনী বিস্তারেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
নবীন পট্টনায়েকের দুর্গে বিজেপির উত্থান
২০১৭ সালের স্থানীয় নির্বাচন এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ধমেন্দ্র প্রধানের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিনের শক্তিশালী বিজু জনতা দল সরকারের বিরুদ্ধে বিজেপির অবস্থান শক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল নির্ধারকদের একজন ছিলেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অবশ্য বিজেপির প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। এরপর ধমেন্দ্র প্রধান জাতীয় রাজনীতিতেই বেশি মনোযোগী থাকেন।
মোহন চরণ মাঝি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্য সরকারের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড থেকে ধমেন্দ্র প্রধান নিজেকে অনেকটা দূরে রেখেছেন। কিন্তু রাজ্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর ঘনিষ্ঠদের উপস্থিতি তাঁর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

পদত্যাগের পরও বিজেপির শীর্ষ নেতাদের পাশে পাওয়া
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদ ছাড়ার পরও বিজেপির শীর্ষ নেতাদের আচরণ ধমেন্দ্র প্রধানের গুরুত্বের ইঙ্গিত দিয়েছে। দলের একাধিক শীর্ষ নেতা তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
সংসদে সোমবার তাঁর আগমনেও বিজেপি ও জোটের সংসদ সদস্যদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ছিল উল্লেখযোগ্য। সমর্থকেরা তাঁর নামে স্লোগান দেন। এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, বিজেপি তাঁকে প্রশ্নপত্র ফাঁস বিতর্কের দায়ে রাজনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখছে না; বরং পরিস্থিতির কারণে পদ হারানো একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার অবস্থানেই দেখছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ওডিশার নতুন মুখ কে
ধমেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ফলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ওডিশার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা খালি হয়েছে। এই পদে কারা আসতে পারেন, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিজেপির সহসভাপতি ও কেন্দ্রাপাড়া আসনের সংসদ সদস্য বৈজয়ন্ত পাণ্ডা, রাজ্যসভার সদস্য সুজিত কুমার এবং রাজ্য বিজেপির সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য মনমোহন সামালের নাম সম্ভাব্যদের তালিকায় আলোচনায় রয়েছে।
তবে নতুন মন্ত্রী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ধমেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয় নির্বাচনেই হবে আসল পরীক্ষা
ওডিশায় ধমেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা অটুট রয়েছে, তার বড় পরীক্ষা হতে পারে আগামী বছরের পঞ্চায়েত ও পৌর নির্বাচন। ২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে বিজু জনতা দল বড় সাফল্য পেয়েছিল। ফলে এবার বিজেপির মোহন চরণ মাঝি সরকারের সামনে জয় নিশ্চিত করার বড় চাপ রয়েছে।
আগামী নির্বাচনে বিজেপি ভালো ফল করতে না পারলে রাজ্য নেতৃত্বের জন্য তা বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হবে। সেই পরিস্থিতিতে ধমেন্দ্র প্রধানের নির্বাচনী কৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতার ওপর আবারও দলের নির্ভরতা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব হারানো ধমেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক যাত্রায় সাময়িক ধাক্কা হলেও ওডিশায় তাঁর প্রভাব শেষ হয়ে গেছে—এমনটা বলার সময় এখনো আসেনি। বরং আগামী দিনের মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন এবং স্থানীয় নির্বাচনই দেখিয়ে দেবে, বিজেপির রাজনীতিতে তাঁর ক্ষমতার পরিধি কতটা অটুট রয়েছে।
পদত্যাগের পরও ওডিশার বিজেপি রাজনীতিতে ধমেন্দ্র প্রধানের প্রভাব অটুট রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















