০২:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ১০০% শুল্ক হুমকি ‘ভারতের বিরুদ্ধে বৈরী পদক্ষেপ’: ফান্ড ম্যানেজার সংবিধান যখন ক্ষমতার আয়না: ভারতের গণতন্ত্র কোন পথে? ফ্রান্সে বছরে মদপানে ৪১ হাজার মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৩ লাখ ৭ হাজার জাপানের ভিন্ন পথ: শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ নয়, নিরাপদ ব্যবহারের লড়াই সিলেটে বাস দুর্ঘটনায় ৯ মৃত্যু: তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি, দুই বাসের নিবন্ধন বাতিল অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদান কেলেঙ্কারি, প্রশ্নের মুখে মোদির গর্বের প্রকল্প ফল প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা? জেনে নিন ক্লিয়ারিংয়ের পুরো পথ ওজন কমানোর ওষুধ বদলে দিচ্ছে মদ্যপানের অভ্যাস, কারও কমছে নেশার টান বাবার মৃত্যুর শোকে মেসি মাঠের বাইরে, শেষ মুহূর্তের গোলে মন্টেরের কাছে হার মায়ামির শতকোটি ডলারের উত্তরাধিকারেও হতাশ হবেন তরুণেরা, হাতে আসবে সম্পদের ছোট অংশ

জাপানের ভিন্ন পথ: শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ নয়, নিরাপদ ব্যবহারের লড়াই

বিশ্বজুড়ে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্মার্টফোন আসক্তি, সাইবার হয়রানি, যৌন শোষণ, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং উগ্রবাদী প্রচারণার ঝুঁকি ঠেকাতে একের পর এক দেশ বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটছে। কিন্তু জাপান এখনো সেই পথ বেছে নেয়নি। বরং টোকিও এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি কমবে, কিন্তু ডিজিটাল যোগাযোগ ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে না।

ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য ১৬ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশ সীমিত করার পথে এগোচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও একই ধরনের বিধিনিষেধ গ্রহণ করেছে বা এগিয়ে নিচ্ছে।

এই বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে জাপানের অবস্থান একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—শিশুদের সুরক্ষার জন্য তাদের অনলাইন জীবন বন্ধ করে দেওয়া হবে, নাকি অনলাইন পরিবেশকেই নিরাপদ করা হবে?

শিশুদের সুরক্ষা বনাম ডিজিটাল অধিকার

জাপানের সরকারি বিশেষজ্ঞ প্যানেল জুনে বলেছে, সবার জন্য একটি অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা কাঙ্ক্ষিত সমাধান নয়। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের যোগাযোগ ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সব প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকির ধরনও এক নয়।

Japan debating how to regulate children's use of social media – Asia News  Network

জাপানের বাস্তবতা এই অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশু-কিশোর স্মার্টফোন বা অন্য ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে শিশুদের অনলাইন জীবন পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, সেটিই বড় প্রশ্ন।

জাপান তাই বয়স যাচাই কঠোর করা, শিশুদের জন্য নিরাপদ সেটিংস ডিফল্টভাবে চালু করা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষা ও অভিভাবকের তদারকিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

অনলাইন জগৎ শুধু ঝুঁকির জায়গা নয়

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকে কেবল ক্ষতির উৎস হিসেবে দেখলে বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক বাদ পড়ে যায়। অনেক শিশুর জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এমন সামাজিক সংযোগ তৈরি করে, যা বাস্তব জীবনে পাওয়া কঠিন।

হাসপাতালে থাকা শিশু, প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী তরুণ কিংবা নিজের মতো মানুষের সম্প্রদায় খুঁজে না পাওয়া কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে বন্ধুত্ব ও সমর্থন পেতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন বা নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতিতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো কোনো শিশুর জন্য সাহায্য চাওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণেই সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার উল্টো ফল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বয়স গোপন করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান অনলাইন জায়গায় চলে গেলে শিশুদের ঝুঁকি শনাক্ত করা আরও কঠিন হতে পারে।

দায়িত্ব শুধু শিশুর নয়

জাপানের নীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু পরিবার বা শিশুর ওপর না রেখে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা।

Japan doesn't need a social media ban, but it must protect children | Yuko  Tamura

অনেক বড় প্ল্যাটফর্মে ন্যূনতম বয়স ১৩ বছর নির্ধারিত থাকলেও বয়স যাচাই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর নিজের ঘোষণার ওপর নির্ভর করে। জাপান চাইছে, কোম্পানিগুলো যেন নিজেদের নির্ধারিত বয়সসীমা কার্যকর করতে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা নেয়।

