০৮:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো: প্রশাসনিক সমাধান, নাকি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরীক্ষা? ২০২৭ সালে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ইন্দোনেশিয়ার, কমছে বাজেট ঘাটতিও চীনে ভক্সওয়াগেনের ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনায় নতুন শঙ্কা, কমছে বিক্রি ডানপন্থী উত্থানে এশিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাইল্যান্ডে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের নতুন উদ্যোগ, তবু বড় প্রশ্নে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা রেকিয়াভিকে ‘যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে’: পারমাণবিক অস্ত্র বিলোপের স্বপ্নে রিগ্যান-গর্বাচেভ গ্যাস সংকটে হবিগঞ্জে ১৭১ কারখানা বন্ধ, কর্মহীন লক্ষাধিক শ্রমিক কুষ্টিয়ায় বালুবাহী যান পদ্মায়, নিখোঁজ ৮ বছরের শিশু ১৫ আগস্ট ঘিরে ঢাকায় কঠোর নিরাপত্তা, মাঠে ডিএমপির বিশেষ ইউনিট নেপালের নতুন রাজনৈতিক তারকার আলো কেন ম্লান হয়ে আসছে

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো: প্রশাসনিক সমাধান, নাকি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরীক্ষা?

শ্রীলঙ্কায় সুপ্রিম কোর্ট ও আপিল কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর প্রস্তাবকে কেবল সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক বিরোধ, কিংবা কোনো দুই মতামতদাতার বিতর্ক হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। এটি মূলত একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন—রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তার সঙ্গে যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচারকদের অবসরের বয়স কখনোই পরিবর্তন করা যাবে না—এমন কোনো যুক্তি টেকসই নয়। বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে বিচারকদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে। বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ, মামলার জট, অভিজ্ঞ বিচারকের ঘাটতি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন কিংবা জটিলতর আইনি পরিবেশের মতো বাস্তব কারণ অবসরের বয়স পুনর্বিবেচনার যৌক্তিক ভিত্তি হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্নটি সেখানে শেষ হয় না। আসল প্রশ্ন হলো—কোন পরিস্থিতিতে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের জন্য এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে?

শ্রীলঙ্কার সংবিধানের ১০৭(৫) অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৫ এবং আপিল কোর্টের বিচারকদের ৬৩ বছর নির্ধারিত। ফলে এটি সাধারণ সরকারি চাকরির অবসরের বয়সের মতো কোনো প্রশাসনিক বিধান নয়। উচ্চ আদালতের বিচারকরা এমন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, যার আওতায় সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডও বিচারিক পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে পারে।

সুতরাং বিচারকের মেয়াদ বা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে কোনো পরিবর্তন সরাসরি বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত।

ক্ষমতা থাকা আর সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বশীল হওয়া এক বিষয় নয়

এখানেই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি তৈরি হয়। সংসদের কাছে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকা মানেই এই নয় যে, সেই ক্ষমতা যেকোনো সময়ে যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা সাংবিধানিকতার দৃষ্টিতে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।

সাংবিধানিকতাবাদ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না। এর মূল উদ্দেশ্যই হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারকে এমন কিছু নীতি ও সীমার মধ্যে রাখা, যাতে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ইতিহাস এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কবার্তা দেয়। অতীতে সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের ধরন বদলেছে। সেই অভিজ্ঞতার শিক্ষা এই নয় যে সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে না। বরং শিক্ষা হলো—সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতাও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হয়।

একটি সরকারের হাতে যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাহলে তার সংবিধান সংশোধনের সক্ষমতা অবশ্যই বেশি। কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে বিচার বিভাগের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা কমানোর বাড়তি নৈতিক অধিকার দেয় না। বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা যত বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার প্রয়োজন ততই বাড়ে।

সময় ও প্রক্রিয়াও সাংবিধানিক প্রশ্ন

অবসরের বয়স ৬৭ হবে, ৬৫ থাকবে—এই সংখ্যাগত বিতর্কের বাইরে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো সময় নির্বাচন।

একই ধরনের সংস্কার ভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংবিধানিক তাৎপর্য বহন করতে পারে। যদি অবসরের বয়স পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক পর্যালোচনার অংশ হয়, ব্যাপক জনপরামর্শের পর আসে, ভবিষ্যতে নিয়োগ পাওয়া বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট বর্তমান বিচারকের মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না থাকে, তাহলে তার প্রকৃতি এক রকম।

অন্যদিকে, যদি দায়িত্বে থাকা বিচারকদের মেয়াদ অবিলম্বে বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং সেই পরিবর্তন দ্রুততার সঙ্গে আনা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এটি কি সত্যিই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নাকি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তৈরি একটি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা?

