০৬:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬
কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতির অভিযোগে মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার দিতে আদালতের নির্দেশ আসিয়ানে মিয়ানমারের ফেরার পথ খুলতে চায় থাইল্যান্ড, তবে বাড়ছে সতর্কতার সুর সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা জোট, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে কৌশলগত বার্তা থাইল্যান্ডে কিশোরের বন্দুক হামলায় রক্তাক্ত স্কুল, দাদা-দাদিকে হত্যার পর আরও পাঁচজনকে গুলি করে আত্মহত্যা ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বাণিজ্যে ধাক্কা, চাপে দেশের বৃহত্তম অনলাইন বাজার নজর কাড়লেন স্ট্রে কিডসের হিউনজিন ও ফেলিক্স, একই কালো স্যুটে দুই ভিন্ন ফ্যাশন “আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী” শুভ চলে গেছে দক্ষিণ কোরিয়ায় চাকরির সংকট, তরুণদের নতুন গন্তব্য জাপান লাগামহীন বাজারের কাছে নাগরিক কেন জিম্মি?

নিকারাগুয়ার গণতন্ত্রের শেষ অধ্যায়: ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচনের মৃত্যুঘণ্টা

কোনো স্বৈরশাসক যখন আর বিরোধী দলকে নয়, এমনকি নিজের সাজানো নির্বাচনকেও ভয় পেতে শুরু করেন, তখন বোঝা যায় ক্ষমতার সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়—অস্তিত্বগত। নিকারাগুয়ায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। সেখানে এখন প্রশ্ন আর কে নির্বাচন জিতবে, তা নয়; বরং নির্বাচন আদৌ থাকবে কি না।

স্যান্ডিনিস্তা বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কার্যত জানিয়ে দেন, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের পথ হিসেবে নির্বাচনকে আর বিবেচনা করা হবে না। পরে সরকারপক্ষ ভাষা কিছুটা নরম করার চেষ্টা করলেও মূল বার্তা বদলায়নি। নির্বাচনের কাঠামো এমনভাবে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে সরকার যাদের “বিশ্বাসঘাতক” বা “বিদেশি শক্তির দালাল” বলে আখ্যা দেবে, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণই করতে না পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।

এসব পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক সংস্কার নয়। এগুলো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য ক্ষমতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রকে একটি পারিবারিক উত্তরাধিকারের কাঠামোয় রূপ দেওয়া।

বাস্তবে নিকারাগুয়ার শাসকগোষ্ঠীর হাতে নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, সংসদ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রশাসনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বহু আগেই চলে গেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে কার্যকর সব বিরোধী প্রার্থীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বহু সমালোচক ও বিরোধী নেতাকে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। সেই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে—যখন নির্বাচন আগেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত, তখন সেই প্রহসনের মুখোশটুকুও সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কেন?

এর উত্তর সম্ভবত নিহিত রয়েছে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ উদ্বেগে।

Nicaragua makes Daniel Ortega and his wife Murillo 'copresidents,' fueling  democratic rebuke | AP News

রোসারিও মুরিলো কেবল প্রেসিডেন্টের স্ত্রী নন; তিনি এখন রাষ্ট্রক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সহ-রাষ্ট্রপতি হওয়া পর্যন্ত তাঁর উত্থান ছিল সুপরিকল্পিত। নতুন সাংবিধানিক কাঠামো কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতার বিভাজন বিলুপ্ত করে দম্পতির হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব তুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে ড্যানিয়েল ওর্তেগার পর রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরসূরি হবেন মুরিলো।

কিন্তু এখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় সংকট।

ড্যানিয়েল ওর্তেগার জনপ্রিয়তা অনেক আগেই ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লব এবং সোমোজা একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস। সেই বিপ্লবী অতীত এখনও কিছু মানুষের কাছে তাঁকে একটি প্রতীকী বৈধতা দেয়।

রোসারিও মুরিলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড়িয়ে নয়; বরং স্বামীর ক্ষমতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর নিজের কোনো বিপ্লবী ঐতিহ্য নেই, নেই একই ধরনের জনসমর্থন। ফলে তিনি জানেন, এমনকি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনও কখনো কখনো রাজনৈতিক বাস্তবতার অপ্রত্যাশিত প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে।

