যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে পাস হওয়া রাশিয়ার তেল-গ্যাস আমদানিকারক দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা বিলকে ভারতের বিরুদ্ধে ‘বৈরী পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ফান্ড ম্যানেজার হর্ষ গুপ্ত মধুসূদন। তাঁর দাবি, প্রস্তাবিত আইনটি কার্যত ‘ভারতবিরোধী বিল’ এবং এর মাধ্যমে নয়াদিল্লিকে এমন একটি বিষয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে, যার ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিই মূল বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ৮৬-১১ ভোটে ‘লিন্ডসে গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ পাস করেছে। বিলটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির দিক থেকে শীর্ষ পাঁচ দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বর্তমানে চীন, ভারত, আজারবাইজান, হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া ওই পাঁচ দেশের তালিকায় রয়েছে। ফলে বিলটি কার্যকর হলে এসব দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হবে।
মধুসূদন প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়া থেকে এখনো জ্বালানি আমদানি করা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেও যখন রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত, তখন শুধু কয়েকটি দেশকে লক্ষ্য করে এমন ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে ‘বাস্তবতা’
মধুসূদনের মতে, এই আইন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। তিনি ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো ‘বিশেষ কৌশলগত সম্পর্ক’ বা বন্ধুত্বের ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে দেশটির অভিজাত মহলের একটি অংশের ‘বাস্তবতা যাচাই’ করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য ‘জি-২’ সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের আলোচনা এবং অন্য তিন দেশের তুলনামূলক ছোট অর্থনীতি ভারতের অবস্থানকে আরও আলাদা করে তুলেছে।
মধুসূদনের ভাষ্য, ভারতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হাতিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারত যে ব্যাপক বাজারসুবিধা দিয়েছে, প্রয়োজনে সেটিই ওয়াশিংটনের ওপর নয়াদিল্লির অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়েই উদ্বেগ
মধুসূদন আরও বলেন, বিলটি কংগ্রেসের অনুমোদনের মাধ্যমে এগোচ্ছে—এ বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন থাকলে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট থেকে স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বাস্তবে এই শুল্ক ব্যবহার করবেন কি না, সেটিকে তিনি মূল বিষয় হিসেবে দেখছেন না। তাঁর বক্তব্য, শুল্ক আরোপ করা হোক বা না হোক, আইনটি নিজেই ভারতের বিরুদ্ধে একটি বৈরী পদক্ষেপের ইঙ্গিত বহন করছে।
![]()
রাশিয়ার তেল কমালে বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব
ভারত রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি কমালে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও সতর্ক করেছেন মধুসূদন। তাঁর মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে ভারত রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি কমিয়ে দিলে বৈশ্বিক তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে চীন রাশিয়া থেকে আরও বেশি তেল আমদানি শুরু করতে পারে।
তাঁর যুক্তি, তেল বৈশ্বিক বাজারে পরস্পরবিনিময়যোগ্য হওয়ায় ভারতের আমদানি কমার ফলে সরবরাহের কাঠামো বদলালেও সামগ্রিক বাজারে এর প্রভাব স্পষ্ট হবে।
বিলটির পেছনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবও রয়েছে। রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তাঁর নামেই বিলটি পুনঃনামকরণ করা হয়। ইউক্রেন সফর শেষে ১১ জুলাই গ্রাহামের মৃত্যুর পর দুই দলের আইনপ্রণেতারা তাঁর ইউক্রেনপন্থী অবস্থানের প্রতি সম্মান জানিয়ে বিলটি এগিয়ে নেন।
বিলটিতে ১৯৯৬ সালের ইরান নিষেধাজ্ঞা আইন ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ দেশটির নেতা ও কর্মকর্তাদের, ধনকুবের এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১০০% শুল্ক হুমকি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করেছে; রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি নিয়ে নয়াদিল্লির ওপর বাড়ছে ওয়াশিংটনের চাপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