এ কারণেই অন্য দেশের উদাহরণ দেখিয়ে বলা যথেষ্ট নয় যে কোথাও বিচারকরা ৭০ বা ৭৫ বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তুলনামূলক সাংবিধানিক বিশ্লেষণে শুধু সংখ্যাটি নয়, সেই সংখ্যা কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল, পরিবর্তনের আগে কী ধরনের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল, সেটি ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য ছিল কি না এবং দায়িত্বে থাকা বিচারকদের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছিল কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

Daily Mirror - Sri Lanka Latest Breaking News and Headlines - Print Edition  Decision to extend the retirement age of judges: A well-meaning policy  implemented in Gotabaya style

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবতার পাশাপাশি বিশ্বাসের বিষয়

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বাস্তবে স্বাধীন থাকার বিষয় নয়; জনগণের কাছে সেই স্বাধীনতার বিশ্বাসযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একজন বিচারক বাস্তবে রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে কাজ করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে তার পদে থাকার মেয়াদ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তাহলে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এটি কোনো সামান্য বিষয় নয়। আইনের শাসন টিকে থাকে শুধু আদালতের রায়ের ওপর নয়, আদালত যে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এই বিশ্বাসের ওপরও।

শ্রীলঙ্কার প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে কমনওয়েলথ ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ল’এশিয়ার মতো আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের আপত্তি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের সমার্থক নয়। বরং তারা এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকির কথা বলছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণা ও জনআস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এতে সরকার অনিয়ম করছে—এমন সিদ্ধান্ত অবশ্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। কিন্তু এর অর্থ হলো, সরকারকে এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে যাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিক সন্দেহের সুযোগও যতটা সম্ভব কমে যায়।

মামলার জট একটি বাস্তব সমস্যা, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পক্ষে সরকারের অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো বিপুল মামলাজট মোকাবিলা করা। প্রায় ১১ লাখ মামলা জমে থাকার বিষয়টি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর রাষ্ট্রীয় সমস্যা। বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হলে ন্যায়বিচারের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কিন্তু মামলাজটের অস্তিত্ব নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে দায়িত্বে থাকা উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

কারণ মামলাজট সাধারণত একটি বহুমাত্রিক ও কাঠামোগত সমস্যা। বিচারকের সংখ্যা কম হওয়া এর একটি কারণ হতে পারে। কিন্তু আদালতে শূন্য পদ পড়ে থাকা, অবকাঠামোর ঘাটতি, পুরোনো বিচারিক প্রক্রিয়া, বারবার শুনানি পেছানো, গবেষণা ও প্রশাসনিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা, তদন্তে বিলম্ব, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে দীর্ঘসূত্রতা, ফরেনসিক ও সরকারি বিশ্লেষণ কার্যক্রমে সময় লাগা, আদালতের নথি ডিজিটাল না হওয়া এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দুর্বলতাও মামলার জট বাড়াতে পারে।

অতএব, একজন অভিজ্ঞ বিচারককে আরও দুই বছর দায়িত্বে রাখলে কিছু অতিরিক্ত বিচারিক সক্ষমতা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এতে মামলাজটের উৎপাদনকারী পুরো ব্যবস্থাটি বদলে যায় না।

যদি বিচারকের ঘাটতি থাকে, শূন্য পদ পূরণ কেন নয়?

এখানে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে আসে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই বিচারকের সংকটে ভুগে থাকে, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ কেন বিদ্যমান শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা হবে না?

শীর্ষ আদালতগুলোতে শূন্য পদ থাকলে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে বর্তমান ব্যক্তিদের আরও কয়েক বছর রাখার মধ্যে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য রয়েছে।

অভিজ্ঞতা অবশ্যই বিচারব্যবস্থার সম্পদ। কিন্তু বিচার বিভাগকে একই সঙ্গে উত্তরসূরি তৈরি, প্রজন্মগত নবায়ন এবং নতুন বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগও রাখতে হয়। শীর্ষ পর্যায়ের একজন বিচারকের মেয়াদ বাড়ালে তার প্রভাব নিচের স্তরের পদোন্নতি ও নিয়োগ কাঠামোতেও পড়তে পারে।

তাই সরকারকে তথ্য দিয়ে দেখাতে হবে—প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবে কতটা মামলার নিষ্পত্তি বাড়াবে, বিচার বিভাগের সক্ষমতা কতটা উন্নত করবে এবং এটি কি সত্যিই জনবল সমস্যার সমাধান করবে, নাকি কেবল সমস্যাটিকে কয়েক বছর পিছিয়ে দেবে।

বিদেশি উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে হবে, সংখ্যা ধার করতে নয়

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পক্ষে অন্য দেশের দৃষ্টান্ত দেওয়া অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সাংবিধানিক সংস্কার কখনোই এমনভাবে করা যায় না যে অন্য দেশে একটি সংখ্যা কার্যকর, তাই একই সংখ্যা দেশে প্রয়োগ করলেই সংস্কার সফল হবে।

