যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ফিরে পেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিকভাবে অভিশংসনের উদ্যোগ না নিয়ে বিস্তৃত তদন্ত শুরু করার পরিকল্পনা করছে ডেমোক্র্যাটরা। দলটির নেতারা ও সংশ্লিষ্ট কমিটির কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার, দাতা ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সরাসরি অভিশংসন নয়, আগে প্রমাণ সংগ্রহ
ডেমোক্র্যাটদের পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত চারজন ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট নেতা ও বিভিন্ন কমিটির কর্মীরা শুনানি, সমন জারি এবং নথিপত্র চাওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
তাদের ধারণা, হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ব্যবসায়িক বা আর্থিক সম্পর্ক থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা তুলনামূলকভাবে কার্যকর হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটদের এই কৌশলের পেছনে রয়েছে সতর্কতা এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অভিজ্ঞতা। দলটির অনেক নেতা মনে করেন, আগেরবার অভিশংসন প্রক্রিয়া কংগ্রেসের বিপুল সময় ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করেছিল। একই সঙ্গে ট্রাম্প নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন।
এবার তাই প্রথম দিনেই অভিশংসনের ভোটে না গিয়ে দীর্ঘ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে চান ডেমোক্র্যাটরা।
একজন জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট কর্মকর্তা বলেন, তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য অভিশংসন নয়। তদন্তের মাধ্যমে এমন একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করতে চান তারা, যার ভিত্তিতে ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে।
প্রতিনিধি পরিষদের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ
বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন জনমত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হাতে এলে ডেমোক্র্যাটরা সমন জারি করতে পারবেন, সাক্ষ্য ও নথি তলব করতে পারবেন, প্রকাশ্য শুনানি আয়োজন করতে পারবেন এবং কংগ্রেসের নির্দেশ অমান্য করার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারবেন।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন ডেমোক্র্যাটরা। তাদের আশঙ্কা, হোয়াইট হাউস নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে করা বিভিন্ন তদন্তমূলক অনুরোধ প্রতিহত করতে পারে কিংবা সেগুলো উপেক্ষা করতে পারে।
এ কারণে প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করা কোম্পানি, ঠিকাদার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহকে তারা গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দেখছেন।
বড় কোম্পানিগুলোও নজরদারির আওতায়
তদন্তের সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনায় অ্যাপল, অ্যালফাবেট, পালান্টির, ব্ল্যাকস্টোন, ব্ল্যাকরক এবং ইলন মাস্কের মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানির নাম উঠে এসেছে বলে তিনজন সূত্র জানিয়েছেন।
এসব প্রতিষ্ঠানের সরকারি চুক্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক অথবা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের লেনদেন ও যোগাযোগের কারণে তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কথা আলোচনা হয়েছে।
তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হয়নি এবং এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্তও শুরু হয়নি। সূত্রগুলোও এসব কোম্পানি কোনো অনিয়ম করেছে—এমন কোনো অভিযোগের বিস্তারিত দেয়নি।
অ্যালফাবেট, পালান্টির, ব্ল্যাকস্টোন ও ব্ল্যাকরক এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। অ্যাপল ও টেসলাও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
সরকারি চুক্তি ও ট্রাম্পের পারিবারিক ব্যবসা
ডেমোক্র্যাটরা স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের বিভিন্ন চুক্তি, ট্রাম্পের পরিকল্পিত হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণের অর্থায়ন, করপোরেট দাতা এবং কথিত সুবিধার বিনিময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখার পরিকল্পনা করছেন।
এর পাশাপাশি ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থিক ব্যবস্থাগুলোর ওপরও নজর দেওয়া হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে ১৭৮৯ ক্যাপিটাল নামের একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, যেখানে ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র অংশীদার। একই সঙ্গে বিদেশি সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলোর এমন বিনিয়োগও খতিয়ে দেখা হতে পারে, যেগুলো ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
ডেমোক্র্যাটদের আশঙ্কা, এসব বিনিয়োগের সঙ্গে প্রশাসনের প্রভাব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
১৭৮৯ ক্যাপিটাল এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
বিদেশি সার্বভৌম তহবিলগুলোর কাছ থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই ট্রাম্প পরিবার ও তাদের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ও তহবিলের কাছ থেকে নথি সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা করছেন ডেমোক্র্যাটরা।
নির্বাচনের আগেই প্রস্তুতি শুরু
ডেমোক্র্যাটরা শুধু পরিকল্পনা করেই থেমে নেই। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা সামনে রেখে তারা ইতোমধ্যে সম্ভাব্য তদন্তের ভিত্তি তৈরি করা শুরু করেছেন।
