২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যায়নি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্র খুলনা বেতার। সীমিত আকারে সংবাদ ও বিশেষ দিনের কিছু অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হলেও অধিকাংশ সময় ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠানই প্রচার করা হচ্ছে। এর ফলে বেতারের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২ হাজার ৩০০ শিল্পী ও কলাকুশলী দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচার চালুর দাবিতে শিল্পী-কলাকুশলীরা মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। কবে নাগাদ কেন্দ্রটি সম্পূর্ণভাবে সচল হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত স্টুডিও ও যন্ত্রপাতি
একসময় যেখানে নিয়মিত অনুষ্ঠান, রেকর্ডিং ও শিল্পীদের আনাগোনায় মুখর ছিল খুলনা বেতার, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতচিহ্ন এখনো বহন করছে স্টুডিও ভবন, রেকর্ডিং কক্ষ, ট্রান্সমিশন কক্ষ, আর্কাইভ ও মাস্টার কন্ট্রোল রুম। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতির বড় অংশ অচল হয়ে পড়ে আছে এবং ভবনের বিভিন্ন স্থানে আগাছা ও ধ্বংসাবশেষের চিত্র স্পষ্ট।
খুলনা বেতারের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিনের হামলা ও অগ্নিসংযোগে ১০০ কোটির টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে ৫৪ বছরের সংরক্ষিত নথিপত্র ও মূল্যবান আর্কাইভ ধ্বংস হয়ে যায়।
শিল্পীদের জীবিকায় বড় সংকট
বর্তমানে স্থানীয় চারটি সংবাদ, বিশেষ দিবসের সীমিত কিছু অনুষ্ঠান এবং বাকি সময় ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বেতারের সঙ্গে যুক্ত নাট্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী, বাচিকশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, সংবাদপাঠক, ঘোষক ও অনুবাদকসহ প্রায় ২ হাজার ৩০০ কলাকুশলী আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
খুলনা বেতারের অ্যানাউনসার তানিয়া সুলতানা জানান, আগে বেতার থেকে যে আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চালাতে সহায়তা মিলত। কিন্তু দীর্ঘদিন কেন্দ্রটি প্রায় স্থবির থাকায় শিল্পীরা কঠিন সময় পার করছেন।
অবিলম্বে চালুর দাবি
খুলনা বেতার শিল্পী সারথির সদস্যসচিব এস এম ইকবাল হাসান তুহিন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র বেতার কেন্দ্রটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা এবং শিল্পী-কলাকুশলীদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় বহু শিল্পী ও তাদের পরিবার চরম দুর্ভোগে রয়েছে।
খুলনা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, গত দুই বছর ধরে নতুন শিল্পীদের অডিশন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঘোষক, নাট্যশিল্পী কিংবা অন্যান্য কলাকুশলীদের নিয়মিত কার্যক্রমও বন্ধ থাকায় তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
পুনর্গঠনের অপেক্ষায় প্রকল্প
খুলনা বেতারের পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন জানান, হামলায় মেশিন, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো মিলিয়ে ১০০ কোটির টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। কেন্দ্রটি পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, নতুন যন্ত্রপাতি সংগ্রহসহ একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিললেই পুনর্গঠনের কাজ শুরু করা হবে।
বাংলাদেশ বেতারের প্রধান প্রকৌশলী মুনীর আহমেদ জানান, খুলনা বেতারের ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক। মূল ভবন অক্ষত রেখে নতুন করে ৪০০ ফুট উচ্চতার একটি টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