যুক্তরাজ্যে বিচারকদের বাধ্যতামূলক অবসরের বয়স পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ পরামর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। এই উদাহরণ থেকে মূল শিক্ষা বয়সের সংখ্যা নয়, সংস্কারের পদ্ধতি।

অন্য গণতন্ত্রগুলো কীভাবে বিচারকদের মেয়াদ নির্ধারণ করেছে, কখন পরিবর্তন করেছে, কী ধরনের পরামর্শ নিয়েছে এবং পরিবর্তনটি বর্তমান বিচারকদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করেছে কি না—এসবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া অনেক সময় ফলাফলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের সিদ্ধান্ত আগামী সরকারের হাতে কী ক্ষমতা দেবে?

এই বিতর্কের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন সম্ভবত নজিরের।

ধরা যাক, বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সৎ এবং বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তারপরও সংসদকে ভাবতে হবে—এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্য কী ধরনের ক্ষমতার নজির তৈরি করবে?

একটি ভবিষ্যৎ সরকার হয়তো কোনো বিচারককে রাজনৈতিকভাবে অসুবিধাজনক মনে করতে পারে। তখন কি তারা অবসরের বয়স কমাতে চাইবে? কোনো বিচারককে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক মনে হলে কি তার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারবে? আদালতের কাঠামো বা বিচারকদের দায়িত্বকাল কি রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী বারবার পরিবর্তন করা সম্ভব হবে?

সাংবিধানিক নকশা শুধু বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, আগামী দিনে তারা ক্ষমতায় নাও থাকতে পারেন। তাই একটি নিয়মের মূল্যায়ন করতে হয় সবচেয়ে প্রতিকূল ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতেও সেটি কতটা নিরাপদ থাকবে—এই প্রশ্ন দিয়ে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিচারকদের সুবিধা নয়

আরেকটি ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। বিচারকদের অবসরের বয়স নিয়ে আপত্তিকে যদি বিচারক বা আইনজীবীদের পেশাগত সুবিধা রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বিতর্কের মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নয়। এটি নাগরিকের অধিকার।

একজন নাগরিক নির্বাহী বিভাগের বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে গেলে তার প্রয়োজন স্বাধীন বিচারক। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললে তার প্রয়োজন স্বাধীন বিচারক। ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হলেও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দমনমূলক ক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া একজন অভিযুক্তের জন্যও একই নিশ্চয়তা দরকার।

সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ, বিরোধী রাজনীতিক কিংবা সাধারণ মানুষ—সরকারের কোনো সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন এমন একটি বিচারব্যবস্থা, যার ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের সন্দেহ নেই।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—বিচারকরা আরও দুই বছর চাকরি করবেন কি না। প্রশ্ন হলো—সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর সাংবিধানিক কর্তৃত্ব প্রয়োগকারী বিচারকদের বিষয়ে জনগণ সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ধরে রাখতে পারবে কি না।

সংস্কারের বিরোধিতা নয়, ভালো সংস্কারের দাবি

প্রস্তাবিত অবসরের বয়স বৃদ্ধির বিরোধিতা করার অর্থ বিচারব্যবস্থার সংস্কারের বিরোধিতা করা নয়। বরং শ্রীলঙ্কার বিচারব্যবস্থায় দ্রুত এবং গভীর সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

বিদ্যমান শূন্য পদ পূরণ, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনা চালু, আদালতের নথি ডিজিটাল করা, বিচারকদের গবেষণা ও প্রশাসনিক সহায়তা বৃদ্ধি, বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ করা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের কার্যক্রম দ্রুত করা এবং ফরেনসিক ও সরকারি বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সক্ষমতা বাড়ানো—সবই এই সংস্কারের অংশ হতে পারে।

এর পাশাপাশি আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক তৈরি করা প্রয়োজন।

যদি বিচারকদের অবসরের বয়স সত্যিই পরিবর্তন করা দরকার হয়, তাহলে সেটিকে বৃহত্তর বিচারিক সংস্কারের অংশ করা উচিত। একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, বিচার বিভাগ ও আইনজীবী সংগঠনের মতামত, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের বক্তব্য এবং সাধারণ জনগণের মতামত নেওয়া যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন নিয়ম ভবিষ্যতে নিয়োগ পাওয়া বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করার বিষয়টি বিবেচনা করা।

‘সংস্কারের পর নিয়োগ পাওয়া বিচারকরা ৬৭ বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন’—এই সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক চরিত্র এক ধরনের। আর ‘বর্তমানে যে বিচারকরা ৬৫ বা ৬৩ বছরের অবসরের নিয়মে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হলো’—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রথমটি ভবিষ্যৎ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। দ্বিতীয়টি বর্তমান পদধারীদের তাৎক্ষণিক সুবিধার প্রশ্ন উত্থাপন করে।

