প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর এলাকার মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা তৈরির শিল্প। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তারে নৌপথের ব্যবহার কমলেও কৃষিপণ্য পরিবহন ও সাম্প্রতিক নৌকাভিত্তিক পর্যটনের কারণে এই শিল্প এখনো টিকে আছে। বরং স্থানীয় বাজার পেরিয়ে বিদেশি ক্রেতার আগ্রহে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দেখা মিলেছে।
হাজারো পরিবারের জীবিকার উৎস
আটঘর এলাকায় নৌকা নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার পরিবার। স্থানীয় অর্থনীতিতে এই শিল্পের গুরুত্বও কম নয়। প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার নৌকা বিক্রি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ঐতিহ্যগতভাবে নৌকা তৈরিতে ব্যবহৃত হয় মেহগনি, কালিকরই, সোনাই, রেইনট্রি ও চাম্বলসহ বিভিন্ন ধরনের কাঠ। নৌপথের ওপর আগের মতো নির্ভরতা না থাকলেও পেয়ারা, আমড়া ও সুপারি মতো কৃষিপণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহনে এখনো এসব নৌকা ব্যবহৃত হয়।
এর পাশাপাশি নেছারাবাদে নৌকাভিত্তিক পর্যটনের বিকাশ নতুন করে এই শিল্পের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। শতাব্দীপ্রাচীন কারুশিল্পটি এখন স্থানীয় প্রয়োজনের পাশাপাশি পর্যটনের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

আটঘর নৌকার হাটে শত বছরের ঐতিহ্য
আটঘর বাজারে প্রতি শুক্রবার বসে দেশের অন্যতম পুরোনো ও জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট। শত বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই সাপ্তাহিক বাজারে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন।
বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত হাটটি সবচেয়ে জমজমাট থাকে। এ সময় বরিশাল, খুলনা ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার পাইকাররা নৌকা কিনতে আটঘরে ভিড় করেন।
নৌকার আকার, নকশা ও নির্মাণমান অনুযায়ী দাম নির্ধারিত হয়। সাধারণত ছোট নৌকার দাম প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হলেও বড় ও উন্নতমানের নৌকার দাম ১২ হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
এই হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি নেছারাবাদের নৌকা নির্মাণের ঐতিহ্য ও কারিগরি দক্ষতারও জীবন্ত প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কারিগররা নিজেদের হাতে গড়ে তুলছেন নৌকা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করছেন নির্মাণকৌশল।
জার্মান ক্রেতার আগ্রহে নতুন দিগন্ত
স্থানীয় নৌকা শিল্প সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগও পেয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে এক জার্মান পর্যটক নেছারাবাদে এসে স্থানীয় নৌকার নকশা ও কারিগরি দক্ষতায় মুগ্ধ হন। পরে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানা যায়, নিজের উদ্যোগেই তিনি ১০টি নৌকার অর্ডার দেন।

বরিশালের মোহাম্মদ জুবানের মধ্যস্থতায় তিনি নেছারাবাদের পরিচিত নৌকার কারিগর মো. আজিজুল হকের সঙ্গে চুক্তি করেন। প্রতিটি ১২ হাজার টাকা দরে মোট ১০টি নৌকা কেনেন ওই জার্মান ক্রেতা।
পরবর্তী সময়ে তিনি আরও ২০টি নৌকা আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেন। এতে স্থানীয় কারিগরদের মধ্যে বিদেশি বাজারে নেছারাবাদের নৌকার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।
ঐতিহ্য ধরে রেখেই রপ্তানির সম্ভাবনা
নেছারাবাদের নৌকা শিল্প দেখিয়ে দিচ্ছে, গ্রামীণ ঐতিহ্যনির্ভর একটি কারুশিল্প কীভাবে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখেই বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ নিতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি সহায়তা, কারিগরদের কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণ, সহজ অর্থায়ন, উন্নত বিপণনব্যবস্থা এবং রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরা সম্ভব।
আপাতত আটঘরের ছোট ছোট কারখানায় তৈরি হচ্ছে নৌকা, আর সেগুলো বিক্রি হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক হাটে। তবে পিরোজপুরের জলপথ থেকে জার্মান ক্রেতার হাতে পৌঁছে যাওয়া এই নৌকা ইঙ্গিত দিচ্ছে, শতাব্দীপ্রাচীন শিল্পটির ভবিষ্যৎ হয়তো বাংলাদেশের গ্রামীণ জলপথের সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