এই কারণেই এখন নির্বাচনকে আরও সংকুচিত করার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্য কেবল বিরোধীদের হারানো নয়; এমন একটি ব্যবস্থার সৃষ্টি করা, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ থাকবে না।

এই কৌশলের অংশ হিসেবেই গত কয়েক বছরে শত শত নিকারাগুয়ানের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের। তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, ভবিষ্যতে সরকারি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র যেন নাগরিকত্বকেও রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার ও শাস্তির অস্ত্রে পরিণত করেছে।

দমন-পীড়নের লক্ষ্য শুধু বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি নয়। ক্যাথলিক চার্চের যাজক ও বিশপদেরও কারাবন্দি কিংবা নির্বাসিত করা হয়েছে, কারণ তাঁরা সরকারের দমননীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং চার্চের প্রভাব দুর্বল করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

Central America's largest country says it's done with democracy

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরেও ভিন্নমত এখন অমার্জনীয় অপরাধ।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ছিলেন হুম্বের্তো ওর্তেগা—ড্যানিয়েল ওর্তেগার ভাই এবং স্যান্ডিনিস্তা বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সংগঠক। তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে রাষ্ট্রক্ষমতার পারিবারিক উত্তরাধিকার বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। এর পরপরই তাঁকে গৃহবন্দি করা হয় এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি কার্যত রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারির মধ্যে ছিলেন।

এই ঘটনা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বিপ্লবে অবদান, দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্য—কোনোটিই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়, যদি কেউ ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আজকের নিকারাগুয়া তাই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নির্বাচন আর জনগণের মতামত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নয়; বরং ক্ষমতার বৈধতার একটি নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনী। আর যখন সেই প্রদর্শনীতেও অনিশ্চয়তার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনকেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে চায়।

স্বৈরশাসনের ইতিহাসে এ দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু নিকারাগুয়ার অভিজ্ঞতা আবারও মনে করিয়ে দেয়, কোনো সরকার যখন রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েও নিরাপদ বোধ করে না, তখন তার সবচেয়ে বড় ভয় বিরোধী দল নয়—জনগণের রায়।

গণতন্ত্রের মৃত্যু সব সময় ট্যাংক নামিয়ে বা সংবিধান বাতিল করে ঘটে না। কখনও কখনও তা ঘটে ধীরে ধীরে—প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে, নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুগত করে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করে। নিকারাগুয়া আজ সেই শেষ ধাপের এক নির্মম উদাহরণ।

জনপ্রিয় সংবাদ

কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতির অভিযোগে মেটাকে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার দিতে আদালতের নির্দেশ

নিকারাগুয়ার গণতন্ত্রের শেষ অধ্যায়: ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচনের মৃত্যুঘণ্টা

০৩:৪২:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

কোনো স্বৈরশাসক যখন আর বিরোধী দলকে নয়, এমনকি নিজের সাজানো নির্বাচনকেও ভয় পেতে শুরু করেন, তখন বোঝা যায় ক্ষমতার সংকট কেবল রাজনৈতিক নয়—অস্তিত্বগত। নিকারাগুয়ায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। সেখানে এখন প্রশ্ন আর কে নির্বাচন জিতবে, তা নয়; বরং নির্বাচন আদৌ থাকবে কি না।

স্যান্ডিনিস্তা বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কার্যত জানিয়ে দেন, রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের পথ হিসেবে নির্বাচনকে আর বিবেচনা করা হবে না। পরে সরকারপক্ষ ভাষা কিছুটা নরম করার চেষ্টা করলেও মূল বার্তা বদলায়নি। নির্বাচনের কাঠামো এমনভাবে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে সরকার যাদের “বিশ্বাসঘাতক” বা “বিদেশি শক্তির দালাল” বলে আখ্যা দেবে, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণই করতে না পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনাও সামনে এসেছে।

এসব পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক সংস্কার নয়। এগুলো একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য ক্ষমতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রকে একটি পারিবারিক উত্তরাধিকারের কাঠামোয় রূপ দেওয়া।

বাস্তবে নিকারাগুয়ার শাসকগোষ্ঠীর হাতে নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, সংসদ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রশাসনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বহু আগেই চলে গেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে কার্যকর সব বিরোধী প্রার্থীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। বহু সমালোচক ও বিরোধী নেতাকে নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। সেই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে—যখন নির্বাচন আগেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত, তখন সেই প্রহসনের মুখোশটুকুও সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কেন?