UN raises Red Flag over Sri Lanka's move to Extend Sitting Judges' Tenure -  Newswire

সরকারের উচিত তথ্য প্রকাশ করা

সরকার যদি সত্যিই মনে করে যে এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য প্রশাসনিক দক্ষতা ও বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো, তাহলে ব্যাপক জনপরামর্শকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

বরং সরকার প্রকাশ করতে পারে—একজন বিচারককে আরও এক বছর বা দুই বছর দায়িত্বে রাখলে আনুমানিক কত মামলা নিষ্পত্তি হতে পারে, বর্তমানে কত বিচারিক পদ শূন্য, নতুন নিয়োগের মাধ্যমে কতটা সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব, বিচারকদের বয়সভিত্তিক কাঠামো কী, নতুন বিচারক নিয়োগের প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে এবং অতিরিক্ত মেয়াদে বিচারকদের রাখার খরচ বনাম নতুন বিচারক নিয়োগের খরচ কত।

পাশাপাশি বিচারকদের পদোন্নতি ও আদালতের সামগ্রিক কার্যকারিতার ওপর প্রস্তাবিত পরিবর্তনের প্রভাবও প্রকাশ করা যেতে পারে।

তথ্য থাকলে বিতর্কটি রাজনৈতিক অভিযোগের স্তর থেকে নীতিগত আলোচনায় উন্নীত হবে। কিন্তু তথ্যের বদলে শুধু রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর এত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন দাঁড় করানো উচিত নয়।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

শ্রীলঙ্কা অতীতে দেখেছে, শক্তিশালী রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কীভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো বদলে দিতে পারে। বর্তমান সরকারের জন্য তাই এই বিতর্ক একটি বিশেষ পরীক্ষা।

যে সরকার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছ থেকে প্রত্যাশা আরও বেশি। তাদের দেখাতে হবে যে সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করার ধরন আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হবে না।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে দ্রুত একটি সংশোধনী পাস করাই রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ নয়। বরং এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় না থাকলেও টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যতের ভিন্নমতাবলম্বী সরকারের হাতেও অপব্যবহারের সুযোগ কম রাখবে—সেটিই অধিক পরিণত রাজনৈতিক আচরণের পরিচয়।

এর জন্য প্রয়োজন পরামর্শ, প্রমাণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযম।

একটি সরকারকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে—আজ যে ক্ষমতা আমরা ব্যবহার করছি, আগামী দিনের এমন কোনো সরকার যদি একই ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে আমাদের মৌলিক বিরোধ থাকে, তখনও কি আমরা এই ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য মনে করব?

যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে বুঝতে হবে সাংবিধানিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ৬৭ নয়

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পেছনে নীতিগত যুক্তি একেবারে নেই—এমন কথা বলা ঠিক হবে না। ভবিষ্যতে হয়তো অবসরের বয়স বাড়ানোর যথেষ্ট শক্তিশালী কারণও তৈরি হতে পারে।

কিন্তু একটি সম্ভাব্য নীতিগতভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্তও ভুল প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হলে সাংবিধানিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এখানে আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু ৬৭ সংখ্যাটি নয়। প্রশ্ন হলো—কেন এখন, কীভাবে এবং কোন প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতিতে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে; এর তাৎক্ষণিক সুবিধাভোগী কারা হতে পারেন; প্রস্তাবটির প্রয়োজনীয়তা কতটা তথ্য দিয়ে প্রমাণিত; এবং ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য এটি কী ধরনের নজির তৈরি করবে।

এই প্রশ্নকে কোনো বর্তমান প্রধান বিচারপতি বা নির্দিষ্ট বিচারকের ব্যক্তিগত বিষয় বানানোও উচিত নয়। সাংবিধানিক নীতি কোনো ব্যক্তির চেয়ে বড়।

একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য নয়; রাজনৈতিক প্রভাবের যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা থেকেও মুক্ত থাকার জন্য।

সেই কারণেই বার অ্যাসোসিয়েশন অব শ্রীলঙ্কা এবং কমনওয়েলথ ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ল’এশিয়ার মতো আন্তর্জাতিক আইনি সংগঠনগুলোর উদ্বেগকে দলীয় রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

বিচারিক সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংস্কারের পথও হতে হবে এমন—যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী হয়, দুর্বল নয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যদি সাংবিধানিক আস্থার সংকট তৈরি হয়, তাহলে সেই সমাধান শেষ পর্যন্ত সমস্যার চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।

সাংবিধানিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু কত দ্রুত আইন বদলানো যায়, তার মধ্যে নয়। বরং প্রয়োজনের মুহূর্তেও ক্ষমতার ওপর কতটা সংযম আরোপ করা যায়, তার মধ্যেই তার প্রকৃত পরিপক্বতা প্রকাশ পায়।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো: প্রশাসনিক সমাধান, নাকি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরীক্ষা?

