দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৪৩ সালের ১৬ মে রাতের ‘অপারেশন চ্যাস্টাইস’ বা ড্যামবাস্টার অভিযান একটি কিংবদন্তি হয়ে আছে। জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ধ্বংস করতে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ৬১৭ স্কোয়াড্রনের ১৯টি ল্যাঙ্কাস্টার বোমারু বিমান ইংল্যান্ডের আরএএফ স্ক্যাম্পটন থেকে উড্ডয়ন করেছিল। কিন্তু সেই অভিযানে অংশ নেওয়া ১৯টি বিমানের মাত্র ১১টি ফিরে আসে। মোট ১৩৩ জন বিমানকর্মী এই কঠিন অভিযানের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জন নিহত হন এবং তিনজন পরবর্তী দুই বছর যুদ্ধবন্দি হিসেবে কাটান। আর যারা বেঁচে ছিলেন, তাঁদের জন্যও যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। বরং ড্যামবাস্টার অভিযানের পর ৬১৭ স্কোয়াড্রনের সদস্যদের সামনে অপেক্ষা করছিল আরও বহু বিপজ্জনক অভিযান।
প্রথমেই হারিয়ে গেলেন সিরিল অ্যান্ডারসন
অপারেশন চ্যাস্টাইসের পর স্কোয়াড্রন থেকে প্রথম বিদায় নেন ফ্লাইট সার্জেন্ট সিরিল অ্যান্ডারসন। তিনি অভিযানে অংশ নেওয়া তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ বিমানচালকদের একজন ছিলেন। তাঁর বিমানে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং সার্চলাইটের কারণে তিনি নির্ধারিত পথ থেকেও সরে যান। নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পেরে তিনি অভিযান বাতিল করে দেশে ফিরে আসেন। তাঁর বিমানে তখনও ‘আপকিপ’ বোমাটি ছিল। উইং কমান্ডার গাই গিবসনের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের পর অ্যান্ডারসন ও তাঁর দলকে ৪৯ স্কোয়াড্রনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
৪৯ স্কোয়াড্রনে ফিরে তাঁরা মূল বোমারু বাহিনীর সঙ্গে অভিযান চালাতে থাকেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন তাঁদের পিছু ছাড়েনি। ১৯৪৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ম্যানহাইমে অভিযান শেষে ফেরার সময় অফেনবাখের কাছে তাঁদের ল্যাঙ্কাস্টার একটি রাতের যুদ্ধবিমানের আক্রমণে ভূপাতিত হয়। বিমানের সবাই নিহত হন।
যারা কিছুটা ভাগ্যবান ছিলেন
অন্য কয়েকজন অবশ্য কিছুটা ভাগ্যবান ছিলেন। পাইলট অফিসার বিল টাউনসেন্ড ছিলেন রিজার্ভ দলের সদস্য। তিনি এনেপে বাঁধে, অথবা সম্ভবত বেভার বাঁধে, আক্রমণ করেছিলেন। কোন বাঁধে তিনি আক্রমণ করেছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। ১৯৪৩ সালের অক্টোবরের শুরুতে তাঁর যুদ্ধকালীন উড্ডয়ন মেয়াদ শেষ হয়েছে বলে তাঁকে ৬১৭ স্কোয়াড্রন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর তাঁকে আরএএফ বাল্ডারটনের কনভার্সন ইউনিটে পাঠানো হয়। যুদ্ধের বাকি সময় তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে ভারতে পাঠানো হয় এবং সেখানে লিবারেটর বিমান ওড়ানোর দায়িত্ব পান।
গাই গিবসনের নতুন দায়িত্ব
ড্যাম অভিযানের পর গাই গিবসনকেও নিয়মিত যুদ্ধ অভিযান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৪৩ সালের আগস্টে তাঁকে চার মাসের জনসংযোগ সফরে উত্তর আমেরিকায় পাঠানো হয়। একই সময়ে এয়ার মার্শাল আর্থার হ্যারিস সিদ্ধান্ত নেন, ৬১৭ স্কোয়াড্রনকে একটি বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিট হিসেবে রাখা হবে।
