গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র একটি শিক্ষা পেয়েছে—বৃহৎ আকারে সেনা মোতায়েন করে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়ানো রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল, অর্থনৈতিকভাবে ক্লান্তিকর এবং কৌশলগতভাবে অনিশ্চিত। আফগানিস্তান ও ইরাক সেই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধ থেকে সরে আসা মানেই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা নয়। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলো দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, যেখানে যুদ্ধ করছে তার মিত্ররা, কিন্তু সেই যুদ্ধের আর্থিক, সামরিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক বোঝার বড় অংশ বহন করছে ওয়াশিংটন।
এই নতুন বাস্তবতা শুধু সামরিক সহায়তার প্রশ্ন নয়; এটি প্রভাব, নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বের প্রশ্নও। যখন একটি রাষ্ট্র অন্য একটি দেশের যুদ্ধকে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, অর্থ এবং কূটনৈতিক ছাতার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখে, তখন সেই যুদ্ধের গতিপথ থেকে নিজেকে আলাদা রাখা আর সম্ভব হয় না। অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, যুদ্ধের খরচ বহন করলেও যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে কিংবা কখন শেষ হবে—সে সিদ্ধান্তের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অনেক সময়ই সীমিত থাকে।
এটাই আজকের আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
যুদ্ধ শুরুতে প্রভাব থাকে, পরে থাকে শুধু দায়
যুদ্ধের শুরুতে আক্রান্ত রাষ্ট্র সাধারণত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে এবং শক্তিশালী মিত্রের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তেই সহায়তাদানকারী রাষ্ট্রের হাতে সবচেয়ে বেশি কূটনৈতিক প্রভাব থাকে। যুদ্ধের লক্ষ্য কী হবে, সাফল্যের মানদণ্ড কী, আলোচনার পথ কোথায় খোলা থাকবে কিংবা বেসামরিক জনগণকে রক্ষার জন্য কী ধরনের নীতি অনুসরণ করা হবে—এসব বিষয়ে তখনই সমঝোতা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়েই কঠিন রাজনৈতিক আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়। কারণ, আক্রমণের শিকার মিত্রের কাছে শর্ত আরোপ অনেকের কাছে নৈতিকভাবে অস্বস্তিকর মনে হয়। ফলে প্রাথমিক সমর্থন হয়ে ওঠে প্রায় নিঃশর্ত।
এই সিদ্ধান্তের মূল্য পরে দিতে হয়।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়, মিত্র দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য তত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তখন বাইরের পরামর্শ আর নির্দেশ হিসেবে নয়, বরং হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। যে প্রভাব যুদ্ধের শুরুতে ব্যবহার করা যেত, তা পরে অনেকটাই হারিয়ে যায়।
ইউক্রেন, গাজা এবং ইয়েমেন—তিনটি ভিন্ন যুদ্ধ, একই শিক্ষা

সাম্প্রতিক তিনটি সংঘাত এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে।
ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু কিয়েভের যুদ্ধের লক্ষ্য এবং ওয়াশিংটনের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য সবসময় এক ছিল না। ইউক্রেন তার হারানো প্রতিটি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, ন্যাটোর ঐক্য বজায় রাখা এবং সরাসরি মার্কিন-রুশ সংঘর্ষ এড়াতে চেয়েছে। এই পার্থক্য শুরুতেই স্পষ্ট রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ পায়নি।
গাজায়ও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। হামাসকে দুর্বল করা, যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা, মানবিক সহায়তা এবং সামরিক অভিযানের সীমা—এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ক্রমেই প্রকট হয়েছে। ওয়াশিংটন বিপুল সহায়তা দিলেও ইসরায়েলের সামরিক কৌশল পুরোপুরি নিজের পছন্দমতো পরিচালনা করাতে পারেনি।
ইয়েমেনে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। যুদ্ধের সূচনায় দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের রূপরেখা ছাড়া সামরিক সমর্থন বাড়তে বাড়তে সংঘাত বছরের পর বছর চলেছে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামেনি, বরং সংশ্লিষ্ট অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।
তিনটি যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি অভিন্ন সত্য স্পষ্ট হয়েছে—অস্ত্র সরবরাহ করা সহজ, কিন্তু যুদ্ধের সমাপ্তি নিশ্চিত করা অনেক কঠিন।
দেশের ভেতরের রাজনীতিও যুদ্ধের অংশ