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানো: প্রশাসনিক সমাধান, নাকি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরীক্ষা?

০৮:০০:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

শ্রীলঙ্কায় সুপ্রিম কোর্ট ও আপিল কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর প্রস্তাবকে কেবল সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক বিরোধ, কিংবা কোনো দুই মতামতদাতার বিতর্ক হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালে পড়ে যায়। এটি মূলত একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন—রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তার সঙ্গে যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

এই বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচারকদের অবসরের বয়স কখনোই পরিবর্তন করা যাবে না—এমন কোনো যুক্তি টেকসই নয়। বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে বিচারকদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে। বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ, মামলার জট, অভিজ্ঞ বিচারকের ঘাটতি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন কিংবা জটিলতর আইনি পরিবেশের মতো বাস্তব কারণ অবসরের বয়স পুনর্বিবেচনার যৌক্তিক ভিত্তি হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্নটি সেখানে শেষ হয় না। আসল প্রশ্ন হলো—কোন পরিস্থিতিতে, কী প্রক্রিয়ায় এবং কাদের জন্য এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে?

শ্রীলঙ্কার সংবিধানের ১০৭(৫) অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসরের বয়স ৬৫ এবং আপিল কোর্টের বিচারকদের ৬৩ বছর নির্ধারিত। ফলে এটি সাধারণ সরকারি চাকরির অবসরের বয়সের মতো কোনো প্রশাসনিক বিধান নয়। উচ্চ আদালতের বিচারকরা এমন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, যার আওতায় সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডও বিচারিক পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে পারে।

সুতরাং বিচারকের মেয়াদ বা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে কোনো পরিবর্তন সরাসরি বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত।

ক্ষমতা থাকা আর সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বশীল হওয়া এক বিষয় নয়

এখানেই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি তৈরি হয়। সংসদের কাছে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকা মানেই এই নয় যে, সেই ক্ষমতা যেকোনো সময়ে যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা সাংবিধানিকতার দৃষ্টিতে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।

সাংবিধানিকতাবাদ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না। এর মূল উদ্দেশ্যই হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারকে এমন কিছু নীতি ও সীমার মধ্যে রাখা, যাতে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ইতিহাস এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কবার্তা দেয়। অতীতে সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের ধরন বদলেছে। সেই অভিজ্ঞতার শিক্ষা এই নয় যে সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে না। বরং শিক্ষা হলো—সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতাও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হয়।

একটি সরকারের হাতে যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাহলে তার সংবিধান সংশোধনের সক্ষমতা অবশ্যই বেশি। কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে বিচার বিভাগের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা কমানোর বাড়তি নৈতিক অধিকার দেয় না। বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা যত বেশি কেন্দ্রীভূত হয়, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষার প্রয়োজন ততই বাড়ে।

সময় ও প্রক্রিয়াও সাংবিধানিক প্রশ্ন

অবসরের বয়স ৬৭ হবে, ৬৫ থাকবে—এই সংখ্যাগত বিতর্কের বাইরে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো সময় নির্বাচন।

একই ধরনের সংস্কার ভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংবিধানিক তাৎপর্য বহন করতে পারে। যদি অবসরের বয়স পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক পর্যালোচনার অংশ হয়, ব্যাপক জনপরামর্শের পর আসে, ভবিষ্যতে নিয়োগ পাওয়া বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট বর্তমান বিচারকের মেয়াদ বাড়ানোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত না থাকে, তাহলে তার প্রকৃতি এক রকম।

অন্যদিকে, যদি দায়িত্বে থাকা বিচারকদের মেয়াদ অবিলম্বে বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং সেই পরিবর্তন দ্রুততার সঙ্গে আনা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এটি কি সত্যিই একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নাকি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তৈরি একটি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা?

এ কারণেই অন্য দেশের উদাহরণ দেখিয়ে বলা যথেষ্ট নয় যে কোথাও বিচারকরা ৭০ বা ৭৫ বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তুলনামূলক সাংবিধানিক বিশ্লেষণে শুধু সংখ্যাটি নয়, সেই সংখ্যা কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল, পরিবর্তনের আগে কী ধরনের পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল, সেটি ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য ছিল কি না এবং দায়িত্বে থাকা বিচারকদের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছিল কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

Daily Mirror - Sri Lanka Latest Breaking News and Headlines - Print Edition  Decision to extend the retirement age of judges: A well-meaning policy  implemented in Gotabaya style

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বাস্তবতার পাশাপাশি বিশ্বাসের বিষয়