১৯৪৩ সালের গ্রীষ্মে নতুন বিমান ও অস্ত্রের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় স্কোয়াড্রন ইতালির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে চারটি ‘শাটল’ অভিযান চালায়। এসব অভিযানে বিমানগুলো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করে উত্তর আফ্রিকায় গিয়ে জ্বালানি ও নতুন অস্ত্র নেয়।
আবার জার্মানির পথে
১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ৬১৭ স্কোয়াড্রন আরএএফ কনিংসবিতে চলে যায়। সেখানে তারা পায় ১২ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৫ হাজার ৪৪৩ কেজি ওজনের এইচসি বিস্ফোরক বোমা। এই নতুন অস্ত্র দিয়ে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় মুনস্টারের কাছে ডর্টমুন্ড-এমস খালের বাঁধ দেওয়া অংশ ভেঙে ফেলার।
ড্যামবাস্টার অভিযানের মতোই এবারও পরিকল্পনা ছিল রাতে নিচু উচ্চতায় উড়ে শত্রুর গভীরে ঢুকে আক্রমণ চালানো। ১৪ সেপ্টেম্বর আটটি বিমান পাঠানো হয়। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ায় তাদের ফিরিয়ে আনা হয়।
এরপর আবার অভিযান শুরু হয়। ড্যামবাস্টারদের জন্য তৈরি করা নিচু উচ্চতার অভিযান এবার ভয়াবহ মূল্য দাবি করে। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ডেভিড মাল্টবির ল্যাঙ্কাস্টার, যিনি মোনে বাঁধ ভাঙার শেষ আক্রমণটি করেছিলেন, নরফোক উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে নিচু উচ্চতায় ঘুরতে গিয়ে সমুদ্রে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনও পরিষ্কার নয়। বিমানের সবাই নিহত হন। শুধু মাল্টবির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
এক রাতেই ভয়াবহ ক্ষতি
পরের রাতে একই লক্ষ্যবস্তুতে আরও আটটি বিমান পাঠানো হয়। নতুন স্কোয়াড্রন কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার জর্জ হোল্ডেন এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর সঙ্গে গাই গিবসনের দলের পাঁচজন সদস্যও ছিলেন। ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার সার্জেন্ট পাওয়েলও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন, যিনি ড্যামবাস্টার অভিযানে টাউনসেন্ডের দলের সদস্য ছিলেন।
নর্ডহর্নের কাছে পৌঁছানোর সময় একটি হালকা বিমানবিধ্বংসী কামানের গোলা একটি ল্যাঙ্কাস্টারের জ্বালানি ট্যাংকে আঘাত করে। বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই বিস্ফোরিত হয়। কেউ বেঁচে ছিলেন না।
লক্ষ্য এলাকায় পৌঁছানোর সময় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হ্যারল্ড উইলসন এবং পাইলট অফিসার উইলিয়াম ডিভালও হালকা বিমানবিধ্বংসী গোলার আঘাতে মারা যান। এই দুই দলের সদস্যরাও ড্যামবাস্টার অভিযানের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, কিন্তু অসুস্থতার কারণে মূল অভিযানে অংশ নিতে পারেননি।
লেস নাইটের শেষ অভিযান
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট লেস নাইট, যিনি এর আগে এডার বাঁধ ভেঙেছিলেন, সেদিন কুয়াশায় ঢাকা এলাকায় খুব নিচু দিয়ে উড়ে লক্ষ্য খুঁজছিলেন। হঠাৎ তাঁর ল্যাঙ্কাস্টার গাছপালায় ঢাকা একটি পাহাড়ি ঢালে আঘাত করে। এতে দুটি ইঞ্জিন নষ্ট হয় এবং বিমানের লেজের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নাইট কোনোভাবে বিমানটি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি বোমাটি ফেলে দেন এবং