পঞ্চাশ বছর আগে একটি বই আমেরিকার ইতিহাসকে শুধু নতুন করে বলেই থামেনি, বদলে দিয়েছিল ইতিহাসকে দেখার চোখও। বইটির নাম ‘রুটস’। লেখক অ্যালেক্স হেলি। আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় দাস হিসেবে নিয়ে আসা এক মানুষের বংশপরম্পরার অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে লেখা এই বই ১৯৭৬ সালে প্রকাশের পর লাখো মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল এক অস্বস্তিকর অথচ গভীর সত্য—আমেরিকায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের ইতিহাস দাসত্ব দিয়ে শুরু হয়নি। তারও বহু আগে ছিল একটি স্বাধীন জীবন, ছিল নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবার, সমাজ, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়।
২০২৬ সালের আগস্টে ‘রুটস’ প্রকাশের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই অর্ধশতক পেরিয়ে এসেও বইটি শুধু একটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে নয়, বরং শেকড় খোঁজার এক ঐতিহাসিক দলিল, পারিবারিক স্মৃতির এক অসাধারণ উত্তরাধিকার এবং পরিচয় অনুসন্ধানের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে ফিরে আসে।
একটি নদী, একটি গ্রাম এবং হারানো শেকড়ের সন্ধান
২০০১ সালের ফেব্রুয়ারি। নিজের ৩৯তম জন্মদিনের মাত্র দুই দিন আগে অ্যান হেলি একটি ছোট নৌকায় বসে গাম্বিয়া নদী ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। নদীর দুই পাশে ম্যানগ্রোভের গাছ। জায়গাটি তাঁর অচেনা, অথচ তাঁর মনে হচ্ছিল—তিনি যেন এমন এক স্মৃতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, যে স্মৃতি তাঁর নিজের জীবনে কখনো ঘটেনি, কিন্তু তাঁর রক্তের ভেতর বহু প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছে।
গন্তব্য ছিল গাম্বিয়ার জুফুরে গ্রাম।
এই গ্রামেই ৩৩ বছর আগে তাঁর চাচা অ্যালেক্স হেলি এসেছিলেন। সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত জন্ম দিয়েছিল ‘রুটস: দ্য সাগা অব অ্যান আমেরিকান ফ্যামিলি’ বইটির।
অ্যান হেলির জন্য জুফুরে পৌঁছানো ছিল কেবল একটি ভ্রমণ নয়। সেটি ছিল নিজের পরিবারের ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়া। নৌকা তীরে ভিড়তেই তিনি এমন অনেক মানুষের চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন, যাদের মুখে তিনি নিজের মুখের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন বহু দূরের আত্মীয়।
সেই মুহূর্তে তিনি কল্পনা করেছিলেন তাঁর চাচা অ্যালেক্স হেলির অনুভূতির কথা। তিনিও একদিন এই একই মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের পূর্বপুরুষের সন্ধান পেয়েছিলেন।
দাসত্বের আগে যে মানুষটি ছিলেন
‘রুটস’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটি আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের ইতিহাসকে দাসত্বের মুহূর্ত থেকে শুরু করেনি।
অ্যালেক্স হেলির অনুসন্ধানের কেন্দ্রে ছিলেন কুন্টা কিন্টে নামের এক তরুণ আফ্রিকান। পারিবারিক মুখে মুখে চলে আসা গল্প অনুযায়ী, তিনি গাম্বিয়ার এক গ্রামে বসবাস করতেন। তাঁর পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি এবং নিজের মানুষের সঙ্গে ছিল গভীর সম্পর্ক।
একদিন ১৭ বছর বয়সে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি আর ফিরে আসেননি। তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি ব্রিটিশ দাসজাহাজে করে আমেরিকায় পাঠানো হয়।
কুন্টা কিন্টের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। বরং আমেরিকায় তাঁর জীবনের সঙ্গে শুরু হয়েছিল এমন একটি বংশধারার গল্প, যা বহু প্রজন্ম পর অ্যালেক্স হেলির হাতে এসে পৌঁছায়।
এই অনুসন্ধানই হেলিকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিল—‘এই আফ্রিকান মানুষটি কে ছিলেন?’