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু বাস্তবে স্বাধীন থাকার বিষয় নয়; জনগণের কাছে সেই স্বাধীনতার বিশ্বাসযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একজন বিচারক বাস্তবে রাজনৈতিক চাপমুক্ত থেকে কাজ করতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে তার পদে থাকার মেয়াদ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তাহলে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এটি কোনো সামান্য বিষয় নয়। আইনের শাসন টিকে থাকে শুধু আদালতের রায়ের ওপর নয়, আদালত যে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—এই বিশ্বাসের ওপরও।

শ্রীলঙ্কার প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে কমনওয়েলথ ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ল’এশিয়ার মতো আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের আপত্তি সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের সমার্থক নয়। বরং তারা এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকির কথা বলছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণা ও জনআস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এতে সরকার অনিয়ম করছে—এমন সিদ্ধান্ত অবশ্যই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। কিন্তু এর অর্থ হলো, সরকারকে এমন একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে যাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিক সন্দেহের সুযোগও যতটা সম্ভব কমে যায়।

মামলার জট একটি বাস্তব সমস্যা, কিন্তু একমাত্র সমাধান নয়

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পক্ষে সরকারের অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো বিপুল মামলাজট মোকাবিলা করা। প্রায় ১১ লাখ মামলা জমে থাকার বিষয়টি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর রাষ্ট্রীয় সমস্যা। বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হলে ন্যায়বিচারের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

কিন্তু মামলাজটের অস্তিত্ব নিজে থেকেই প্রমাণ করে না যে দায়িত্বে থাকা উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

কারণ মামলাজট সাধারণত একটি বহুমাত্রিক ও কাঠামোগত সমস্যা। বিচারকের সংখ্যা কম হওয়া এর একটি কারণ হতে পারে। কিন্তু আদালতে শূন্য পদ পড়ে থাকা, অবকাঠামোর ঘাটতি, পুরোনো বিচারিক প্রক্রিয়া, বারবার শুনানি পেছানো, গবেষণা ও প্রশাসনিক সহায়তার সীমাবদ্ধতা, তদন্তে বিলম্ব, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে দীর্ঘসূত্রতা, ফরেনসিক ও সরকারি বিশ্লেষণ কার্যক্রমে সময় লাগা, আদালতের নথি ডিজিটাল না হওয়া এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দুর্বলতাও মামলার জট বাড়াতে পারে।

অতএব, একজন অভিজ্ঞ বিচারককে আরও দুই বছর দায়িত্বে রাখলে কিছু অতিরিক্ত বিচারিক সক্ষমতা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এতে মামলাজটের উৎপাদনকারী পুরো ব্যবস্থাটি বদলে যায় না।

যদি বিচারকের ঘাটতি থাকে, শূন্য পদ পূরণ কেন নয়?

এখানে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন সামনে আসে। রাষ্ট্র যদি সত্যিই বিচারকের সংকটে ভুগে থাকে, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ কেন বিদ্যমান শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা হবে না?

শীর্ষ আদালতগুলোতে শূন্য পদ থাকলে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে বর্তমান ব্যক্তিদের আরও কয়েক বছর রাখার মধ্যে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পার্থক্য রয়েছে।

অভিজ্ঞতা অবশ্যই বিচারব্যবস্থার সম্পদ। কিন্তু বিচার বিভাগকে একই সঙ্গে উত্তরসূরি তৈরি, প্রজন্মগত নবায়ন এবং নতুন বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গির সুযোগও রাখতে হয়। শীর্ষ পর্যায়ের একজন বিচারকের মেয়াদ বাড়ালে তার প্রভাব নিচের স্তরের পদোন্নতি ও নিয়োগ কাঠামোতেও পড়তে পারে।

তাই সরকারকে তথ্য দিয়ে দেখাতে হবে—প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবে কতটা মামলার নিষ্পত্তি বাড়াবে, বিচার বিভাগের সক্ষমতা কতটা উন্নত করবে এবং এটি কি সত্যিই জনবল সমস্যার সমাধান করবে, নাকি কেবল সমস্যাটিকে কয়েক বছর পিছিয়ে দেবে।

বিদেশি উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিতে হবে, সংখ্যা ধার করতে নয়

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পক্ষে অন্য দেশের দৃষ্টান্ত দেওয়া অযৌক্তিক নয়। কিন্তু সাংবিধানিক সংস্কার কখনোই এমনভাবে করা যায় না যে অন্য দেশে একটি সংখ্যা কার্যকর, তাই একই সংখ্যা দেশে প্রয়োগ করলেই সংস্কার সফল হবে।

যুক্তরাজ্যে বিচারকদের বাধ্যতামূলক অবসরের বয়স পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ পরামর্শ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। এই উদাহরণ থেকে মূল শিক্ষা বয়সের সংখ্যা নয়, সংস্কারের পদ্ধতি।

অন্য গণতন্ত্রগুলো কীভাবে বিচারকদের মেয়াদ নির্ধারণ করেছে, কখন পরিবর্তন করেছে, কী ধরনের পরামর্শ নিয়েছে এবং পরিবর্তনটি বর্তমান বিচারকদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করেছে কি না—এসবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া অনেক সময় ফলাফলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের সিদ্ধান্ত আগামী সরকারের হাতে কী ক্ষমতা দেবে?

