ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত জোড্রেল ব্যাংক মানমন্দির এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা কার্যক্রম বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে ২০২৮ সালের মার্চের পর জোড্রেল ব্যাংকসহ সাতটি দূরবীক্ষণযন্ত্রের সমন্বিত গবেষণা নেটওয়ার্কের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা খাতে একের পর এক অর্থছাঁটাইয়ে ব্রিটেন থেকে মেধাবী পদার্থবিজ্ঞানীদের বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
মহাকাশ গবেষণায় ঐতিহাসিক জোড্রেল ব্যাংক
১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে পদার্থবিজ্ঞানী বার্নার্ড লাভেল চেশায়ারের গ্রামাঞ্চলে মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সামরিক বাহিনীর পুরোনো রাডার ব্যবহার করে তিনি উল্কাপাতের সময় আয়নিত কণার তৈরি সংকেত শনাক্ত করেন। সেখান থেকেই জোড্রেল ব্যাংকে বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথচলা শুরু হয়।
১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশযান স্পুটনিক উৎক্ষেপণের সময় জোড্রেল ব্যাংকের লাভেল দূরবীক্ষণযন্ত্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেতার দূরবীক্ষণযন্ত্রগুলোর একটি ছিল। ওই সময় সোভিয়েত উপগ্রহটির গতিপথ অনুসরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘ কয়েক দশকের উন্নয়নের পরও জোড্রেল ব্যাংক বিশ্বমানের গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে। এটি যুক্তরাজ্যের জাতীয় বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞান সক্ষমতার কেন্দ্রীয় অংশ এবং সাতটি দূরবীক্ষণযন্ত্র নিয়ে গঠিত একটি বৃহৎ গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
২০২৮ সাল থেকে বন্ধ হতে পারে পর্যবেক্ষণ
ব্রিটেনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা অর্থের সংকট সামাল দিতে ২০২৮ সালের মার্চ থেকে জোড্রেল ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা নেটওয়ার্কে অর্থায়ন বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে। বিকল্প অর্থের ব্যবস্থা না হলে এরপর মহাকাশ পর্যবেক্ষণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেতার জ্যোতির্বিজ্ঞানকে শুধু দুর্বোধ্য বা সীমিত পরিসরের গবেষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দ্রুত ঘূর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্র, অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে ঘূর্ণায়মান পদার্থ এবং মহাবিস্ফোরণের পর মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া ক্ষীণ বিকিরণের তথ্য পেয়েছেন। এসব গবেষণা মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে আরও গভীর করেছে।
একের পর এক গবেষণা প্রকল্পে কাটছাঁট
জোড্রেল ব্যাংকের পাশাপাশি ব্রিটিশ গবেষকদের অংশগ্রহণ থাকা আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পেও অর্থ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিলিতে থাকা রুবিন মানমন্দিরের দীর্ঘমেয়াদি মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণ প্রকল্পে ব্রিটেনের অংশগ্রহণ ২০ শতাংশ কমে যাবে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের লা পালমায় থাকা একটি মানমন্দিরেও ব্রিটিশ গবেষণার অংশ কমছে। সূর্য পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কের কাজে অর্থায়ন কমবে ৪০ শতাংশ। এমনকি কৃষ্ণগহ্বরের প্রথম ছবি ধারণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখা ইভেন্ট হরাইজন দূরবীক্ষণ প্রকল্প থেকেও ব্রিটেন সরে যাওয়ার পথে রয়েছে।
অর্থ সংকটে চাপ বাড়ছে বিজ্ঞান খাতে
ব্রিটেনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের প্রায় ১৬ কোটি ২০ লাখ পাউন্ড সাশ্রয় করতে হবে। বিদ্যুতের দাম ও কর্মীদের ব্যয় বৃদ্ধি, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতায় মুদ্রার বিনিময় হারজনিত অতিরিক্ত ব্যয় এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
তবে সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। সরকারের সর্বশেষ ব্যয় পর্যালোচনার সময়কালে চার বছরে বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৬৮ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পদার্থবিজ্ঞানের অন্য গবেষণাতেও সংকট
শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞান নয়, পদার্থবিজ্ঞানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাও অর্থ সংকটের ধাক্কা সামলাচ্ছে। অক্সফোর্ডশায়ারের ডায়মন্ড সিনক্রোট্রন এবং আইসিস মিউন ও নিউট্রন গবেষণা কেন্দ্র অর্থছাঁটাইয়ের মুখে পড়লেও চালু থাকবে।
অন্যদিকে চেশায়ারের ক্লারা গবেষণা কেন্দ্র, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কণাত্বরক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হয়, কার্যক্রম স্থগিত করার পথে। ব্রিটেনের একমাত্র গভীর ভূগর্ভস্থ বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র বাউলবি খনির পরিচালন ব্যয়ও ৪০ শতাংশ কমানো হচ্ছে।
এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম বড় কণাত্বরক গবেষণা প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষার জন্য অর্থায়ন না থাকায় সেটি নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
মেধাবী বিজ্ঞানীদের দেশ ছাড়ার আশঙ্কা
অর্থ সংকটের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে মানবসম্পদে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ক্যারিয়ারের শুরুর পর্যায়ে থাকা প্রায় ৮০ শতাংশ পদার্থবিজ্ঞানী অর্থায়ন সংকটের কারণে ব্রিটেন ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
বিজ্ঞানীরা সাধারণত যেখানে উন্নত গবেষণার সুযোগ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং আধুনিক অবকাঠামো পান, সেখানেই কাজ করতে আগ্রহী হন। ফলে দীর্ঘদিনের গবেষণা অবকাঠামো দুর্বল হলে শুধু কয়েকটি প্রকল্প নয়, পুরো ব্রিটিশ বিজ্ঞানব্যবস্থাই দক্ষ গবেষক হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গবেষণায় অর্থছাঁটাইয়ের তাৎক্ষণিক সাশ্রয় ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। জোড্রেল ব্যাংকের মতো ঐতিহাসিক গবেষণাকেন্দ্র রক্ষা এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের দেশে ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখন ব্রিটেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ববিজ্ঞান ও জাতীয় অর্থনীতিতে গবেষণার অবদান বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত না এলে ব্রিটেনের পদার্থবিজ্ঞান গবেষণায় মেধা ও নেতৃত্বের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
বিশ্বখ্যাত জোড্রেল ব্যাংক বন্ধের শঙ্কায় ব্রিটেনের মহাকাশ গবেষণা ও পদার্থবিজ্ঞান খাত বড় সংকটে পড়েছে। অর্থছাঁটাইয়ে বিজ্ঞানীদের দেশ ছাড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