প্রশ্নটি দেখতে যত ছোট, তার গভীরতা ছিল ততটাই বিশাল।
দাদির গল্প থেকে শুরু হয়েছিল অনুসন্ধান
অ্যালেক্স হেলির শৈশবের স্মৃতিতে তাঁর মাতামহী সিনথিয়া এবং তাঁর বোনদের মুখে শোনা গল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। পরিবারের প্রবীণ নারীরা রাতে বসে যে গল্প বলতেন, সেখানে ফিরে আসত আফ্রিকা থেকে নৌকায় করে আমেরিকায় আসা এক মানুষের কথা।
তার নাম ছিল কিন্টে।
তারপর সেই গল্পে আসে বেল, কিজি, জর্জ—একটি পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম। কথাগুলো ছিল মুখে মুখে বয়ে চলা পারিবারিক স্মৃতি। কিন্তু অ্যালেক্সের কাছে এগুলো নিছক গল্প ছিল না। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, এই গল্পের পেছনে বাস্তব ইতিহাস আছে।
তখন আজকের মতো সহজে বংশপরিচয় খুঁজে বের করার প্রযুক্তি ছিল না। ছিল না আধুনিক বংশগত পরীক্ষার সহজ সুযোগ। ছিল পুরোনো নথি, গ্রন্থাগারের মাইক্রোফিল্ম, গির্জার নথিপত্র এবং সবচেয়ে বড় সম্পদ—পরিবারের স্মৃতি।
এই স্মৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক ছিলেন জর্জিয়া অ্যান্ডারসন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তিনি সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন আফ্রিকান পূর্বপুরুষের গল্প এবং কিছু শব্দ।
‘কাম্বি বোলঙ্গো’ মানে নদী। ‘কোরা’ ছিল এক ধরনের তারের বাদ্যযন্ত্র।
এই শব্দগুলো অ্যালেক্স হেলিকে ইঙ্গিত দিয়েছিল গাম্বিয়ার ম্যান্ডিঙ্কা ভাষার দিকে।
তারপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধান।
জুফুরেতে গিয়ে ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে উঠল
১৯৬৭ সালের এপ্রিল মাসে অ্যালেক্স হেলি পৌঁছেছিলেন জুফুরেতে। সেখানে এক গৃহীত ইতিহাসবর্ণনাকারী, অর্থাৎ গৃহস্থালি স্মৃতি ও বংশপরম্পরার রক্ষক, তাঁকে শুনিয়েছিলেন গ্রামের পুরোনো ইতিহাস।
সেই ইতিহাসে ছিল ১৭ বছর বয়সী কুন্টা কিন্টের কথা—যে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।
অ্যালেক্স হেলির কাছে মুহূর্তটি ছিল যেন শতাব্দীর দূরত্ব পেরিয়ে পূর্বপুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ।
পরবর্তী অনুসন্ধানে তিনি কুন্টা কিন্টের আমেরিকায় পৌঁছানোর ইতিহাসের সঙ্গে পারিবারিক স্মৃতির যোগসূত্র খুঁজে পান। দাসজাহাজে করে বহু আফ্রিকানকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁদের অনেকে সমুদ্রযাত্রার ভয়াবহতা থেকে বেঁচে উঠতে পারেননি।
কিন্তু কুন্টা কিন্টের গল্প বেঁচে ছিল।
বেঁচে ছিল তাঁর নাম।
বেঁচে ছিল তাঁর ভাষার কিছু শব্দ।
বেঁচে ছিল তাঁর গ্রামের স্মৃতি।
আর সবচেয়ে বড় কথা, বেঁচে ছিল তাঁর বংশধরদের মনে নিজের উৎস জানার আকাঙ্ক্ষা।
‘রুটস’ শুধু একটি পরিবারের গল্প ছিল না
১৯৭৬ সালে প্রকাশের পর ‘রুটস’ দ্রুত পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। প্রথম সাত মাসেই বইটির প্রায় ১৫ লাখ কপি বিক্রি হয়। পরে বিক্রি পৌঁছে যায় প্রায় ৮০ লাখে। বইটি জাতীয় পুরস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা পায় এবং ৩৫টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়।
পরে বইটি নিয়ে নির্মিত টেলিভিশন ধারাবাহিক আমেরিকাজুড়ে আলোড়ন তোলে।
১৯৭৭ সালে ধারাবাহিকটির সম্প্রচার যেন একটি জাতিকে নিজের অতীতের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ টেলিভিশন-সমৃদ্ধ পরিবার এর ধারাবাহিক পর্বগুলো দেখেছিল।
অনেক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান পরিবারের স্মৃতিতে সেই সময়টি আজও বিশেষভাবে বেঁচে আছে। তাঁদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, ‘রুটস’-এর একটি পর্ব দেখার পর পরদিন স্কুলে গিয়ে তাঁরা রাগ, অপমান ও ইতিহাসের ভার অনুভব করতেন।
কারণ বইটি শুধু অতীতের কথা বলেনি। সেটি বর্তমান আমেরিকার কাছেও প্রশ্ন রেখেছিল—একটি দেশের ইতিহাসে কার গল্প লেখা হয়, আর কার গল্প মুছে যায়?