এই বিতর্কের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন সম্ভবত নজিরের।

ধরা যাক, বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সৎ এবং বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। তারপরও সংসদকে ভাবতে হবে—এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্য কী ধরনের ক্ষমতার নজির তৈরি করবে?

একটি ভবিষ্যৎ সরকার হয়তো কোনো বিচারককে রাজনৈতিকভাবে অসুবিধাজনক মনে করতে পারে। তখন কি তারা অবসরের বয়স কমাতে চাইবে? কোনো বিচারককে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক মনে হলে কি তার মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারবে? আদালতের কাঠামো বা বিচারকদের দায়িত্বকাল কি রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী বারবার পরিবর্তন করা সম্ভব হবে?

সাংবিধানিক নকশা শুধু বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন, আগামী দিনে তারা ক্ষমতায় নাও থাকতে পারেন। তাই একটি নিয়মের মূল্যায়ন করতে হয় সবচেয়ে প্রতিকূল ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিতেও সেটি কতটা নিরাপদ থাকবে—এই প্রশ্ন দিয়ে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিচারকদের সুবিধা নয়

আরেকটি ভুল ধারণা পরিষ্কার করা জরুরি। বিচারকদের অবসরের বয়স নিয়ে আপত্তিকে যদি বিচারক বা আইনজীবীদের পেশাগত সুবিধা রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বিতর্কের মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নয়। এটি নাগরিকের অধিকার।

একজন নাগরিক নির্বাহী বিভাগের বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে গেলে তার প্রয়োজন স্বাধীন বিচারক। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললে তার প্রয়োজন স্বাধীন বিচারক। ব্যবসায়িক চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হলেও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের দমনমূলক ক্ষমতার মুখোমুখি হওয়া একজন অভিযুক্তের জন্যও একই নিশ্চয়তা দরকার।

সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ, বিরোধী রাজনীতিক কিংবা সাধারণ মানুষ—সরকারের কোনো সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে তাদের প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজন এমন একটি বিচারব্যবস্থা, যার ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের সন্দেহ নেই।

তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—বিচারকরা আরও দুই বছর চাকরি করবেন কি না। প্রশ্ন হলো—সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর সাংবিধানিক কর্তৃত্ব প্রয়োগকারী বিচারকদের বিষয়ে জনগণ সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ধরে রাখতে পারবে কি না।

সংস্কারের বিরোধিতা নয়, ভালো সংস্কারের দাবি

প্রস্তাবিত অবসরের বয়স বৃদ্ধির বিরোধিতা করার অর্থ বিচারব্যবস্থার সংস্কারের বিরোধিতা করা নয়। বরং শ্রীলঙ্কার বিচারব্যবস্থায় দ্রুত এবং গভীর সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

বিদ্যমান শূন্য পদ পূরণ, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ, প্রয়োজন অনুযায়ী বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, আধুনিক মামলা ব্যবস্থাপনা চালু, আদালতের নথি ডিজিটাল করা, বিচারকদের গবেষণা ও প্রশাসনিক সহায়তা বৃদ্ধি, বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ করা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের কার্যক্রম দ্রুত করা এবং ফরেনসিক ও সরকারি বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সক্ষমতা বাড়ানো—সবই এই সংস্কারের অংশ হতে পারে।

এর পাশাপাশি আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার সূচক তৈরি করা প্রয়োজন।

যদি বিচারকদের অবসরের বয়স সত্যিই পরিবর্তন করা দরকার হয়, তাহলে সেটিকে বৃহত্তর বিচারিক সংস্কারের অংশ করা উচিত। একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, বিচার বিভাগ ও আইনজীবী সংগঠনের মতামত, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের বক্তব্য এবং সাধারণ জনগণের মতামত নেওয়া যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন নিয়ম ভবিষ্যতে নিয়োগ পাওয়া বিচারকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করার বিষয়টি বিবেচনা করা।

‘সংস্কারের পর নিয়োগ পাওয়া বিচারকরা ৬৭ বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন’—এই সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক চরিত্র এক ধরনের। আর ‘বর্তমানে যে বিচারকরা ৬৫ বা ৬৩ বছরের অবসরের নিয়মে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হলো’—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রথমটি ভবিষ্যৎ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। দ্বিতীয়টি বর্তমান পদধারীদের তাৎক্ষণিক সুবিধার প্রশ্ন উত্থাপন করে।

UN raises Red Flag over Sri Lanka's move to Extend Sitting Judges' Tenure -  Newswire