ইংল্যান্ডের দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিমানটি যে আর বাঁচবে না, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। নাইট যখন নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য লড়াই করছিলেন, তখন দলের অন্য সদস্যরা প্যারাশুট নিয়ে বিমান থেকে বেরিয়ে যান। এরপর নাইট জরুরি অবতরণের চেষ্টা করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত ল্যাঙ্কাস্টারটি মাঠ পার হওয়ার সময় একটি বাঁধ বা উঁচু মাটির অংশে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়। নাইট ঘটনাস্থলেই মারা যান। দলের দুজন মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গেই বন্দি হন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে আরও পাঁচজন, যাঁদের সঙ্গে অতিরিক্ত একজন গানারও ছিলেন, জার্মানদের এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনে ফিরে যেতে সক্ষম হন। ওই রাতে পাঠানো আটটি বিমানের মধ্যে পাঁচটি আর ফিরে আসেনি।
নিচু উচ্চতার অভিযান থেকে নতুন কৌশলে
ডর্টমুন্ড-এমস খালের অভিযানের ভয়াবহ ক্ষতি প্রমাণ করে দেয় যে এভাবে নিচু উচ্চতায় অভিযান চালিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। নতুন সদস্যরা স্কোয়াড্রনে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দায়িত্বও বদলে যায়। নিচু উচ্চতার আক্রমণের বদলে তাদের দেওয়া হয় নতুন ধরনের নির্ভুল বোমাবর্ষণ ব্যবস্থা। তারা উচ্চ উচ্চতায় উড়ে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে বোমা ফেলতে শুরু করে।
তাদের নতুন লক্ষ্য ছিল জার্মানির তৈরি করা নতুন ধরনের ‘ভি’ অস্ত্রের ঘাঁটি ও কারখানা। ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে থাকা এসব লক্ষ্যবস্তুতে ৬১৭ স্কোয়াড্রন একের পর এক আক্রমণ চালায়।
জিওফ রাইসের বেঁচে ফেরা
১৯৪৩ সালের ২০ ডিসেম্বর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট জিওফ রাইস লিয়েজের ককেরিল ইস্পাত কারখানায় হামলার জন্য পাঠানো আটটি বিমানের একটি দলের সদস্য ছিলেন। তিনি এর আগে অপারেশন চ্যাস্টাইস থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ জুইডারজে জলভাগে তাঁর বিমান পানিতে আঘাত করেছিল এবং বোমাটি হারিয়ে গিয়েছিল।
লিয়েজের ওপর সেদিন মেঘ থাকায় রাইস বোমা ফেলতে পারেননি। তিনি দেশে ফেরার পথে একটি রাতের যুদ্ধবিমান তাঁর ল্যাঙ্কাস্টারে আক্রমণ করে এবং বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। দলের সদস্যরা বিমান থেকে বের হওয়ার আগেই সেটি বিস্ফোরিত হয়। অবিশ্বাস্যভাবে রাইস বেঁচে যান। তাঁর নেভিগেটর ঠিক তার আগে নিজের প্যারাশুটটি তাঁকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
রাইস ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং ১৯৪৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ধরা পড়া এড়িয়ে যান। কিন্তু অ্যান্টওয়ার্পে একজন জার্মান তথ্যদাতার বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়েন এবং যুদ্ধের বাকি সময় বন্দি হিসেবে কাটান।
ভি-১ ঘাঁটিতে আক্রমণ
৬১৭ স্কোয়াড্রন নতুন বছরেও ভি-১ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ঘাঁটি এবং ফ্রান্সের বিভিন্ন কারখানায় আক্রমণ চালিয়ে যায়। উইং কমান্ডার লিওনার্ড চেশায়ার নিচু উচ্চতায় লক্ষ্য চিহ্নিত করার নতুন কৌশল তৈরি করেছিলেন। স্কোয়াড্রন লিডার মিক মার্টিনের চিন্তাধারার সঙ্গে চেশায়ারের এই কৌশল মিলিয়ে নেওয়ার ফলে খুব কম ক্ষয়ক্ষতিতে অত্যন্ত নির্ভুল বোমাবর্ষণ সম্ভব হয়।