‘রাগের আগে’—একটি নামের গভীর অর্থ
অ্যালেক্স হেলি প্রথমদিকে বইটির জন্য যে নামটি ভেবেছিলেন, তার অর্থ ছিল ‘এই রাগের আগে’।
নামটির মধ্যে ছিল বহুস্তরীয় অর্থ।
আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের ইতিহাসকে যখন কয়েক শতাব্দীর দাসত্ব, বঞ্চনা ও নাগরিক অধিকারহীনতার ভেতর দিয়ে দেখা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাগ জন্ম নেয়।
কিন্তু তারও আগে কী ছিল?
ছিল স্বাধীনতা।
ছিল রাজা ও রানি।
ছিল নিজস্ব ভাষা।
ছিল নিজস্ব সংস্কৃতি।
ছিল পরিবার।
ছিল সমাজ।
ছিল এমন একটি জীবন, যেখানে মানুষ নিজেকে কারও সম্পত্তি হিসেবে চিনত না।
‘রুটস’ সেই ‘আগের’ পৃথিবীটিকে সামনে নিয়ে এসেছিল।
এই কারণেই বইটির তাৎপর্য শুধু দাসত্বের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—কোনো মানুষের পরিচয় তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া অত্যাচারের ইতিহাস দিয়ে শুরু হয় না।
ইতিহাসের নিখুঁত তারিখ নয়, বড় সত্যটি গুরুত্বপূর্ণ
‘রুটস’ প্রকাশের পর ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ বইটির কিছু সময়কাল, ঘটনা ও কথোপকথনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। মুখে মুখে চলে আসা ইতিহাসের সবকিছু শতভাগ নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত থাকে না—এটি ইতিহাসচর্চার একটি স্বীকৃত বাস্তবতা।
অ্যালেক্স হেলি নিজেও স্বীকার করেছিলেন, তাঁর বইয়ে গবেষণার পাশাপাশি কিছু সাহিত্যিক নির্মাণ রয়েছে।
কিন্তু এখানেই ‘রুটস’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে।
একটি পরিবারের শত বছরের স্মৃতি যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছায়, তখন শব্দ বদলাতে পারে, তারিখ বদলাতে পারে, কোনো ঘটনার বিবরণে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু তার মধ্যেও একটি বৃহত্তর সত্য টিকে থাকতে পারে।
সেটি হলো—মানুষ তার পূর্বপুরুষকে মনে রেখেছে।
সেই স্মৃতি হারিয়ে যেতে দেয়নি।
আর সেই স্মৃতিই একদিন একজন লেখককে সমুদ্র পেরিয়ে নিজের পূর্বপুরুষের গ্রামে নিয়ে গেছে।
আমেরিকার কাছে ‘রুটস’-এর আয়না
‘রুটস’ প্রকাশের সময় আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধ, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং জাতিগত বৈষম্য নিয়ে গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
এই পরিবেশে বইটি অনেকের কাছে শুধু একটি পারিবারিক কাহিনি ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল জাতীয় আত্মপরিচয়ের আয়না।
কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা নিজেদের ইতিহাসের এমন একটি শুরু দেখতে পেলেন, যা দাসত্বের আগে।
আর শ্বেতাঙ্গ আমেরিকার সামনে উঠে এল এমন এক ইতিহাস, যার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক কাঠামোর গভীর সম্পর্ক ছিল।
অর্থাৎ ‘রুটস’ একই সঙ্গে স্মৃতি ও প্রশ্ন—দুটিই হয়ে উঠেছিল।
পঞ্চাশ বছর পরও শেকড়ের প্রয়োজন ফুরোয়নি
‘রুটস’ প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যবসা, উচ্চশিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। দেশটি একজন কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টও পেয়েছে।
তবু প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য নিয়ে লড়াই শেষ হয়নি।
আজও বহু মানুষ নিজেদের বংশপরিচয় খুঁজছেন। ২০২২ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, বংশপরিচয় অনুসন্ধান করা কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের বড় অংশ পরিবারে কথা বলার মাধ্যমে সেই অনুসন্ধান শুরু করেছেন।
এ যেন কুন্টা কিন্টে থেকে কিজি, কিজি থেকে পরবর্তী প্রজন্ম, আর সেখান থেকে অ্যালেক্স হেলি—প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক দীর্ঘ কথোপকথনেরই আধুনিক রূপ।
