মালয়েশিয়ার রাজনীতিকে বোঝার জন্য প্রচলিত ‘সরকার বনাম বিরোধী দল’ কিংবা ‘মিত্র বনাম প্রতিপক্ষ’—এই সরল বিভাজন এখন আর যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একই দল একদিকে ক্ষমতার অংশীদার, অন্যদিকে নির্বাচনী মাঠে কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বী। আজকের সহযোগী আগামীকালের প্রতিপক্ষ, আবার নির্বাচন শেষে সেই প্রতিপক্ষই ফিরে আসে একই মন্ত্রিসভায়।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘রাজনৈতিক বন্ধু-শত্রু’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ এমন সম্পর্ক, যেখানে দলগুলো আদর্শগত ঘনিষ্ঠতার কারণে নয়, বরং ক্ষমতার সমীকরণ, নির্বাচনী হিসাব এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনের তাগিদে একে অপরের সঙ্গে হাত মেলায়। সেই প্রয়োজন শেষ হলেই জোটের জায়গা নেয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
মালয়েশিয়ার বর্তমান জাতীয় রাজনীতিতে এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় বারিসান ন্যাশনাল ও পাকাতান হারাপানের সম্পর্কের মধ্যে। কেন্দ্রীয় সরকারে তারা একই জোটের অংশ। রাষ্ট্র পরিচালনা, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব—সবকিছুতেই তারা একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু রাজ্য নির্বাচনে পৌঁছাতেই সেই সহযোগিতার চিত্র পাল্টে যায়। একই মন্ত্রিসভার সদস্যরা নির্বাচনী প্রচারণায় একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় নামেন, যেন তারা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

প্রথম দর্শনে এটি পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। বহুদলীয় ও বিভক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা অর্জন কিংবা ধরে রাখার জন্য দলগুলোকে এমন সমঝোতায় যেতে হচ্ছে, যা অতীতে অকল্পনীয় ছিল।
ইউএমএনও ও পাসের সম্পর্ক এই পরিবর্তনের আরও জটিল উদাহরণ। দীর্ঘ সময় ধরে দুটি দলই মালয়-মুসলিম ভোটব্যাংকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। তারা একই ভোটারের সমর্থন চেয়েছে, একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে এবং নির্বাচনে সরাসরি প্রতিযোগিতা করেছে।
কিন্তু ২০২০ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর হঠাৎই পরিস্থিতি বদলে যায়। ক্ষমতার নতুন সমীকরণে তারা একই কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ হয়ে ওঠে। তখন মনে হয়েছিল, পুরোনো বৈরিতা হয়তো ইতিহাস হয়ে যাবে। কিন্তু সেই ধারণা খুব বেশি দিন টেকেনি। ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেই আসন বণ্টন এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে সম্পর্ক আবার ভেঙে পড়ে। নির্বাচনী মাঠে তারা আবার মুখোমুখি দাঁড়ায়।
অথচ এখানেই গল্পের শেষ নয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে আবারও দেখা গেছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষ একে অপরকে কৌশলগত সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কোথাও ভোট ভাগাভাগি এড়াতে সমঝোতা, কোথাও প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঠেকাতে পরোক্ষ সহযোগিতা—সব মিলিয়ে রাজনীতির প্রচলিত সংজ্ঞাগুলো ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সাধারণ ভোটারের জন্য এই দৃশ্য বিভ্রান্তিকর হওয়াই স্বাভাবিক। নির্বাচনের সময় যাদের ভাষণে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর আক্রমণ শোনা যায়, সংসদের বিরতিতে তারাই আবার একই টেবিলে বসে আলাপ করেন। বাইরে সংঘাত, ভেতরে যোগাযোগ—এটাই আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, আমরা এখনো রাজনীতিকে ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা স্থায়ী বন্ধুত্বের চোখে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেক বেশি ব্যবহারিক। বিরোধিতা সব সময় ব্যক্তিগত বৈরিতা নয়, আবার ক্ষমতার অংশীদার হওয়াও স্থায়ী রাজনৈতিক আস্থার প্রমাণ নয়।
এই অস্পষ্টতার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যেও কৌশলগত সংকট তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে পাকাতান ও ইউএমএনওর বর্তমান সম্পর্ককে ধরা যায়। শুরু থেকেই যদি উভয় পক্ষ স্পষ্টভাবে জানাত যে এটি দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক জোট নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য সীমিত সময়ের সমঝোতা, তাহলে হয়তো বর্তমান বিভ্রান্তি অনেকটাই কমে যেত।
বাস্তবে তা না হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারে একসঙ্গে থাকার পাশাপাশি রাজ্য পর্যায়ে আলাদা লড়াই চালানোর দ্বৈত কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে। ইউএমএনওকে তার নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তিকে সন্তুষ্ট রাখতে অনেক ক্ষেত্রেই একক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করতে হয়, যদিও নির্বাচন শেষে আবার সেই একই দলকে সরকার পরিচালনায় অংশ নিতে হয়।
অন্যদিকে ইউএমএনও ও পাসের সম্পর্কের ভেতরেও স্থায়ী সহযোগিতার ভিত্তি দুর্বল। কারণ দুটি দলই একই ধরনের ভোটারের সমর্থনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। মালয় ভোটের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকও রাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনী অঙ্কে সুবিধা পেতে কখনও সেই ভোটব্যাংককে সামনে আনা হয়, আবার কখনও জোট গঠন বা ভাঙার সমীকরণে তা ব্যবহৃত হয়। ফলে আদর্শের চেয়ে ভোটের হিসাবই সম্পর্ক নির্ধারণে বড় ভূমিকা পালন করে।

এই বাস্তবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ বারসাতু। দলটি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে একদিকে নিজেদের জোটের ভেতর পাসের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন জোটের উপস্থিতি—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে রয়েছে। ফলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একসময় যে দল একটি বৃহত্তর জোটের অংশ হয়ে ক্ষমতার বিকল্প গড়ে তুলতে চেয়েছিল, এখন সেই দলই নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার সংগ্রামে নেমেছে। ভবিষ্যতে তারা আবার পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে সমঝোতায় ফিরবে, নাকি স্বাধীন শক্তি হিসেবে থেকে কেবল ভোটের সমীকরণ বদলে দেবে—সেটি এখনো অনিশ্চিত।
মালয়েশিয়ার রাজনীতি যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে আগামী সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে বিভাজনের রেখাগুলো আরও ঝাপসা হবে। সরকার ও বিরোধী শিবির, সহযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বী—এই প্রচলিত পরিচয়গুলো আর স্থির থাকবে না। বরং পরিস্থিতি, শক্তির ভারসাম্য এবং ভোটব্যাংকের রাজনীতি অনুযায়ী সম্পর্কের রূপ বদলাতে থাকবে।
মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে একটি পুরোনো সত্য—রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু নেই, স্থায়ী শত্রুও নেই। থাকে কেবল স্বার্থের মিল, ক্ষমতার সমীকরণ এবং প্রয়োজনে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ—উভয় ধরনের ভোটব্যাংক ব্যবহারের কৌশল। সেই বাস্তবতাই আজ দেশটির রাজনীতিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জটিল, আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ফিলিপ গোলিংগাই 


