তবু অপারেশন চ্যাস্টাইসে অংশ নেওয়া সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনা থামেনি।
১৯৪৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ফরাসি রিভিয়েরার আনথেওর ভায়াডাক্টে হামলার জন্য ১০টি বিমান পাঠানো হয়। এলাকাটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে সুরক্ষিত। মিক মার্টিন খুব নিচু দিয়ে উড়ে লক্ষ্য চিহ্নিত করার সময় তাঁর বিমানে কামানের গোলা আঘাত করে। গোলাটি বিমানের সামনের অংশে ঢুকে বোমা নিশানাকারী ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বব হেকে হত্যা করে এবং ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইংল্যান্ডে ফিরতে না পেরে মার্টিন সার্ডিনিয়ার দিকে চলে যান। সেখানে কাগলিয়ারিতে বব হেকে সমাহিত করা হয়। সামান্য মেরামতের পর ল্যাঙ্কাস্টারটি উত্তর আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে ব্রিটেনে ফিরে আসে।

জন পুলফোর্ডের শেষ উড্ডয়ন
এদিকে অন্য বিমানগুলো লক্ষ্যবস্তু থেকে সরাসরি সাসেক্সের ফোর্ডে গিয়ে বিশ্রাম ও জ্বালানি নেয়। পরদিন সকালে তারা উড্ডয়ন করে উডহল স্পার ঘাঁটির দিকে রওনা হয়। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর স্কোয়াড্রন লিডার বিল সাজিটের বিমান চিচেস্টারের উত্তর-পূর্বে মেঘে ঢাকা একটি পাহাড়ের চূড়ায় আঘাত করে। বিমানের সবাই নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন সার্জেন্ট জন পুলফোর্ড। তিনি অপারেশন চ্যাস্টাইসে গাই গিবসনের ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আগের বছরের সেপ্টেম্বরে হোল্ডেনের দল থেকে বদলি হয়ে অন্য দলে যাওয়ার কারণে তিনি মাত্র আরও পাঁচ মাস জীবন পেয়েছিলেন।
মিক মার্টিনের দল যুদ্ধের শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাঁদের সবাই একসঙ্গে যুদ্ধকালীন দায়িত্ব শেষ করবেন। ড্যামবাস্টার অভিযানে জ্বালানি ট্যাংকে আঘাত লাগার পরও তাঁরা অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। এবার বব হের মৃত্যু এবং মার্টিনের ৪৯তম অভিযান পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার পর তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, আর যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবেন না। তাঁরা স্কোয়াড্রন ছেড়ে দেন।
আরও দুই ড্যামবাস্টারের মৃত্যু
পরবর্তী দুই মাসে অপারেশন চ্যাস্টাইসে অংশ নেওয়া আরও দুজন সদস্য নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিচার্ড ট্রেভর-রোপার ছিলেন গাই গিবসনের পেছনের গানার। তিনি ১৯৪৩ সালের আগস্টের শেষে ৬১৭ স্কোয়াড্রন ছেড়ে সেন্ট্রাল গানারি স্কুলে যোগ দেন। ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পাথফাইন্ডার বাহিনীতে যোগ দেন এবং দুই সপ্তাহ পর ৯৭ স্কোয়াড্রনে যান।
৩১ মার্চ তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রোল্যান্ডসের দলের সদস্য হিসেবে নুরেমবার্গ অভিযানে অংশ নেন। সেটি ছিল ভয়াবহ অভিযান। মোট ৯৫টি বিমান সেই রাতে ফিরে আসতে পারেনি। রোল্যান্ডসের ল্যাঙ্কাস্টারও জার্মান রাতের যুদ্ধবিমান বিশেষজ্ঞ মেজর মার্টিন ড্রেউসের আক্রমণে ধ্বংস হয়। বিমানের সবাই নিহত হন।