বিদেশের যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ধীরে ধীরে সহায়তাদানকারী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে।
প্রথম দিকে জনসমর্থন সাধারণত শক্তিশালী থাকে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ক্লান্তি আসে। ব্যয় বাড়ে। মানবিক ক্ষয়ক্ষতির ছবি জনমত বদলে দেয়। বিরোধী দল প্রশ্ন তোলে। সংসদে বিতর্ক শুরু হয়। অর্থ বরাদ্দ কঠিন হয়ে ওঠে।
এর ফলে সরকার একদিকে মিত্র দেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে নিজের দেশের ভোটারদের উদ্বেগও সামলাতে বাধ্য হয়।
এই দুই চাপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই এমন অবস্থায় পৌঁছে যান, যেখানে তাদের কাছে আর কার্যকর চাপ প্রয়োগের মতো রাজনৈতিক পুঁজি অবশিষ্ট থাকে না।
মিত্র মানেই নিয়ন্ত্রিত অংশীদার নয়
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় ভুল ধারণা হলো—যে দেশ সবচেয়ে বেশি সহায়তা দেয়, সিদ্ধান্তও সেই দেশ নেয়।
বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
যে রাষ্ট্র যুদ্ধ করছে, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মূল্য তাকেই দিতে হয়। তাই তার রাজনৈতিক হিসাব, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অভ্যন্তরীণ চাপ বাইরের পরামর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। শক্তিশালী নেতারা প্রায়ই আন্তর্জাতিক জনমত, প্রবাসী গোষ্ঠী, আইনসভা কিংবা সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেন।
ফলে সহায়তাদানকারী রাষ্ট্র অর্থ ও অস্ত্র দিলেও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
এখানেই তৈরি হয় এক ধরনের বৈপরীত্য—দায়িত্ব বাড়ে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে।
শুধু যুদ্ধ নয়, শান্তির পরিকল্পনাও শুরুতেই দরকার
বেশির ভাগ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু শেষ করার পরিকল্পনা থাকে না।
সামরিক অভিযান কীভাবে চলবে, তা নিয়ে বিস্তর প্রস্তুতি থাকে। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী প্রশাসন, রাজনৈতিক সমঝোতা, পুনর্গঠন, নিরাপত্তা কাঠামো কিংবা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার রূপরেখা অনেক সময়ই অস্পষ্ট থাকে।
ফলে সামরিক সাফল্য রাজনৈতিক সমাধানে রূপ নেয় না।
যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটাই ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থায় পরিণত হয়।
এই কারণেই যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই কেবল বিজয়ের নয়, সমাপ্তির রূপরেখাও নির্ধারণ করা জরুরি।

শর্তহীন সহায়তা নয়, কৌশলগত অংশীদারত্ব
কোনো মিত্রকে সহায়তা দেওয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রয়োজনীয়। কিন্তু সহায়তা যদি সুস্পষ্ট কৌশল, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়া দেওয়া হয়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত সহায়তাদানকারী রাষ্ট্রকেই নতুন সংকটে ফেলে।
সহযোগিতার ভিত্তি হওয়া উচিত যৌথ লক্ষ্য, নিয়মিত কৌশলগত পর্যালোচনা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার এবং যুদ্ধের পাশাপাশি শান্তির প্রস্তুতি। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের সঙ্গেও কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে হবে। কারণ কোনো সংঘাতের স্থায়ী সমাধান কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না; শেষ পর্যন্ত তা আলোচনার টেবিলেই গিয়ে থামে।
নতুন যুগের “চিরস্থায়ী যুদ্ধ”
আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো যুদ্ধ হয়তো আর আগের রূপে ফিরে আসবে না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের যুগ পেরিয়ে এসেছে। বরং নতুন যুগে তার সেনারা হয়তো সবসময় যুদ্ধক্ষেত্রে থাকবে না, কিন্তু তার অস্ত্র, অর্থ, গোয়েন্দা সহায়তা এবং কূটনৈতিক প্রভাব থাকবে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যুদ্ধ কীভাবে শুরু হবে, তা নয়; বরং যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে।
যদি ওয়াশিংটন শুরুতেই নিজের কৌশল, সীমা এবং প্রত্যাশা স্পষ্ট না করে, তাহলে মিত্রের যুদ্ধ ধীরে ধীরে তার নিজের রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হবে। আর সেই সংকটের শেষ হবে না বিজয়ে, বরং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা, ক্ষয় এবং ক্রমহ্রাসমান প্রভাবের মধ্য দিয়ে।
বিদেশনীতি তখন আর শুধু মিত্রকে রক্ষা করার প্রকল্প থাকবে না; তা হয়ে উঠবে এমন এক অন্তহীন দায়, যার ভার বহন করবে যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু যার পরিণতি নির্ধারণ করবে অন্যরা।
ডাফনা এইচ. র্যান্ড 


















