বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা জরুরি হলেও সেই বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচার মানদণ্ড মেনে হতে হবে। অন্যথায় ন্যায়বিচারের পরিবর্তে বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
সংস্থাটির সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে তদন্তের মান, সাক্ষ্যগ্রহণের পদ্ধতি, দীর্ঘ প্রাক-বিচার আটক, অনুপস্থিতিতে বিচার এবং আসামিপক্ষের অধিকার নিয়ে একাধিক উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এইচআরডব্লিউ মনে করিয়ে দিয়েছে, অতীতেও এই ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায্য বিচার নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
কেন আবার বিতর্ক?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দমনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আইসিটিতে একের পর এক মামলা চলছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এসব গুরুতর অপরাধের বিচার হওয়া অপরিহার্য। তবে বিচারপ্রক্রিয়া যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ না করে, তাহলে ভবিষ্যতে রায়ের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংস্থার এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীর ভাষায়, বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি, যাতে দুর্বল তদন্ত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের সুযোগ না থাকে।
এইচআরডব্লিউ কী কী উদ্বেগ তুলেছে?

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগের:
- একাধিক মামলায় পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপনের আগেই গ্রেফতার ও দীর্ঘ হেফাজত।
- কিছু সাক্ষ্যবিবরণীতে অভিন্ন ভাষার ব্যবহার, যা সাক্ষ্যের স্বতন্ত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
- আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার অভিযোগ।
- আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা।
- বিচার শুরুর আগেই উচ্চতর আদালতে কার্যকর প্রতিকার চাওয়ার সীমিত সুযোগ।
- অনুপস্থিতিতে বিচার পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুরক্ষার অভাব।
এইচআরডব্লিউর মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধের মতো গুরুতর মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া শুধু ন্যায্য হলেই হবে না, সেটি ন্যায্য বলে প্রতীয়মান হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে আপত্তি
এইচআরডব্লিউ সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), আর্টিকেল ১৯সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে আইসিটির তদন্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়।
তাদের যুক্তি, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনায় সংবাদ পরিবেশন বা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আইসিটির পটভূমি

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১০ সালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এর আওতা সম্প্রসারিত হয় এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট অভিযোগও এই ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন হয়।
আইন সংশোধনের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন আনা হলেও এইচআরডব্লিউর দাবি, এখনও আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান, অনুপস্থিতিতে বিচার এবং প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ভিত্তিতে স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির সুপারিশ করেছিল। একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিচার পরিচালনার গুরুত্বও তুলে ধরে।
এইচআরডব্লিউও একই অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, গুরুতর অপরাধের দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি সেই বিচার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী?
সাম্প্রতিক অভিযোগপত্রে রাজনীতিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং দুই সাংবাদিকসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে আইসিটির বিচারপ্রক্রিয়া দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়েই নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচার শুধু অতীতের জবাবদিহির প্রশ্ন নয়; বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং আইনের শাসনের ভবিষ্যৎও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই কারণে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