আরেকজন ছিলেন সার্জেন্ট ব্রায়ান জ্যাগার। তিনি অপারেশন চ্যাস্টাইসে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ডেভিড শ্যাননের পেছনের গানার ছিলেন। ১৯৪৪ সালের মার্চে তিনি স্কোয়াড্রন থেকে বদলি হন। ৩০ এপ্রিল বোমাবর্ষণ উন্নয়ন ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় তিনি ৪৬০ স্কোয়াড্রনের একটি ল্যাঙ্কাস্টারে যুদ্ধবিমান সহযোগিতা অনুশীলনে অংশ নিচ্ছিলেন। তখন বিমানের ভেতরে রাখা একটি জরুরি নৌকা বেরিয়ে এসে বিমানের লেজে জড়িয়ে যায়। বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং সবাই নিহত হন।
শেষ তিনটি মূল দল
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেন ব্রাউন ও তাঁর দল ড্যামবাস্টার অভিযানে রিজার্ভ দলের অংশ হিসেবে সর্পে বাঁধে দ্বিতীয় আক্রমণ চালিয়েছিলেন। মার্চের শেষে তাঁদের যুদ্ধকালীন দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। ব্রাউনকে ৫ নম্বর ল্যাঙ্কাস্টার ফিনিশিং স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়।
এর ফলে ৬১৭ স্কোয়াড্রনে অপারেশন চ্যাস্টাইসে অংশ নেওয়া মাত্র তিনটি মূল বিমানদল অবশিষ্ট থাকে—ম্যাকার্থি, মুনরো ও শ্যাননের দল। মিক মার্টিনের সঙ্গে এই সদস্যরাই তখন স্কোয়াড্রনের অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠেন।
![]()
অপারেশন ট্যাক্সেবল ও নতুন যুগ
লিওনার্ড চেশায়ার নিচু উচ্চতায় লক্ষ্য চিহ্নিত করার কৌশল আরও উন্নত করতে থাকেন। প্রতিরক্ষাহীন একটি ফরাসি কারখানার ছাদ থেকে মাত্র ৫০ ফুট বা ১৫ মিটার ওপরে ল্যাঙ্কাস্টার নামিয়ে লক্ষ্য চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও শক্তিশালী প্রতিরক্ষার মুখে আরও ছোট ও দ্রুত বিমান প্রয়োজন ছিল।
১৯৪৪ সালের এপ্রিলে চেশায়ার মসকিটো বিমান সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। শ্যানন মসকিটোর নিচু উচ্চতার লক্ষ্য চিহ্নিতকারী দলের সদস্য হন। তাঁর ল্যাঙ্কাস্টার দলের সদস্যদের যুদ্ধকালীন দায়িত্ব শেষ হলেও বোমা নিশানাকারী লেন সাম্পটার তাঁর সঙ্গে থাকার জন্য নেভিগেটর হিসেবে নতুন করে প্রশিক্ষণ নেন।
মে মাসে ডি-ডের জন্য ৬১৭ স্কোয়াড্রন বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। ‘অপারেশন ট্যাক্সেবল’-এ তারা ধাতব পাতের সরু টুকরো ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম আক্রমণকারী নৌবহরের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে জার্মানদের বিভ্রান্ত করার অনুশীলন করে। এরপর তারা আবার নির্ভুল বোমাবর্ষণে ফিরে যায়।
এ সময় তারা বার্নস ওয়ালিসের তৈরি ১২ হাজার পাউন্ড বা ৫ হাজার ৪৪৩ কেজির গভীর-ভেদী ট্যালবয় বোমা ব্যবহার করে। এই বোমা দিয়ে তারা ই-নৌকার ঘাঁটি এবং বড় ভি-অস্ত্র স্থাপনা ধ্বংস করে। গ্রীষ্মকালজুড়ে এমন শক্তভাবে সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চলতে থাকে।
জুলাই মাসে চেশায়ারের কমান্ডের সময় শেষ হলে ম্যাকার্থি, মুনরো ও শ্যাননকেও যুদ্ধকালীন দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে মূল ড্যামবাস্টারদের প্রায় সবাই ৬১৭ স্কোয়াড্রনের সক্রিয় অভিযান থেকে সরে যান।
শেষ পর্যন্ত ফিরে এলেন কয়েকজন
মনে হচ্ছিল ৬১৭ স্কোয়াড্রন আর কখনোই তার পুরোনো ড্যামবাস্টার সদস্যদের দেখতে পাবে না। কিন্তু ১৯৪৪ সালের অক্টোবরে টাউনসেন্ডের দুই গানার রে উইলকিনসন ও ডগ ওয়েব আবার স্কোয়াড্রনে ফিরে আসেন।