অ্যালেক্স হেলির শেষ বার্তাটি
অ্যান হেলির কাছে তাঁর চাচার দেওয়া একটি পুরোনো বইয়ের কপি আজও বিশেষ স্মৃতির মতো সংরক্ষিত।
বইটির প্রথম পাতায় অ্যালেক্স হেলি লিখেছিলেন, পরিবারের পরবর্তী লেখকের উদ্দেশে ভালোবাসার একটি বার্তা।
সেই বার্তাকে অ্যান আজও একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।
গল্প বলে যেতে হবে।
পূর্বপুরুষদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
কারণ যে ইতিহাস বলা হয় না, একসময় সেটি হারিয়ে যেতে পারে।
আর যে ইতিহাস বারবার বলা হয়, সেটি শুধু অতীতকে সংরক্ষণ করে না—ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও নিজের পরিচয় বুঝতে সাহায্য করে।
‘রুটস’ নিষিদ্ধ করার চেষ্টা এবং ফিরে আসা
এই কারণেই সাম্প্রতিক সময়েও ‘রুটস’ নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
টেনেসির নক্স কাউন্টিতে চলতি বছরের বসন্তে বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার থেকে বইটি সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে দ্রুত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মাত্র দশ দিনের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
ঘটনাটি যেন ‘রুটস’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আবারও সামনে নিয়ে আসে।
কোনো বইকে তাক থেকে সরিয়ে রাখা যায়। কোনো ইতিহাসকে কিছু সময়ের জন্য নীরব করা যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে কোনো গল্পকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না।
কারণ ইতিহাস শুধু কাগজে থাকে না।
ইতিহাস থাকে পরিবারের কথায়।
থাকে পুরোনো ছবিতে।
থাকে নামের মধ্যে।
থাকে ভাষার হারিয়ে যাওয়া শব্দে।
থাকে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো গ্রামের স্মৃতিতে।
শেকড় মানে শুধু অতীত নয়
অ্যালেক্স হেলির ‘রুটস’ আজ পঞ্চাশ বছরে পা দিয়ে আমাদের সামনে একটি সহজ অথচ গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—আমরা কোথা থেকে এসেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বংশপরিচয়ের তালিকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষ হিসেবে নিজের অবস্থান বোঝা।
নিজের পূর্বপুরুষের আনন্দ, বেদনা, সংগ্রাম ও স্বপ্নকে চিনতে পারা।
একজন মানুষ যখন নিজের শেকড় খুঁজে পায়, তখন সে শুধু অতীতকে আবিষ্কার করে না; নিজের বর্তমানকেও নতুন করে বুঝতে শেখে।
জুফুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে অ্যান হেলি যে অনুভূতি পেয়েছিলেন, সেটিই হয়তো ‘রুটস’-এর সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার।
তিনি সেখানে শুধু তাঁর চাচার অনুসন্ধানের শেষপ্রান্ত খুঁজে পাননি।
তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের একটি অংশ।
পঞ্চাশ বছর পরও তাই ‘রুটস’ একটি বইয়ের নামের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি হারিয়ে যাওয়া মানুষের নাম ফিরিয়ে আনার গল্প। এটি স্মৃতির বিরুদ্ধে বিস্মৃতির লড়াই। এটি ইতিহাসের পাতায় অনুপস্থিত মানুষদের আবার দৃশ্যমান করার প্রয়াস।
আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি মনে করিয়ে দেয়—মানুষকে তার কষ্ট দিয়ে চেনার আগে তার শেকড়কে চিনতে হয়।
কারণ দাসত্বের আগে মানুষটি ছিল স্বাধীন।
অন্ধকারের আগে ছিল আলো।
আর ইতিহাসের কোনো একটি অধ্যায়ের আগে ছিল আরও দীর্ঘ এক গল্প।
সেই গল্পই অ্যালেক্স হেলি খুঁজেছিলেন।
সেই গল্পই ‘রুটস’ পৃথিবীকে শুনিয়েছিল।
আর সেই গল্পই পঞ্চাশ বছর পরও আমাদের বলে যায়—নিজের শেকড়ের গল্প বলা কখনো শেষ হয় না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















