রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, মারধর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
গ্রেপ্তার দুই শিক্ষার্থী হলেন ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আনাস ও মাহমুদুল হাসান। নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আগে করা একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
চিকিৎসাধীন দুই শিক্ষার্থী
মঙ্গলবার সকালে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. গোলাম কবির দুই শিক্ষার্থীর গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসা শেষে তাদের আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া নেওয়া হবে।
অভিযোগ থেকে সংঘর্ষের শুরু
ঘটনার সূত্রপাত সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী মোহসিন আলমকে ঘিরে। এক সহপাঠী তার প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর তাকে হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে রোববার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন।
ওই বৈঠকে মোহসিনের পক্ষে আনাস, মাহমুদুল ও আরেক শিক্ষার্থী হাসিব উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ অস্বীকার করা নিয়ে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
পরদিন প্রক্টর কার্যালয়ে আবার বৈঠক বসে। সেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী নেতা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ করেন। মোবাইল ফোনে কিছু ছবি দেখিয়ে তার সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়। এরপর আনাসকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রক্টর কার্যালয় থেকে গ্রন্থাগারে উত্তেজনা
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রক্টরিয়াল বডি পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে সবাইকে চলে যেতে বলেছিল। পরে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ভবনের কাছে আম্মার ও তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বিএম নাজমুস সাকিবের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে সাকিব আহত হন।
এরপর ওই তিন শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের কাছে গেলে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তারা পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা পাঠকক্ষে ঢুকে তাদের মারধর করেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের থামাতে গেলে তারাও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে শিক্ষক, প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি
ঘটনার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও ছাত্রশিবিরের কর্মীরা প্রশাসন ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি ছিল, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যদিকে, ছাত্রদল গ্রন্থাগারের ভেতরে হামলার প্রতিবাদে পৃথক মিছিল করে।
শিক্ষার্থীদের একটি জোটও প্রক্টর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে মারধরের ঘটনাকে ‘গণপিটুনি’ হিসেবে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে প্রকাশ্যে কাউকে মারধর করা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে। একই সঙ্গে তারা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা ব্যক্তি এবং হামলায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পুরো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জৈবরসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। সংঘর্ষের আগে ও পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যাচাই করে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করতে কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহিংসতা বন্ধ ও শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক করার বিষয়ে প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার ও ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন; হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় চলছে তদন্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