১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন দৃঢ়চেতা লেন সাম্পটার। এই তিনজন যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যান। ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল হিটলারের বাভারিয়ান দুর্গ এলাকা বের্শটেসগাডেনে আক্রমণ চালানোর সময় তাঁরা একটি বিরল রেকর্ড গড়েন। তাঁরা ৬১৭ স্কোয়াড্রনের প্রথম এবং শেষ—দুই ধরনের অভিযানেই অংশ নেওয়া সদস্য ছিলেন।
গাই গিবসনের শেষ পরিণতি
এরই মধ্যে গাই গিবসনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়। ১৯৪৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মিউনশেন-গ্লাডবাখ ও রাইডট এলাকায় মূল বোমারু বাহিনীর একটি অভিযানে তিনি নিজের দায়িত্বে ‘মাস্টার বোম্বার’ হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। অভিযান পরিচালনা করার পর ফেরার পথে তাঁর মসকিটো বিমান নেদারল্যান্ডসে বিধ্বস্ত হয়। গিবসন ও তাঁর নেভিগেটর দুজনই নিহত হন।
তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।
আরেকজন ‘অরিজিনাল’ সদস্য পার্সি হিলও পরে মারা যান। তিনি কেন ব্রাউনের নেভিগেটর ছিলেন এবং ১৯৪৪ সালের মার্চে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ৬১৭ স্কোয়াড্রন ছেড়ে যান। কিছুদিন একটি প্রশিক্ষণ ইউনিটে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পর তিনি বি-১৭ ফ্লাইং ফোর্ট্রেস বিমানে প্রশিক্ষণ নেন এবং ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২১৪ স্কোয়াড্রনে সক্রিয় অভিযানে ফিরে আসেন।
অষ্টম অভিযানে তাঁর বিমানে ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দেয় এবং বিমানটি বিমানবিধ্বংসী গোলার আঘাত পায়। সবাই প্যারাশুটে বেরিয়ে আসেন। হিল বন্দি হন এবং জার্মান কর্তৃপক্ষের হাতে যথাযথ আচরণ পান। কিন্তু তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধার ভাগ্য এত ভালো ছিল না। হিটলার যুব সংগঠনের সদস্যরা তাঁদের হত্যা করে।
যুদ্ধ শেষে বেঁচে ছিলেন ৪৮ জন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় অপারেশন চ্যাস্টাইসে অংশ নেওয়া ১৩৩ জনের মধ্যে মাত্র ৪৮ জন জীবিত ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই বেসামরিক জীবনে ফিরে যান।
ডেভিড শ্যানন ফুলের দোকান চালান। পরে ছোট একটি খামারে কাজ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তেল শিল্পে সফল কর্মকর্তা হন। জিওফ রাইসও তেল শিল্পে সফল ক্যারিয়ার গড়েন। লেস মুনরো নিউজিল্যান্ডে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন এবং স্থানীয় সরকার ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হন।
৬১৭ স্কোয়াড্রনের আরও কয়েকজন সদস্য নিজেদের বিমানবাহিনীতে থেকে যান। আমেরিকান জো ম্যাকার্থি ১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে স্কোয়াড্রন ছাড়ার পর আরএএফ ফার্নবরোতে যান। সেখানে পরীক্ষামূলক পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন এবং জার্মানদের কাছ থেকে দখল করা বিভিন্ন বিমান পরীক্ষা করেন।
