দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারমন্ত্রী জং সুং-হো শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, তাঁর পদত্যাগ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। তবে এখনই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর সময় হয়নি বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বিচারব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কার যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই বিচারমন্ত্রীর পদ ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাতীয় পরিষদের আইন ও বিচারবিষয়ক কমিটির বৈঠকে সোমবার এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন জং সুং-হো।
স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি
জং সুং-হো জানান, কয়েক মাস ধরে তিনি গুরুতর ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন। এর পাশাপাশি আরও কিছু ব্যক্তিগত সমস্যা রয়েছে, যেগুলো এই মুহূর্তে প্রকাশ করতে চান না।
তিনি বলেন, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে তিনি আলোচনা করছেন। তবে এসব আলোচনার অর্থ এই নয় যে এখনই তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।
বিচারমন্ত্রী বলেন, প্রসিকিউশন সংস্কার কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর ব্যক্তিগত মত হলো, নতুন ব্যবস্থার জন্য বিচার মন্ত্রণালয়েও নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হতে পারে।
বড় পরিবর্তনের মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারব্যবস্থা
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতাসীন গণতান্ত্রিক দল বর্তমানে বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মাধ্যমে প্রসিকিউটরদের অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা পুরোপুরি তুলে দিয়ে তাদের মূলত অভিযোগপত্র দাখিলের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংস্কারপন্থীদের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত ও অভিযোগ গঠনের ক্ষমতা একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় প্রসিকিউশন অতিরিক্ত ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল। এর ফলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে তাদের অভিযোগ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অক্টোবরের মধ্যে প্রসিকিউশন ব্যবস্থাকে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর একটি হবে নতুন পাবলিক প্রসিকিউশন সার্ভিস এবং অন্যটি গুরুতর অপরাধ তদন্ত সংস্থা।
এখনই পদত্যাগ নয়, বললেন মন্ত্রী
জাতীয় পরিষদের বৈঠকে ক্ষমতাসীন দলের পাঁচবারের সংসদ সদস্য পার্ক জি-ওন জং সুং-হোর কাছে তাঁর পদত্যাগের বিষয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের কথা জানতে চান।
জবাবে বিচারমন্ত্রী বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কথা বলার উপযুক্ত সময় নয়। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট লি যখন বিদেশ সফরে গিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় উন্নয়নের জন্য বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করছেন, তখন তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা যেন মূল বিষয়কে আড়াল না করে।
তিনি আরও জানান, গত জুনে প্রসিকিউটরদের তদন্তের ক্ষমতা পুরোপুরি বাতিলের পরিকল্পনা ঘোষণার আগেও তিনি পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করেছিলেন। তবে বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কারণে বিষয়টি নিয়ে তিনি বিভিন্ন দিক থেকে ভাবছেন।
পদ ছাড়লে সংসদ সদস্য পদও ছাড়ার দাবি
বিরোধী পক্ষ থেকেও জং সুং-হোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক প্রসিকিউটর ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হান ডং-হুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, স্বাস্থ্যগত কারণে যদি বিচারমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা কঠিন হওয়ার কথা।
তিনি মনে করেন, মন্ত্রীর পদ ছাড়ার পাশাপাশি সংসদ সদস্য পদ থেকেও সরে দাঁড়ালেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের যুক্তি আরও গ্রহণযোগ্য হবে।
অন্যদিকে বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির সংসদ সদস্য ইউন সাং-হিয়ন বৈঠকে জং সুং-হোকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি পদত্যাগের খবর অস্বীকার করছেন? জবাবে বিচারমন্ত্রী সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানাননি। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব তাঁর ওপর রয়েছে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করছেন।
সংস্কারের মাঝেই নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা
জং সুং-হোর সম্ভাব্য পদত্যাগের আলোচনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার বিচারব্যবস্থা বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। ফলে বিচারমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত দেশটির চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকেও জং সুং-হো আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
জাতীয় পরিষদের আইন ও বিচারবিষয়ক কমিটির সোমবারের বৈঠকটি ছিল বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির বর্জন শেষ করার পর প্রথম বৈঠক। ফলে বিচারমন্ত্রীর স্বাস্থ্য ও সম্ভাব্য পদত্যাগের পাশাপাশি এই বৈঠক দক্ষিণ কোরিয়ার চলমান বিচার সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েনেরও নতুন ইঙ্গিত দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















