পাখি দেখা ও চেনার পুরোনো শখে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। পাখির ছবি, ডাক কিংবা গানের শব্দ শুনেই কোন প্রজাতির পাখি তা শনাক্ত করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিভিন্ন অ্যাপ। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাখি দেখা ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।
ছোটবেলা থেকেই পাখি দেখার অভ্যাস ছিল ২৬ বছর বয়সী মেগান সজটাকের। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে বেড়ে ওঠা মেগান দাদার কাছ থেকে পাওয়া দূরবীন দিয়ে পাখি শনাক্ত করার চেষ্টা করতেন। এখন সেই অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুঠোফোনের অ্যাপ।
পাখির ডাকেই মিলছে পরিচয়
পাখি শনাক্ত করার জনপ্রিয় অ্যাপগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘মার্লিন বার্ড আইডি’। ছবি, পাখির ডাক কিংবা গানের শব্দ বিশ্লেষণ করে অ্যাপটি সম্ভাব্য প্রজাতির নাম জানিয়ে দেয়।
অ্যাপটির যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় এক যুগ আগে। তখন ছবি দেখে মাত্র ২৮৫টি সাধারণ প্রজাতির পাখি শনাক্ত করতে পারত এটি। প্রযুক্তির উন্নতি ও বিশ্বজুড়ে পাখিপ্রেমীদের পাঠানো বিপুল তথ্যের কারণে এখন প্রায় ১১ হাজার প্রজাতির পাখি শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরেই অ্যাপটি এক কোটির বেশি বার নামানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও শনাক্তকরণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে।
তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে
পাখি দেখার এই নতুন ঢেউয়ে তরুণদের উপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা ও উন্মুক্ত স্থানে তরুণদের পাখি দেখতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাখি দেখার ছবি, ভিডিও ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার কারণে এই আগ্রহ আরও ছড়িয়ে পড়ছে।
মেগানের মতো অনেকেই বলছেন, প্রযুক্তি পাখি দেখার জগতকে আরও সহজ ও সবার জন্য উন্মুক্ত করেছে। আগে পাখি চেনার জন্য দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন বলে মনে করা হলেও এখন একটি মুঠোফোন দিয়েই নতুনরা সেই জগতে প্রবেশ করতে পারছেন।
অ্যাপকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে স্মৃতির ভান্ডার
পাখি শনাক্ত করার পাশাপাশি এসব অ্যাপ অনেকের কাছে ব্যক্তিগত স্মৃতি সংরক্ষণের মাধ্যম হয়ে উঠছে। পাখি দেখার পর ছবি তোলা, ভিডিও তৈরি করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করছেন তরুণরা।
মেগানের মতে, পাখি দেখার সময় ছবি বা ভিডিও তৈরির অভ্যাস তাকে আরও মনোযোগী করে তুলেছে। আশপাশের প্রকৃতিকে একটু ধীরগতিতে দেখা এবং ছোট ছোট বিষয় খেয়াল করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এর মাধ্যমে।
তবে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে সতর্কতাও রয়েছে। অভিজ্ঞ পাখিপ্রেমী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কেউ কেউ মনে করেন, অ্যাপ সব সময় সঠিকভাবে পাখি শনাক্ত করতে পারে না। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ বা আনুষ্ঠানিক পাখি দেখার তথ্য নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু অ্যাপের ফলাফলের ওপর নির্ভর না করাই ভালো।
পাখি শনাক্তকরণে নতুন ধারণা
এই প্রযুক্তির জনপ্রিয়তা দেখে নতুন ধরনের অ্যাপও তৈরি হচ্ছে। এমন একটি অ্যাপ পাখি শনাক্ত করাকে খেলাধুলার মতো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সেখানে শনাক্ত করা পাখির জন্য ভার্চুয়াল কার্ড পাওয়া যায়। পাখির ছবি বা শব্দের মান, প্রজাতির বিরলতা এবং শনাক্তকরণের ধরন অনুযায়ী কার্ডের বৈশিষ্ট্য বদলে যায়।
এর নির্মাতাদের লক্ষ্য, পাখি দেখার সঙ্গে খেলাধুলার আনন্দ যুক্ত করা। বিরল পাখি খুঁজে পাওয়ার উত্তেজনা যেমন তরুণদের আকৃষ্ট করে, তেমনি প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগও তৈরি করে।
প্রযুক্তি যখন সংরক্ষণের হাতিয়ার
পাখি শনাক্ত করার প্রযুক্তি শুধু বিনোদন নয়, প্রকৃতি সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিরল প্রজাতির পাখির অবস্থান যাতে অতিরিক্তভাবে প্রকাশ না পায়, সে জন্য কিছু অ্যাপে সংবেদনশীল সময়ে নির্দিষ্ট স্থান গোপন রাখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে শনাক্ত করা পাখির তথ্য জীববৈচিত্র্য সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডারে যুক্ত করার উদ্যোগও রয়েছে। ফলে একজন সাধারণ মানুষ শখের বশে পাখি দেখতে গিয়ে যে তথ্য সংগ্রহ করছেন, সেটিও ভবিষ্যতে গবেষণা ও সংরক্ষণ কাজে ব্যবহার হতে পারে।
প্রকৃতির সঙ্গে প্রযুক্তির নতুন সেতু
পাখি দেখা একসময় বিশেষজ্ঞ বা দীর্ঘদিনের শখিনদের কাজ হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রযুক্তি সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। ছবি ও শব্দ বিশ্লেষণকারী অ্যাপ নতুনদের ভয় কাটিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকাতে উৎসাহিত করছে।
বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্যও এখন প্রযুক্তিকে আরও সহজ, আনন্দদায়ক ও ব্যবহারবান্ধব করে তোলা। কারণ একটি পাখির ডাক শুনে তার পরিচয় জানতে গিয়ে যদি একজন তরুণ প্রকৃতির প্রতি আরও আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তাহলে সেই কৌতূহলই ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য রক্ষার বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
পাখি শনাক্ত করার প্রযুক্তি তাই শুধু একটি মুঠোফোনের সুবিধা নয়; এটি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক গড়ে তোলার এক নতুন দরজাও খুলে দিচ্ছে।
পাখি শনাক্তকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপ তরুণদের প্রকৃতি ও পাখি দেখার আগ্রহ বাড়াচ্ছে। ছবি ও ডাক থেকেই মিলছে পাখির পরিচয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















