কাশ্মীরের পাহেলগামে ২০২৫ সালের সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। এরপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মঞ্চে পাকিস্তান বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করে, যেন নদীর পানি প্রবাহকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু এই বিতর্কের মূল্যায়নে আবেগের চেয়ে ইতিহাস, প্রকৌশলগত বাস্তবতা এবং পানি ব্যবস্থাপনার তথ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিভাজনের উত্তরাধিকার
দেশভাগের পর অবিভক্ত পাঞ্জাবের সেচব্যবস্থা দুই দেশে ভাগ হয়ে যায়। বহু কার্যকর অবকাঠামো পাকিস্তানের অংশে থেকে গেলেও ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবকে নতুন বাস্তবতায় নিজস্ব কৃষি ও সেচব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়। ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে উভয় পক্ষ একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় পৌঁছালেও পরবর্তী চুক্তি নিয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে ভারত নিজের স্থাপনা ব্যবহারের বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
পরে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাবি করে যে ভারত নাকি সব নদীর পানি বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সময় ভারতের কাছে এমন কোনো অবকাঠামোই ছিল না, যার মাধ্যমে সিন্ধু অববাহিকার বিশাল নদীগুলোর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ বা সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো। তবু এই বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করে এবং পরবর্তী সময়ে সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে জনমনে একটি বিশেষ ধারণা তৈরি হয়।

চুক্তির ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন
সিন্ধু পানি চুক্তির অধীনে রাভি, বেয়াস ও শতদ্রুর পানি ব্যবহারের একচ্ছত্র অধিকার পায় ভারত, আর সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের মূল প্রবাহ পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হয়। এর ফলে মোট পানির বড় অংশ পাকিস্তানের হাতে যায়, যদিও অববাহিকার উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতের ভেতরেও বিস্তৃত।
এই ব্যবস্থাকে অনেকেই রাজনৈতিক সমঝোতার সফল উদাহরণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, বাস্তবে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ও অববাহিকার অংশীদারিত্বের তুলনায় পানি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। স্বাধীনতার পর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি সম্প্রসারণ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণে ভারতের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে বলে তারা দাবি করেন।
পানি সংকটের বড় কারণ কি শুধুই প্রতিবেশী?
সিন্ধু অববাহিকা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে—নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনায় পাকিস্তান কতটা কার্যকর?
ভারতের সমালোচকদের বক্তব্য, পাকিস্তানে বিপুল পরিমাণ পানি সাগরে গিয়ে অপচয় হয়। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত সেচব্যবস্থা, অরক্ষিত খাল এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে আরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ভারতের জন্য নির্ধারিত পানির একটি অংশ ভৌগোলিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও পাকিস্তানের দিকেই প্রবাহিত হয়।
এই বাস্তবতা ইঙ্গিত করে যে সীমান্তপারের অভিযোগের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পানি সংকটের সব দায় প্রতিবেশীর ওপর চাপালে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না।
আন্তর্জাতিক প্রচারণা বনাম বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তান সিন্ধু পানি ইস্যুকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কোথাও এটিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আবার কোথাও সীমান্তবর্তী নদীকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
একই সময়ে পাকিস্তানের কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক বক্তব্যে ভারতীয় অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার হুমকিও উচ্চারিত হয়েছে। এমন ভাষা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তোলে এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায়। নদী ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য কোনো পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।
ভবিষ্যতের পথ
সিন্ধু অববাহিকার পানি নিয়ে বিরোধের স্থায়ী সমাধান রাজনৈতিক প্রচারণায় নয়, বরং তথ্যনির্ভর সংলাপ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনায় নিহিত। যে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সময়ের সঙ্গে পুনর্মূল্যায়নের দাবি তুলতে পারে, কিন্তু সেই আলোচনা হওয়া উচিত বাস্তব তথ্য ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।
দক্ষিণ এশিয়ায় পানি আগামী দশকগুলোর অন্যতম কৌশলগত সম্পদ। তাই উসকানিমূলক বক্তব্য, অতিরঞ্জিত অভিযোগ কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাজনৈতিক প্রচারণার পরিবর্তে উভয় দেশেরই উচিত নিজেদের পানি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ নদী সীমান্ত মানে না; কিন্তু অবিশ্বাস যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে সেই নদী শান্তির সেতুর বদলে সংঘাতের নতুন রেখা হয়ে উঠতে পারে।
দেবেন্দ্র কুমার শর্মা 


















