থাইল্যান্ডে চীনা কূটনীতিকদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি কেবল একটি শব্দের ব্যবহারকে ঘিরে নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—একটি বিদেশি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা কতটা পর্যন্ত কোনো দেশের নাগরিকদের ভাষা, মতপ্রকাশ কিংবা সাংস্কৃতিক পরিসর নিয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন?
ব্যাংককে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত থাই জনগণকে “গ্রে চাইনিজ” শব্দটি ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শব্দটি বৈষম্যমূলক এবং এর মাধ্যমে সব চীনা নাগরিককে একই পরিচয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা থাইল্যান্ডের জনপরিসরে শব্দটির প্রচলিত অর্থকে পুরোপুরি ধারণ করে না।
“গ্রে চাইনিজ” বলতে সাধারণত থাইল্যান্ডে অপরাধমূলক বা আইন এড়িয়ে চলা কর্মকাণ্ডে জড়িত কিছু চীনা নাগরিককে বোঝানো হয়। এর মধ্যে প্রতারণা, অপহরণ, অবৈধ ব্যবসা কিংবা সীমান্তপারের অপরাধী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা থাকতে পারেন। ফলে শব্দটি কোনো জাতিগোষ্ঠীর প্রতিটি সদস্যকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না। বরং এটি এমন একটি শ্রেণিকে নির্দেশ করে, যারা আইনের স্পষ্ট সীমানার বাইরে কিংবা তার ধূসর অঞ্চলে কাজ করে।
রাষ্ট্রদূতের আপত্তির জায়গাটি তাই বোঝা গেলেও, এর সমাধান হতে পারে না মানুষের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা।
কূটনীতি বনাম জনপরিসরের স্বাধীনতা
থাইল্যান্ড এমনিতেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজপরিবার-সংক্রান্ত কঠোর আইনের কারণে কিছু বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি যখন কোনো নির্দিষ্ট শব্দ পরিহারের আহ্বান জানান, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি কেবল কূটনৈতিক অনুরোধ, নাকি ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপের সংস্কৃতি তৈরির চেষ্টা?
কোনো শব্দকে অপছন্দ করা এবং সেটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি—দুটি এক জিনিস নয়। চীনা নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈষম্য বা বর্ণবাদ হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ও সামাজিক প্রতিকার অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা করার জন্য ব্যবহৃত একটি শব্দকে কেবল বিদেশি সরকারের আপত্তির কারণে জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া ভিন্ন বিষয়।
চীন নিজেই এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিচালনা করে যেখানে কিছু বিষয় নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা কঠোরভাবে সীমিত। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংকে উইনি দ্য পুহের সঙ্গে তুলনা, তিব্বত, উইঘুর জনগোষ্ঠী কিংবা তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ঘটনা—চীনে এসব বিষয়ে মুক্ত ও সমালোচনামূলক আলোচনা নানা বাধার মুখে পড়ে। থাইল্যান্ডের মতো একটি সার্বভৌম দেশে একই ধরনের সংবেদনশীলতার মানদণ্ড চাপিয়ে দেওয়া হলে তা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করবে।
সংস্কৃতি ও সংবাদমাধ্যমেও চাপ
সমস্যাটি শুধু “গ্রে চাইনিজ” শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছরে থাইল্যান্ডে চীনা দূতাবাসের সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমসংক্রান্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগও সামনে এসেছে।
২০২৩ সালে চীনের প্রতিবাদের পর থাই পাবলিক ব্রডকাস্টার থাইপিবিএস তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার সরিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যাংককের একটি শিল্প প্রদর্শনীতে চীনা দূতাবাসের চাপের অভিযোগ ওঠে। হংকং, তিব্বত ও শিনজিয়াং নিয়ে কাজ করা শিল্পকর্ম এবং প্রদর্শনীর বর্ণনাতেও হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল।
এ বছর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত তাইওয়ানভিত্তিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকদের কাছ থেকেও তাইওয়ানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নাম সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। এবার আয়োজকেরা সেই দাবি মানেননি।