এর উত্তর সম্ভবত নিহিত রয়েছে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ উদ্বেগে।

Nicaragua makes Daniel Ortega and his wife Murillo 'copresidents,' fueling  democratic rebuke | AP News

রোসারিও মুরিলো কেবল প্রেসিডেন্টের স্ত্রী নন; তিনি এখন রাষ্ট্রক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সহ-রাষ্ট্রপতি হওয়া পর্যন্ত তাঁর উত্থান ছিল সুপরিকল্পিত। নতুন সাংবিধানিক কাঠামো কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতার বিভাজন বিলুপ্ত করে দম্পতির হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব তুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে ড্যানিয়েল ওর্তেগার পর রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরসূরি হবেন মুরিলো।

কিন্তু এখানেই তাঁর সবচেয়ে বড় সংকট।

ড্যানিয়েল ওর্তেগার জনপ্রিয়তা অনেক আগেই ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লব এবং সোমোজা একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস। সেই বিপ্লবী অতীত এখনও কিছু মানুষের কাছে তাঁকে একটি প্রতীকী বৈধতা দেয়।

রোসারিও মুরিলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড়িয়ে নয়; বরং স্বামীর ক্ষমতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর নিজের কোনো বিপ্লবী ঐতিহ্য নেই, নেই একই ধরনের জনসমর্থন। ফলে তিনি জানেন, এমনকি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনও কখনো কখনো রাজনৈতিক বাস্তবতার অপ্রত্যাশিত প্রতিফলন হয়ে উঠতে পারে।

এই কারণেই এখন নির্বাচনকে আরও সংকুচিত করার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্য কেবল বিরোধীদের হারানো নয়; এমন একটি ব্যবস্থার সৃষ্টি করা, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ থাকবে না।

এই কৌশলের অংশ হিসেবেই গত কয়েক বছরে শত শত নিকারাগুয়ানের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের। তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, ভবিষ্যতে সরকারি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র যেন নাগরিকত্বকেও রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার ও শাস্তির অস্ত্রে পরিণত করেছে।

দমন-পীড়নের লক্ষ্য শুধু বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি নয়। ক্যাথলিক চার্চের যাজক ও বিশপদেরও কারাবন্দি কিংবা নির্বাসিত করা হয়েছে, কারণ তাঁরা সরকারের দমননীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং চার্চের প্রভাব দুর্বল করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে।

Central America's largest country says it's done with democracy

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরেও ভিন্নমত এখন অমার্জনীয় অপরাধ।

এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ ছিলেন হুম্বের্তো ওর্তেগা—ড্যানিয়েল ওর্তেগার ভাই এবং স্যান্ডিনিস্তা বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সংগঠক। তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন যে রাষ্ট্রক্ষমতার পারিবারিক উত্তরাধিকার বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। এর পরপরই তাঁকে গৃহবন্দি করা হয় এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি কার্যত রাষ্ট্রের কঠোর নজরদারির মধ্যে ছিলেন।

এই ঘটনা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বিপ্লবে অবদান, দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্য—কোনোটিই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়, যদি কেউ ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আজকের নিকারাগুয়া তাই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নির্বাচন আর জনগণের মতামত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নয়; বরং ক্ষমতার বৈধতার একটি নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনী। আর যখন সেই প্রদর্শনীতেও অনিশ্চয়তার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনকেই অপ্রয়োজনীয় করে তুলতে চায়।

স্বৈরশাসনের ইতিহাসে এ দৃশ্য নতুন নয়। কিন্তু নিকারাগুয়ার অভিজ্ঞতা আবারও মনে করিয়ে দেয়, কোনো সরকার যখন রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েও নিরাপদ বোধ করে না, তখন তার সবচেয়ে বড় ভয় বিরোধী দল নয়—জনগণের রায়।

গণতন্ত্রের মৃত্যু সব সময় ট্যাংক নামিয়ে বা সংবিধান বাতিল করে ঘটে না। কখনও কখনও তা ঘটে ধীরে ধীরে—প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে, নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুগত করে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তাকেই অস্বীকার করে। নিকারাগুয়া আজ সেই শেষ ধাপের এক নির্মম উদাহরণ।