১৯৪৬ সালে তিনি কানাডায় ফিরে যান এবং রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে থাকার জন্য কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি পরীক্ষামূলক ও উন্নয়ন ইউনিটে কাজ করেন, আর্কটিক অঞ্চলে বিভিন্ন পরীক্ষা চালান এবং পরে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সামুদ্রিক ও গোয়েন্দা উড্ডয়নেও কাজ করেন। ১৯৬৮ সালে অবসর নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান।
কানাডিয়ান কেন ব্রাউনও ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে ছিলেন। এরপর তিনি বেসামরিক বিমান চালিয়ে যান।
জন ভেরি হপগুডের পেছনের গানার টনি বার্চার ড্যামবাস্টার অভিযানে বিমান বিস্ফোরণের সময় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। পরে সুস্থ হয়ে তিনি রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সে দায়িত্ব চালিয়ে যান এবং দূরপ্রাচ্যে শর্ট সান্ডারল্যান্ড বিমান ওড়ানোর কাজে ফিরে যান।
আরেকজন ছিলেন ফ্লাইট সার্জেন্ট জন ফ্রেজার। তিনি যুদ্ধবন্দি শিবির থেকে মুক্ত হওয়ার পর কানাডায় ফিরে যান। ড্যামবাস্টার অভিযানের মাত্র তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে তিনি যে নারীকে বিয়ে করেছিলেন, তাঁকেও সঙ্গে নিয়ে কানাডায় ফিরে আসেন। ভ্যাঙ্কুভারে বসতি গড়ে তিনি বন বিভাগে কাজ করেন এবং ব্যক্তিগত বিমান চালানোর লাইসেন্সও নেন।
ফ্রেজার তাঁর প্যারাশুটে বেঁচে যাওয়ার ঘটনাকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট প্যারাশুট লাফ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৯৬২ সালের জুনে একটি বিমান দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন।
মিক মার্টিনের দীর্ঘ পথ
পল ব্রিকহিলের লেখা ‘দ্য ড্যাম বাস্টার্স’ বইয়ে বলা হয়েছে, ৫ নম্বর গ্রুপের কমান্ডার এয়ার ভাইস মার্শাল স্যার রালফ কোচরেন হ্যারল্ড ‘মিক’ মার্টিনকে যুদ্ধের সময় রয়্যাল এয়ার ফোর্সের তৈরি করা সবচেয়ে সেরা পাইলট হিসেবে মনে করতেন।
১৯৪০ সালে আরএএফে যোগ দেওয়া মার্টিন ৬১৭ স্কোয়াড্রনের নিচু উচ্চতায় উড্ডয়ন ও লক্ষ্য চিহ্নিত করার কৌশলের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। ৬১৭ স্কোয়াড্রন ছাড়ার পর তিনি ৫১৫ মসকিটো স্কোয়াড্রনে যোগ দেন এবং ইউরোপের ওপর শত্রু এলাকায় অনুপ্রবেশমূলক অভিযান চালান।
যুদ্ধের পর অল্প সময় ট্রান্সপোর্ট কমান্ডে কাজ করার পর তিনি একটি মসকিটো বিমান নিয়ে ভ্যাম্পায়ার যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রনকে আটলান্টিক পেরিয়ে নিয়ে যান। পরে তিনি ব্রিটেন থেকে কেপটাউনের মধ্যে রেকর্ড সময়ের একটি উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন।
তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ন্যাটোর সঙ্গেও কাজ করেন এবং ট্রান্সপোর্ট কমান্ডের নেতৃত্ব দেন। তিনি দুবার রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সহকারী-দে-ক্যাম্প হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি আরএএফ জার্মানির কমান্ডার-ইন-চিফ হন।
অদ্ভুত এক ঐতিহাসিক পরিহাস ছিল—যে মোনে বাঁধ ধ্বংসের অভিযানে তিনি একসময় অংশ নিয়েছিলেন, পরে আরএএফ জার্মানির দায়িত্বে গিয়ে কার্যত সেই মোনে বাঁধের প্রতিরক্ষার দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত হন।
এয়ার মার্শাল স্যার হ্যারল্ড মার্টিন ১৯৭৪ সালে অবসর নেন। ১৯৮৭ সালে একটি সড়ক দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়। যে মানুষটি সারাজীবন ভয়কে জয় করে ৬১৭ স্কোয়াড্রনের ইতিহাস নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁর জীবন শেষ হয় এভাবেই।