দলের নেতারা সম্ভাব্য তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি, ঠিকাদার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছেন। এসব চিঠিতে বিভিন্ন নথি ও তথ্য চাওয়া হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে পরবর্তীতে সমন জারির পথ তৈরি করাই এসব চিঠির অন্যতম উদ্দেশ্য।
ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া এবং মেরিল্যান্ডের প্রতিনিধি জেমি রাসকিন—যারা যথাক্রমে প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি ও বিচারবিষয়ক কমিটিতে শীর্ষ ডেমোক্র্যাট—জানিয়েছেন, তারা ক্ষমতায় ফিরলে চলমান তদন্ত আরও বিস্তৃত করা হবে।
গার্সিয়া বলেছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সন্দেহজনক চুক্তি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের ছেলেদের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা, ট্রাম্পের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা এবং ট্রাম্পের দাতাদের সঙ্গে গোপন সমঝোতা—সবকিছুর ওপর নজর দেওয়া হবে। ডেমোক্র্যাটরা নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ পুনর্দখল করলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন।
গণমাধ্যম ও কারাগার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানও নজরে
ডেমোক্র্যাটদের পাঠানো চিঠির মধ্যে একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের কাছ থেকে তথ্য চাওয়ার বিষয়ও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির যোগাযোগ এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
ভিডিও প্রচারমাধ্যম ইউটিউব ও এর মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের কাছ থেকেও তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্পকে গত সেপ্টেম্বরে দেওয়া ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের সমঝোতার বিষয়টিও রয়েছে।
এ ছাড়া বেসরকারি কারাগার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান জিইও গ্রুপ এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সালুস ওয়ার্ল্ডওয়াইড সলিউশনের কাছে স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের সঙ্গে তাদের চুক্তি সম্পর্কিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি পণ্য বাণিজ্যকারী প্রতিষ্ঠান ভিটল ও ট্রাফিগুরার কাছেও ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
অ্যালফাবেট ও ট্রাফিগুরা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
ডেমোক্র্যাটরা এখন সংখ্যালঘু অবস্থানে থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান তাদের পাঠানো চিঠি উপেক্ষা করতে পারে। তবে ডেমোক্র্যাটদের মতে, চিঠিগুলো সম্ভাব্য তদন্তের আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেই সতর্ক করছে এবং ভবিষ্যতে কোন ধরনের নথি তলব করা হতে পারে, তারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অভিশংসন এখনই প্রথম পদক্ষেপ নয়
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস জুন মাসে এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জিতে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ট্রাম্পকে অভিশংসনের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।
তবে তিনি তখন দলের মূল মনোযোগ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর দিকে থাকবে বলে জানিয়েছিলেন।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ডেমোক্র্যাট নেতাদের বক্তব্যও একই ধরনের। তাদের মতে, অভিশংসনের পথ খোলা থাকবে, কিন্তু সেটি হবে তদন্তের প্রথম পদক্ষেপ নয়।
তদন্তে যদি এমন প্রমাণ পাওয়া যায়, যা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের সাংবিধানিক মানদণ্ড পূরণ করে, তখন ডেমোক্র্যাটরা সেই পথে যেতে পিছপা হবেন না।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অভিজ্ঞতাই মূলত বর্তমান কৌশলের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রতিনিধি পরিষদে দুইবার অভিশংসিত হয়েছিলেন। তবে দুইবারই সিনেটে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।
এবার তাই ডেমোক্র্যাটরা সরাসরি অভিশংসনের রাজনৈতিক লড়াইয়ে না গিয়ে প্রথমে তথ্য, নথি ও সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে চান। তদন্তে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিললে এরপরই অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়ার পথ খোলা থাকবে।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প তথাকথিত উগ্র বামপন্থীদের কর্মসূচি ঠেকাতে কাজ করে যাচ্ছেন এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার ব্যাপারে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটে যে দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকুক না কেন, প্রশাসন কংগ্রেসের তদারকিসংক্রান্ত অনুরোধের জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
তবে ডেমোক্র্যাটদের পরিকল্পনা স্পষ্ট—নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে প্রথমেই অভিশংসনের ভোটে না গিয়ে তদন্তের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, সরকারি চুক্তি, রাজনৈতিক দাতা এবং ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর ব্যাপক নজরদারি চালানো হবে।
তদন্তে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তার ওপরই শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সেটি নির্ধারিত হতে পারে।
ট্রাম্পকে ঘিরে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্ত, অভিশংসনের কৌশল এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রতিবেদনটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনুসন্ধানভিত্তিক উপস্থাপনাও নিচে দেওয়া হলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