সরকারের উচিত তথ্য প্রকাশ করা

সরকার যদি সত্যিই মনে করে যে এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য প্রশাসনিক দক্ষতা ও বিচারিক সক্ষমতা বাড়ানো, তাহলে ব্যাপক জনপরামর্শকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

বরং সরকার প্রকাশ করতে পারে—একজন বিচারককে আরও এক বছর বা দুই বছর দায়িত্বে রাখলে আনুমানিক কত মামলা নিষ্পত্তি হতে পারে, বর্তমানে কত বিচারিক পদ শূন্য, নতুন নিয়োগের মাধ্যমে কতটা সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব, বিচারকদের বয়সভিত্তিক কাঠামো কী, নতুন বিচারক নিয়োগের প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে এবং অতিরিক্ত মেয়াদে বিচারকদের রাখার খরচ বনাম নতুন বিচারক নিয়োগের খরচ কত।

পাশাপাশি বিচারকদের পদোন্নতি ও আদালতের সামগ্রিক কার্যকারিতার ওপর প্রস্তাবিত পরিবর্তনের প্রভাবও প্রকাশ করা যেতে পারে।

তথ্য থাকলে বিতর্কটি রাজনৈতিক অভিযোগের স্তর থেকে নীতিগত আলোচনায় উন্নীত হবে। কিন্তু তথ্যের বদলে শুধু রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর এত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন দাঁড় করানো উচিত নয়।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

শ্রীলঙ্কা অতীতে দেখেছে, শক্তিশালী রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা কীভাবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো বদলে দিতে পারে। বর্তমান সরকারের জন্য তাই এই বিতর্ক একটি বিশেষ পরীক্ষা।

যে সরকার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তার কাছ থেকে প্রত্যাশা আরও বেশি। তাদের দেখাতে হবে যে সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করার ধরন আগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হবে না।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে দ্রুত একটি সংশোধনী পাস করাই রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ নয়। বরং এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা তৈরি করা, যা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় না থাকলেও টিকে থাকবে এবং ভবিষ্যতের ভিন্নমতাবলম্বী সরকারের হাতেও অপব্যবহারের সুযোগ কম রাখবে—সেটিই অধিক পরিণত রাজনৈতিক আচরণের পরিচয়।

এর জন্য প্রয়োজন পরামর্শ, প্রমাণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযম।

একটি সরকারকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে—আজ যে ক্ষমতা আমরা ব্যবহার করছি, আগামী দিনের এমন কোনো সরকার যদি একই ক্ষমতা ব্যবহার করে এবং তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে আমাদের মৌলিক বিরোধ থাকে, তখনও কি আমরা এই ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য মনে করব?

যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে বুঝতে হবে সাংবিধানিক সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ৬৭ নয়

বিচারকদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পেছনে নীতিগত যুক্তি একেবারে নেই—এমন কথা বলা ঠিক হবে না। ভবিষ্যতে হয়তো অবসরের বয়স বাড়ানোর যথেষ্ট শক্তিশালী কারণও তৈরি হতে পারে।

কিন্তু একটি সম্ভাব্য নীতিগতভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্তও ভুল প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হলে সাংবিধানিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এখানে আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু ৬৭ সংখ্যাটি নয়। প্রশ্ন হলো—কেন এখন, কীভাবে এবং কোন প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতিতে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে; এর তাৎক্ষণিক সুবিধাভোগী কারা হতে পারেন; প্রস্তাবটির প্রয়োজনীয়তা কতটা তথ্য দিয়ে প্রমাণিত; এবং ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য এটি কী ধরনের নজির তৈরি করবে।

এই প্রশ্নকে কোনো বর্তমান প্রধান বিচারপতি বা নির্দিষ্ট বিচারকের ব্যক্তিগত বিষয় বানানোও উচিত নয়। সাংবিধানিক নীতি কোনো ব্যক্তির চেয়ে বড়।

একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য নয়; রাজনৈতিক প্রভাবের যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা থেকেও মুক্ত থাকার জন্য।

সেই কারণেই বার অ্যাসোসিয়েশন অব শ্রীলঙ্কা এবং কমনওয়েলথ ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ও ল’এশিয়ার মতো আন্তর্জাতিক আইনি সংগঠনগুলোর উদ্বেগকে দলীয় রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

বিচারিক সংস্কার প্রয়োজন, কিন্তু সেই সংস্কারের পথও হতে হবে এমন—যাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী হয়, দুর্বল নয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যদি সাংবিধানিক আস্থার সংকট তৈরি হয়, তাহলে সেই সমাধান শেষ পর্যন্ত সমস্যার চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে।

সাংবিধানিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু কত দ্রুত আইন বদলানো যায়, তার মধ্যে নয়। বরং প্রয়োজনের মুহূর্তেও ক্ষমতার ওপর কতটা সংযম আরোপ করা যায়, তার মধ্যেই তার প্রকৃত পরিপক্বতা প্রকাশ পায়।