যুদ্ধের পরও শেষ হয়নি ড্যামবাস্টারদের গল্প
মার্টিনের উদ্যোগেই ১৯৫১ সালের অক্টোবরে ৬১৭ স্কোয়াড্রনের সাবেক সদস্যরা যুদ্ধের পর প্রথমবার একত্রিত হন। একই সময় পল ব্রিকহিলের লেখা তাঁদের যুদ্ধের কাহিনিও প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সালের মে মাসে আবার একটি পুনর্মিলনী হয়। এরপর ১৯৬৭ সালের মে মাসে জিওফ রাইস, বিল টাউনসেন্ড ও ডগলাস ওয়েবসহ ‘অরিজিনাল’ সদস্যদের একটি দল পুরোনো ঘাঁটি স্ক্যাম্পটনে ফিরে যাওয়ার জন্য একটি নস্টালজিক উড্ডয়ন করে।
তাঁরা বিগিন হিল থেকে ল্যাঙ্কাস্টার এনএক্স৬১১ বিমানে স্ক্যাম্পটনের উদ্দেশে উড়েছিলেন। বিমানটি পরে ইস্ট কির্কবিতে সংরক্ষিত হয় এবং ‘জাস্ট জেন’ নামে পরিচিতি পায়।
তবে ড্যামবাস্টারদের মধ্যে শেষবার ল্যাঙ্কাস্টারে উড্ডয়নের সম্মান পান জর্জ ‘জনি’ জনসন। ৯৬ বছর বয়সে তাঁকে ব্যাটল অব ব্রিটেন মেমোরিয়াল ফ্লাইটের ল্যাঙ্কাস্টারে করে ডারওয়েন্ট উপত্যকার ওপর দিয়ে উড়ানো হয়।
অবতরণের পর তিনি বলেছিলেন, ৭৫ বছর যেন মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে গিয়েছিল। ডারওয়েন্ট বাঁধের ওপর দিয়ে উড়তে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি আবার সেই সময়েই ফিরে গেছেন, যখন তাঁদের সেখানে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল। তিনি বলেছিলেন, প্রথমবার পাহাড়ি এলাকা দেখে ৬০ ফুট বা ১৮ মিটার উচ্চতায় এত নিচু দিয়ে কেন তাঁদের উড়তে হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু সেটিই ছিল তাঁদের কাজ।
ড্যামবাস্টারদের ইতিহাস তাই শুধু একটি সফল বোমা হামলার গল্প নয়। এটি ১৩৩ জন মানুষের প্রশিক্ষণ, সাহস, ভয়, মৃত্যু, বেঁচে থাকা এবং যুদ্ধের পর নতুন জীবনে ফিরে যাওয়ার দীর্ঘ কাহিনি। ১৯টি ল্যাঙ্কাস্টার নিয়ে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, তার পরিণতিতে ৫৩ জন প্রাণ হারান, তিনজন যুদ্ধবন্দি হন এবং শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৮ জন যুদ্ধের শেষে জীবিত ছিলেন। তাঁদের অনেকেই পরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও ১৯৪৩ সালের সেই রাত এবং পরবর্তী ভয়াবহ অভিযান তাঁদের জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছিল।
ড্যামবাস্টারদের ইতিহাস নিয়ে ফেসবুকে প্রচারের জন্য নিচের লেখাটি ব্যবহার করতে পারেন।
১৯টি ল্যাঙ্কাস্টার উড়েছিল জার্মানির বাঁধ ধ্বংস করতে। ফিরে এসেছিল মাত্র ১১টি। অপারেশন চ্যাস্টাইসের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া ১৩৩ জন বিমানকর্মীর মধ্যে ৫৩ জন নিহত হন, তিনজন হন যুদ্ধবন্দি। আর যুদ্ধের শেষে জীবিত ছিলেন মাত্র ৪৮ জন।
কিন্তু ড্যামবাস্টারদের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। মোনে, এডার ও সর্পে বাঁধের সেই বিখ্যাত অভিযানের পর ৬১৭ স্কোয়াড্রনের সদস্যদের পাঠানো হয় আরও ভয়ংকর সব অভিযানে। নিচু উচ্চতায় উড়ে খাল, ভি-১ অস্ত্রঘাঁটি ও কারখানায় হামলা, ফরাসি লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান, ডি-ডের বিভ্রান্তিমূলক অভিযান এবং পরে ট্যালবয় বোমা দিয়ে শক্তিশালী স্থাপনা ধ্বংস—প্রতিটি মিশনেই ছিল মৃত্যুর ঝুঁকি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