তবে শুধু বয়স যাচাই যথেষ্ট নয়। প্ল্যাটফর্মের নকশাও ব্যবহারকারীর আচরণকে প্রভাবিত করে। অনন্ত স্ক্রলিং, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু হওয়া এবং প্রতিদিন ধারাবাহিক ব্যবহারের জন্য পুরস্কারের মতো বৈশিষ্ট্য ব্যবহারকারীকে দীর্ঘসময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে।

বিজ্ঞাপননির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতিতে ব্যবহারকারীর মনোযোগ যত বেশি সময় ধরে রাখা যায়, প্ল্যাটফর্মের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও তত বেশি। ফলে অতিরিক্ত ব্যবহারের পুরো দায় শিশুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

কঠোর আইন ছাড়া পরিবর্তন কতটা সম্ভব?

এখানেই জাপানের পরিকল্পনার দুর্বলতা রয়েছে। বয়স যাচাই বা ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে শিশুদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হলে প্রযুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে কী ধরনের কার্যকর শাস্তি দেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

শুধু নির্দেশনা দিয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো পরিবর্তনে বাধ্য করা কঠিন। কার্যকর জরিমানা বা অন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে শিশু সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের প্রণোদনাও কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে কঠোর বয়স যাচাইয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। স্মার্টফোন চুক্তির সময় যাচাই করা বয়সের তথ্য ব্যবহার কিংবা সরকারি পরিচয়পত্রের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট যুক্ত করার মতো পদ্ধতি বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু এসব ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন সহজ নয়। বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পরও অনেক শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে পেরেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

Social media addiction suspected among 7% of Japanese adolescents: survey

সমস্যা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়

শিশুদের প্রযুক্তিনির্ভরতার সমস্যাকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ করাও ভুল। জাপানের জুনের একটি জরিপে দেখা গেছে, সব বয়সী উত্তরদাতার ৫৫ শতাংশ বলেছেন, কিছু করার না থাকলে তারা ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করেন—এমনকি সামনে অন্য কেউ উপস্থিত থাকলেও।

অর্থাৎ স্মার্টফোনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বৃহত্তর সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কোনো একটি প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না।

শিশুদের নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা বুঝতে শেখাতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণের সহায়ক হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে—যেমন সময়সীমার সতর্কতা, ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা।

ডিজিটাল শিক্ষা জরুরি, কিন্তু একা যথেষ্ট নয়

জাপানের ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পঞ্চম শ্রেণিতে তার হাতে স্মার্টফোন আসে। শুরুতে ফোন ছিল কৌতূহল মেটানো, গান শোনা এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। পরে সেটিই স্কুল ও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়।

তার যুক্তি হলো, শিশুদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখানো দরকার। এমনকি স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের আগে বাধ্যতামূলক শিক্ষা বা পরীক্ষার মতো ব্যবস্থার কথাও ভাবা যেতে পারে।

জাপানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী কোনো না কোনো ধরনের ডিজিটাল-সাক্ষরতা শিক্ষা পেয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। কিন্তু তথ্য জানা মানেই দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত হওয়া নয়। বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ বা আবেগঘন কনটেন্টের সামনে যুক্তিবোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তাই ডিজিটাল শিক্ষা, অভিভাবকের তদারকি এবং প্রযুক্তিগত সুরক্ষা—এই তিন ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

Japan joins global push to restrict minors' social media use - The Herald  Business

পরিবারকেও নিজেদের আচরণ বদলাতে হবে

শিশুকে ফোন কম ব্যবহার করতে বলার আগে পরিবারের বড়দের নিজেদের আচরণের দিকে তাকানো জরুরি। একজন অভিভাবক যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানের কাছে তার দেওয়া স্ক্রিন-টাইম সংক্রান্ত পরামর্শ খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার কথা নয়।

শিশুর ডিজিটাল আচরণ শুধু স্কুলের পাঠ্যক্রমে তৈরি হয় না; ঘরের পরিবেশও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে।

জাপানের সামনে তাই একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন। শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে, কিন্তু তাদের ডিজিটাল অধিকার ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগও অযথা সীমিত করা যাবে না।

সমাধান হয়তো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার কোনো এক প্রান্তে নেই। রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার ন্যূনতম মান নির্ধারণ করতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিকে সেই মান বাস্তবায়নের দায় নিতে হবে। পরিবারকে দায়িত্বশীল আচরণের উদাহরণ তৈরি করতে হবে। আর শিশুদের ছোটবেলা থেকেই তথ্য যাচাই, ঝুঁকি চেনা এবং নিজেদের অনলাইন আচরণ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করবে কি না—তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল প্রযুক্তি কি শিশুদের সময় ও মনোযোগ নিজের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি শিশুরাই প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে শিখবে?

