ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দিতে গিয়ে চীন এখন নতুন এক বিপদের মুখোমুখি। দুর্যোগের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি হচ্ছে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য। এসব কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চীনে ঝড়, বন্যা ও উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়িয়েছে। কোথাও বন্যার পানিতে মরদেহ ভেসে থাকার ভুয়া দৃশ্য, কোথাও এমন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার ছবি দেখানো হয়েছে যেখানে বাস্তবে তেমন কোনো পরিস্থিতিই ছিল না। এমনকি উদ্ধারকাজ নিয়েও তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ভিডিও।
দুর্যোগের সময় বাড়ছে আতঙ্ক
দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মিথ্যা খবর ছড়িয়ে পড়ায় কোনো কোনো এলাকায় মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জরুরি পণ্য কিনতে ছুটেছেন। এতে আতঙ্ক আরও বেড়েছে এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি এলাকায় বন্যার সময় একটি প্রজনন খামার থেকে শত শত সাপ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা সত্য হলেও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নদীতে কুমির ছেড়ে দেওয়ার ভুয়া ছবি ছড়িয়ে পড়ে। বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কৃত্রিমভাবে বানানো মিথ্যা দৃশ্য জুড়ে দেওয়ায় কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা—তা বোঝা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

অনুসারী ও দর্শক বাড়াতেই ভুয়া তথ্য
দুর্যোগ নিয়ে অতিরঞ্জিত ও চাঞ্চল্যকর তথ্য ছড়ানোর পেছনে বিভিন্ন উদ্দেশ্য কাজ করছে। কেউ বেশি দর্শক ও অনুসারী পেতে এমন ভিডিও তৈরি করছেন, কেউ আবার নিছক বিনোদনের জন্য ভুয়া দৃশ্য বানাচ্ছেন। এর বাইরে ইচ্ছাকৃতভাবে আতঙ্ক বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টাও রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে এসব ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। বিশেষ প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়াই এখন লেখা, ছবি, শব্দ ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বিশ্বাসযোগ্য দেখতে মিথ্যা কনটেন্ট তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে।
ভুয়া ভিডিও ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে চীন
ভুয়া দুর্যোগের খবর ও ভিডিও তৈরির অভিযোগে চীনে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার ও শাস্তির ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগের ধরন ও ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী আটক, জরিমানা থেকে শুরু করে কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।
দুর্যোগকেন্দ্রিক ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযানও জোরদার করা হয়েছে। বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগ নিয়ে বানানো তথ্য, ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পাদিত ছবি-ভিডিও, সাজানো দৃশ্য, পুরোনো ঘটনার সঙ্গে নতুন ঘটনার মিথ্যা সংযোগ এবং সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিষয়গুলো নজরদারিতে আনা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকেও নিজেদের প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত কনটেন্ট আরও কঠোরভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রযুক্তির চেয়ে দ্রুত ছড়াচ্ছে মিথ্যা তথ্য
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভুয়া তথ্য তৈরির গতি এখন তা শনাক্ত করার প্রযুক্তির চেয়ে বেশি। ফলে কোনো ভিডিও সত্য কি না, শুধু প্রযুক্তির সাহায্যে মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিত হওয়া সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে।
ছবি বা ভিডিওর সঙ্গে স্থান ও সময়ের তথ্য মিলিয়ে দেখা, ছবির মূল উৎস যাচাই করা এবং ঘটনার বাস্তব অবস্থার সঙ্গে কনটেন্টের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি তথ্য নিয়েও তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট
ভুয়া তথ্য ঠেকানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো সরকারি তথ্যের ওপর মানুষের আস্থা। অতীতে চীনের কিছু এলাকায় দুর্যোগের প্রকৃত পরিস্থিতি ছোট করে দেখানো বা তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি ঘোষণার প্রতি মানুষের আস্থায় ফাঁক তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি একটি বাঁধের বড় ধরনের ক্ষতিকে তুলনামূলক কম ভয়াবহ শব্দে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবাহিত হয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর আগে অন্য একটি প্রদেশেও মৃত্যুর সংখ্যা গোপন বা কম দেখানোর অভিযোগে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি তথ্যের ওপর আস্থার ঘাটতি থাকলে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সুযোগ আরও বাড়ে।

সামনে আরও বড় ঝুঁকির আশঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নত হচ্ছে, ভুয়া তথ্যের পরিমাণ ও ছড়িয়ে পড়ার গতি—দুটিই বাড়তে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি নির্বাচন, জনস্বাস্থ্য সংকট, যুদ্ধ এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিষয়গুলোতেও এর অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। সরকার, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষকে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
দুর্যোগের সময় অচেনা উৎসের কোনো ছবি বা ভিডিও দেখেই বিশ্বাস না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। যাচাই করা সরকারি ঘোষণা ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই হতে পারে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