এই ঘটনাগুলোর গুরুত্ব কোনো একটি প্রদর্শনী বা চলচ্চিত্র উৎসবের চেয়েও বড়। কারণ, একটি দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কী দেখাবে, সংবাদমাধ্যম কী প্রচার করবে কিংবা নাগরিকেরা কোন শব্দ ব্যবহার করবে—এসব সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সেই দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও জনগণের হাতে থাকা উচিত।

গণমাধ্যমের নীরবতাও উদ্বেগের
আরেকটি অস্বস্তিকর দিক হলো থাই গণমাধ্যমের একটি অংশের নীরবতা। চীনা দূতাবাসের আয়োজিত বিভিন্ন সফর ও কর্মসূচির সুবিধাভোগী সংবাদমাধ্যমগুলোর কেউ কেউ এসব বিতর্কিত ঘটনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেনি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সরকারের চাপ থেকে মুক্ত থাকার বিষয় নয়। অর্থনৈতিক সুবিধা, রাজনৈতিক সম্পর্ক কিংবা বিদেশি কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেও যদি সংবাদ নির্বাচন প্রভাবিত হয়, তাহলে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
থাইল্যান্ড-চীন সম্পর্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে চীনের ভূমিকা ক্রমেই বড় হচ্ছে। কিন্তু কোনো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানেই সেই দেশের রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক প্রভাবকে সীমাহীনভাবে গ্রহণ করা নয়।
বরং সম্পর্ক যত গভীর হয়, পারস্পরিক সম্মানের প্রয়োজন তত বাড়ে।
একটি ঘটনাই বড় সংকেত
ব্যাংককে সাম্প্রতিক এক বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এক থাই নিরাপত্তাকর্মী ও এক চীনা নাগরিকের মধ্যে সংঘর্ষ এই পরিবর্তিত পরিবেশকে আরও স্পষ্ট করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ে। চীনা দূতাবাস দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও, প্রকাশ্যে থাকা ভিডিওতে চীনা নাগরিকটির পক্ষ থেকেই প্রথম শারীরিক আক্রমণের দৃশ্য দেখা যায় বলে লেখকের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু তাতেও উত্তেজনা কমেনি। বরং দুই দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারস্পরিক অপমান, জাতিগত বিদ্বেষ এবং দুই দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ে।
এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন মনে হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। কারণ, সাধারণ মানুষ যখন মনে করতে শুরু করে যে বিদেশি একটি শক্তি তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছে, তখন সেই অসন্তোষ দ্রুত বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে।
চীনের জন্যও এটি সতর্কবার্তা
থাইল্যান্ডের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং এ সম্পর্ক দুই দেশের জন্যই অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু টেকসই সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে না এমন একটি ধারণা যে শক্তিশালী পক্ষ অন্য পক্ষকে কী বলা যাবে, কী লেখা যাবে বা কী প্রদর্শন করা যাবে তা ঠিক করে দেবে।
“গ্রে চাইনিজ” শব্দটি কেউ ব্যবহার করতে না চাইলে সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ যদি মনে করেন শব্দটি অন্যায্য বা বৈষম্যমূলক, তিনিও যুক্তি দিয়ে তার বিরোধিতা করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে একজন বিদেশি রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য অনুরোধ যখন থাই জনগণের ভাষা ব্যবহারের প্রশ্নে এসে পড়ে, তখন বিষয়টি আর নিছক শব্দচয়ন থাকে না।
থাইল্যান্ডের সরকারও কোনো বিদেশি সরকারের চাপে কোনো শব্দকে অপরাধে পরিণত করতে পারে না। সেটি করলে শুধু একটি শব্দের ব্যবহার সীমিত হবে না; বরং থাই সার্বভৌমত্ব ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে।
চীনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কূটনীতি সম্ভবত অন্য কিছু—থাই সমাজকে কী ভাবতে হবে তা বলা নয়, বরং এমন আচরণ করা যাতে থাই জনগণ নিজেরাই চীনকে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে দেখতে পারে।
কারণ শেষ পর্যন্ত “গ্রে চাইনিজ” নিয়ে বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, থাইল্যান্ডের মানুষ কি মনে করবে তাদের দেশে চীনের প্রভাব কেবল অর্থনীতি ও কূটনীতির মধ্যে সীমিত, নাকি তা ধীরে ধীরে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও প্রবেশ করছে। সেই প্রশ্নের উত্তর থাই জনগণই দেবে।
প্রভিত রোজানাপ্রুক 



