জাপানের বর্তমান নীতিবিতর্কের আসল গুরুত্ব এখানেই।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের ১০০% শুল্ক হুমকি ‘ভারতের বিরুদ্ধে বৈরী পদক্ষেপ’: ফান্ড ম্যানেজার

জাপানের ভিন্ন পথ: শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ নয়, নিরাপদ ব্যবহারের লড়াই

১২:২৭:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

বিশ্বজুড়ে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্মার্টফোন আসক্তি, সাইবার হয়রানি, যৌন শোষণ, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং উগ্রবাদী প্রচারণার ঝুঁকি ঠেকাতে একের পর এক দেশ বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটছে। কিন্তু জাপান এখনো সেই পথ বেছে নেয়নি। বরং টোকিও এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি কমবে, কিন্তু ডিজিটাল যোগাযোগ ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে না।

ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য ১৬ বছরের কম বয়সীদের প্রবেশ সীমিত করার পথে এগোচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াও একই ধরনের বিধিনিষেধ গ্রহণ করেছে বা এগিয়ে নিচ্ছে।

এই বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে জাপানের অবস্থান একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—শিশুদের সুরক্ষার জন্য তাদের অনলাইন জীবন বন্ধ করে দেওয়া হবে, নাকি অনলাইন পরিবেশকেই নিরাপদ করা হবে?

শিশুদের সুরক্ষা বনাম ডিজিটাল অধিকার

জাপানের সরকারি বিশেষজ্ঞ প্যানেল জুনে বলেছে, সবার জন্য একটি অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করা কাঙ্ক্ষিত সমাধান নয়। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের যোগাযোগ ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সব প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকির ধরনও এক নয়।

Japan debating how to regulate children's use of social media – Asia News  Network

জাপানের বাস্তবতা এই অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৯৯ শতাংশ শিশু-কিশোর স্মার্টফোন বা অন্য ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে শিশুদের অনলাইন জীবন পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, সেটিই বড় প্রশ্ন।

জাপান তাই বয়স যাচাই কঠোর করা, শিশুদের জন্য নিরাপদ সেটিংস ডিফল্টভাবে চালু করা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল শিক্ষা ও অভিভাবকের তদারকিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

অনলাইন জগৎ শুধু ঝুঁকির জায়গা নয়

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকে কেবল ক্ষতির উৎস হিসেবে দেখলে বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক বাদ পড়ে যায়। অনেক শিশুর জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এমন সামাজিক সংযোগ তৈরি করে, যা বাস্তব জীবনে পাওয়া কঠিন।

হাসপাতালে থাকা শিশু, প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসকারী তরুণ কিংবা নিজের মতো মানুষের সম্প্রদায় খুঁজে না পাওয়া কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে বন্ধুত্ব ও সমর্থন পেতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন বা নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতিতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো কোনো শিশুর জন্য সাহায্য চাওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণেই সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞার উল্টো ফল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বয়স গোপন করে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করা কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান অনলাইন জায়গায় চলে গেলে শিশুদের ঝুঁকি শনাক্ত করা আরও কঠিন হতে পারে।

দায়িত্ব শুধু শিশুর নয়

জাপানের নীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু পরিবার বা শিশুর ওপর না রেখে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা।

Japan doesn't need a social media ban, but it must protect children | Yuko  Tamura

অনেক বড় প্ল্যাটফর্মে ন্যূনতম বয়স ১৩ বছর নির্ধারিত থাকলেও বয়স যাচাই অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর নিজের ঘোষণার ওপর নির্ভর করে। জাপান চাইছে, কোম্পানিগুলো যেন নিজেদের নির্ধারিত বয়সসীমা কার্যকর করতে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা নেয়।

তবে শুধু বয়স যাচাই যথেষ্ট নয়। প্ল্যাটফর্মের নকশাও ব্যবহারকারীর আচরণকে প্রভাবিত করে। অনন্ত স্ক্রলিং, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু হওয়া এবং প্রতিদিন ধারাবাহিক ব্যবহারের জন্য পুরস্কারের মতো বৈশিষ্ট্য ব্যবহারকারীকে দীর্ঘসময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে।

বিজ্ঞাপননির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতিতে ব্যবহারকারীর মনোযোগ যত বেশি সময় ধরে রাখা যায়, প্ল্যাটফর্মের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও তত বেশি। ফলে অতিরিক্ত ব্যবহারের পুরো দায় শিশুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

কঠোর আইন ছাড়া পরিবর্তন কতটা সম্ভব?

