হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই গুরুতর আহত রোগীর শরীরে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা আরও সহজ করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ। এ উদ্যোগের আওতায় সামরিক বাহিনীর সদস্য, তাদের পরিবারের সদস্য ও অবসরপ্রাপ্তদের জরুরি চিকিৎসায় রক্ত দেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা অর্থ পরিশোধ করা হবে।
পাঁচ বছর মেয়াদি এই পরীক্ষামূলক কর্মসূচি আগামী জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে অনুমোদিত স্থল ও আকাশ অ্যাম্বুলেন্স সেবাদাতারা চিকিৎসাগতভাবে প্রয়োজনীয় পুরো রক্ত অথবা রক্তের বিভিন্ন উপাদান রোগীকে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ পাবেন।
যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন উদ্যোগ
ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চিকিৎসাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আক্রান্ত রোগীর জন্য যত দ্রুত সম্ভব রক্ত পৌঁছে দেওয়া জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যুদ্ধের সময় আহত সেনাদের হাসপাতালে নেওয়ার পথে হেলিকপ্টারে রক্ত দেওয়া হয়েছে। দুর্গম ঘাঁটিতেও আগে থেকে রক্ত মজুত রাখা হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনের সময় আহত সহযোদ্ধাকে রক্ত দিতে চিকিৎসাগতভাবে পরীক্ষা করা সেনাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে রক্ত সংগ্রহের ব্যবস্থাও চালু ছিল।
এই অভিজ্ঞতা থেকে সামরিক চিকিৎসকেরা বুঝেছেন, গুরুতর আহত মানুষের জন্য রক্ত শুধু হাসপাতালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। রোগীর যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই দ্রুত রক্ত পৌঁছানো দরকার।
হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রক্ত দেওয়ার সুফল
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শরীর থেকে দ্রুত রক্তের পরিমাণ কমে গেলে শুধু লবণাক্ত তরল দেওয়ায় পরিস্থিতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া যায় না। এতে শরীরে রক্তের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও অক্সিজেন বহন ও রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা যথেষ্ট ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
সামরিক চিকিৎসায় দ্রুত রক্ত দেওয়ার ফলে আহতদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অথবা আহত হওয়ার পরপরই রক্ত পাওয়া রোগীদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার হার তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।
চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা, গুলিবিদ্ধ হওয়া কিংবা অন্য কোনো কারণে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হলে হাসপাতালের পথে রক্ত দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই জীবন রক্ষাকারী হতে পারে।
গ্রামাঞ্চলে বেশি কাজে আসতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রে এখনো বেশিরভাগ অ্যাম্বুলেন্সে রক্ত থাকে না। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে থাকা অনেক রোগী গুরুত্বপূর্ণ সময় হারান। দূরবর্তী ও গ্রামীণ এলাকায় সমস্যা আরও বেশি, কারণ এসব অঞ্চলের রোগীদের অনেক সময় রক্ত মজুত থাকা হাসপাতালে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে।
শুধু দুর্ঘটনায় আহত রোগী নয়, প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অস্ত্রোপচারের পর রক্তপাত কিংবা পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের মতো ঘটনাতেও হাসপাতালে যাওয়ার আগেই রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থের অভাব বড় বাধা
যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকশ অ্যাম্বুলেন্স সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থায় রোগীকে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে দেশটির হাজার হাজার জরুরি চিকিৎসা সেবার তুলনায় এ সংখ্যা এখনো খুবই কম।
এর অন্যতম কারণ অর্থায়ন। অ্যাম্বুলেন্সে রক্ত রাখার জন্য বিশেষ সংরক্ষণব্যবস্থা, তাপমাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা, রক্তের নিরাপদ ব্যবহার এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। অথচ প্রচলিত অর্থ পরিশোধব্যবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সকে মূলত রোগী পরিবহনের সেবা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে রক্ত দেওয়ার মতো চিকিৎসা কার্যক্রমের পুরো খরচ সবসময় ফেরত পাওয়া যায় না।
নতুন কর্মসূচিতে রক্ত দেওয়ার জন্য আলাদা অর্থ পরিশোধের বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রক্ত সংরক্ষণেও বড় প্রস্তুতি প্রয়োজন
অ্যাম্বুলেন্সে রক্ত রাখা মানেই শুধু রক্তের ব্যাগ সঙ্গে বহন করা নয়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রক্ত সংরক্ষণ ও নিয়মিত তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে হয়। অ্যাম্বুলেন্সকর্মীদের রক্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ, বহন ও রোগীর শরীরে প্রয়োগের প্রশিক্ষণও দরকার।
রক্ত নষ্ট হওয়া ঠেকাতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স সেবাদাতাদের মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি। কোনো অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রক্ত ব্যবহার না হলে সেটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাসপাতালে ফিরিয়ে এনে অন্য রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
জাতীয় চিকিৎসাব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে
এই পরীক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে দেখা হবে, অ্যাম্বুলেন্সে রক্ত দেওয়ার জন্য আলাদা অর্থ পরিশোধ করলে রোগীর বেঁচে থাকার হার বাড়ে কি না, চিকিৎসার মোট ব্যয় কমে কি না এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রক্ত পাওয়ার সুযোগ কতটা বাড়ানো যায়।
পরীক্ষাটি সফল হলে ভবিষ্যতে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থায় একই ধরনের অর্থ পরিশোধের নীতি চালুর পথ খুলতে পারে। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাপদ্ধতি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, গুরুতর রক্তক্ষরণে আক্রান্ত একজন রোগীর জন্য কয়েক মিনিটও গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে পৌঁছানোর অপেক্ষা না করে যদি প্রয়োজনের মুহূর্তেই রক্ত দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকেই আরও বাস্তব করার চেষ্টা করছে।
অ্যাম্বুলেন্সে রক্ত দেওয়ার এই উদ্যোগ সফল হলে জরুরি চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি এই ব্যবস্থা বেসামরিক মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
রক্তের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা, অ্যাম্বুলেন্সে নিরাপদ সংরক্ষণ এবং সঠিক অর্থায়ন—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে হাসপাতালের দরজায় পৌঁছানোর আগেই আরও অনেক সংকটাপন্ন রোগীকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রক্ত দেওয়ার উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নতুন কর্মসূচি সফল হলে দ্রুত রক্ত সঞ্চালনের সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