এখানেই জাপানের পরিকল্পনার দুর্বলতা রয়েছে। বয়স যাচাই বা ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে শিশুদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হলে প্রযুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে কী ধরনের কার্যকর শাস্তি দেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

শুধু নির্দেশনা দিয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের ব্যবসায়িক কাঠামো পরিবর্তনে বাধ্য করা কঠিন। কার্যকর জরিমানা বা অন্য কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে শিশু সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের প্রণোদনাও কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে কঠোর বয়স যাচাইয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। স্মার্টফোন চুক্তির সময় যাচাই করা বয়সের তথ্য ব্যবহার কিংবা সরকারি পরিচয়পত্রের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট যুক্ত করার মতো পদ্ধতি বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু এসব ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন সহজ নয়। বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পরও অনেক শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে পেরেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

Social media addiction suspected among 7% of Japanese adolescents: survey

সমস্যা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়

শিশুদের প্রযুক্তিনির্ভরতার সমস্যাকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ করাও ভুল। জাপানের জুনের একটি জরিপে দেখা গেছে, সব বয়সী উত্তরদাতার ৫৫ শতাংশ বলেছেন, কিছু করার না থাকলে তারা ফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করেন—এমনকি সামনে অন্য কেউ উপস্থিত থাকলেও।

অর্থাৎ স্মার্টফোনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি বৃহত্তর সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কোনো একটি প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না।

শিশুদের নিজেদের স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা বুঝতে শেখাতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণের সহায়ক হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে—যেমন সময়সীমার সতর্কতা, ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা।

ডিজিটাল শিক্ষা জরুরি, কিন্তু একা যথেষ্ট নয়

জাপানের ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পঞ্চম শ্রেণিতে তার হাতে স্মার্টফোন আসে। শুরুতে ফোন ছিল কৌতূহল মেটানো, গান শোনা এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। পরে সেটিই স্কুল ও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়।

তার যুক্তি হলো, শিশুদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখানো দরকার। এমনকি স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের আগে বাধ্যতামূলক শিক্ষা বা পরীক্ষার মতো ব্যবস্থার কথাও ভাবা যেতে পারে।

জাপানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী কোনো না কোনো ধরনের ডিজিটাল-সাক্ষরতা শিক্ষা পেয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। কিন্তু তথ্য জানা মানেই দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত হওয়া নয়। বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ বা আবেগঘন কনটেন্টের সামনে যুক্তিবোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তাই ডিজিটাল শিক্ষা, অভিভাবকের তদারকি এবং প্রযুক্তিগত সুরক্ষা—এই তিন ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

Japan joins global push to restrict minors' social media use - The Herald  Business

পরিবারকেও নিজেদের আচরণ বদলাতে হবে

শিশুকে ফোন কম ব্যবহার করতে বলার আগে পরিবারের বড়দের নিজেদের আচরণের দিকে তাকানো জরুরি। একজন অভিভাবক যদি সারাক্ষণ ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে সন্তানের কাছে তার দেওয়া স্ক্রিন-টাইম সংক্রান্ত পরামর্শ খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার কথা নয়।

শিশুর ডিজিটাল আচরণ শুধু স্কুলের পাঠ্যক্রমে তৈরি হয় না; ঘরের পরিবেশও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে।

জাপানের সামনে তাই একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন। শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে, কিন্তু তাদের ডিজিটাল অধিকার ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগও অযথা সীমিত করা যাবে না।

সমাধান হয়তো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা সম্পূর্ণ স্বাধীনতার কোনো এক প্রান্তে নেই। রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার ন্যূনতম মান নির্ধারণ করতে হবে। প্রযুক্তি কোম্পানিকে সেই মান বাস্তবায়নের দায় নিতে হবে। পরিবারকে দায়িত্বশীল আচরণের উদাহরণ তৈরি করতে হবে। আর শিশুদের ছোটবেলা থেকেই তথ্য যাচাই, ঝুঁকি চেনা এবং নিজেদের অনলাইন আচরণ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করবে কি না—তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল প্রযুক্তি কি শিশুদের সময় ও মনোযোগ নিজের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি শিশুরাই প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে শিখবে?

জাপানের বর্তমান নীতিবিতর্কের আসল গুরুত্ব এখানেই।