দক্ষিণ কোরিয়ার সংগীতজগতে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছে সিওডো ব্যান্ড। প্রচলিত রকসংগীতের বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে প্যানসোরির আবেগ ও কণ্ঠশৈলী মিলিয়ে দলটি তৈরি করেছে নিজস্ব সংগীতধারা, যাকে অনেকে ‘জোসন পপ’ নামে অভিহিত করেন। তবে ব্যান্ডটির সদস্যদের কাছে এই সংগীত কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ, সুর বা কারিগরি সূত্রের বিষয় নয়; বরং এটি অনুভূতির প্রকাশ।
ত্রিশ মিনিটের গান থেকেই পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম
২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা সিওডো ব্যান্ডের শুরুটা ছিল বেশ সাধারণ একটি সমস্যাকে ঘিরে। পরিবেশনায় প্রায় আধা ঘণ্টা গান গাওয়ার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তখনও তাদের হাতে পর্যাপ্ত গান ছিল না।
সমাধান খুঁজতে গিয়ে দলটি নজর দেয় ঐতিহ্যবাহী প্যানসোরি ‘চুনহিয়াংগা’র দিকে। এর গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অংশ একত্র করে তারা তৈরি করে প্রায় ত্রিশ মিনিটের একটি পরিবেশনা। মজার বিষয় হলো, সেই পরিবেশনাতেই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উঠে আসে অষ্টাদশ শতকের জনপ্রিয় কোরীয় প্রেমকাহিনির পুরো গল্প।
নয় বছর পর সেই পুরোনো পরিবেশনাই এবার রূপ নিয়েছে ব্যান্ডটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম ‘ওয়ান’-এ। অ্যালবামটি ১৪ আগস্ট প্রকাশিত হওয়ার কথা।

‘ওয়ান’ নামের ভেতরেও আছে বৃত্তের গল্প
অ্যালবামের নামটির অর্থও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কোরীয় ভাষায় ‘ওয়ান’ শব্দের সঙ্গে বৃত্তের ধারণা জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে ‘চুনহিয়াংগা’র প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও অভিমানের সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে।
গল্পে প্রেমিক-প্রেমিকার দেখা হয়, বিচ্ছেদ ঘটে এবং আবার তাদের মিলন হয়। অর্থাৎ গল্পটিও যেন একটি বৃত্তের মতো ঘুরে ফিরে আসে। একই সঙ্গে এটি ব্যান্ডটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম হওয়ায় ইংরেজি ‘ওয়ান’ অর্থাৎ ‘এক’-এর সঙ্গেও নামটির মিল রয়েছে।
ব্যান্ডটির ভাষ্য অনুযায়ী, বহু পুরোনো একটি গল্প সময়ের স্রোত পেরিয়ে টিকে আছে। সেই গল্পকে নতুন করে সংগীতে রূপ দেওয়া যেন সেই বৃত্তের আরেকটি ঘূর্ণন।
‘জোসন পপ’ নিয়ে ব্যান্ডের আপত্তি কোথায়
সিওডো ব্যান্ডে আছেন ঐতিহ্যবাহী কোরীয় কণ্ঠসংগীতে প্রশিক্ষিত গায়ক সিওডো। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন গিটারবাদক ইয়োন তে-হি, বাদক কিম তে-জু, ঢোলবাদক জং হিয়ন-বিন এবং কি-বোর্ডশিল্পী কিম সিয়ং-হিয়ন।
দলটি ২০২১ সালে ঐতিহ্যবাহী সংগীতভিত্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বড় পরিসরে পরিচিতি পায়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালে সিওডো আরেকটি জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানেও অংশ নেন।

তাদের সংগীতকে সবচেয়ে বেশি যে নামে ডাকা হয়, সেটি হলো ‘জোসন পপ’। কিন্তু এই পরিচয়কে কোনো নির্দিষ্ট সূত্রে আটকে রাখতে চান না ব্যান্ডের সদস্যরা।
তাদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো তাল, সুর বা বাদ্যরীতিকে ব্যবহার করলেই ‘জোসন পপ’ তৈরি হয়—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং কোরীয় মানুষের অনুভূতির যে বিশেষ আবহ, সেটিকে ধারণ করাই এই সংগীতের বড় বৈশিষ্ট্য।
শুরুর দিকে ব্যান্ডটি তাদের সংগীতের ব্যাখ্যা দিতে নানা কারিগরি বিষয় সামনে আনত। কখনো কোনো বিশেষ সুর, কখনো কোনো নির্দিষ্ট ছন্দের কথা বলা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তারা বুঝতে পারে, এভাবে সংগীতকে সংজ্ঞায়িত করতে গেলে সেটিকে অকারণে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মাঝখানে
সিওডো ব্যান্ডের অবস্থান এক অর্থে দুই জগতের মাঝখানে। ঐতিহ্যবাহী সংগীতের অঙ্গনে তাদের আধুনিক সংগীতের দল হিসেবে দেখা হয়, আবার জনপ্রিয় সংগীতের জগতে তাদের ঐতিহ্যবাহী সংগীতের শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই দ্বৈত পরিচয়ের কারণে খুব বেশি বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি দলটিকে। বরং দুই পক্ষই তাদের অন্য পক্ষের শিল্পী হিসেবে দেখে এক ধরনের সম্মান দেখিয়েছে।
তবে সিওডোর আপত্তি অন্য জায়গায়। তিনি চান না, শুধু ঐতিহ্যবাহী সংগীতে প্রশিক্ষিত একজন শিল্পী আধুনিক কিছু করার চেষ্টা করছেন—এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের মূল্যায়ন করা হোক। তাঁর মতে, তারা প্রথমত সংগীতশিল্পী; তাদের সংগীতে ঐতিহ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মাত্র।
‘গাংগাংসুল্লে’তে মিল খোঁজে শ্রোতারা
বিভিন্ন উৎসব ও উন্মুক্ত মঞ্চের পরিবেশনায় সিওডো ব্যান্ড সাধারণত ‘গাংগাংসুল্লে’ দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করে। এটি কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী বৃত্তাকার নৃত্য ও সংগীতের একটি পরিচিত রূপ, যা দেশটির মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
ব্যান্ডটির মতে, এমন অনেক মানুষ আছেন যারা সিওডো ব্যান্ডের নাম আগে শোনেননি, কিন্তু ‘গাংগাংসুল্লে’ সম্পর্কে জানেন। এই পরিচিতির মধ্য দিয়েই তাদের সংগীত শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়।
তাদের লক্ষ্য বিদেশি শ্রোতাদের সামনে শুধু ‘এটি কোরীয় সংগীত’ বলে আলাদা করে তুলে ধরা নয়। বরং কোরীয় সংস্কৃতির ভেতরে থাকা এমন কিছু অনুভূতি তুলে ধরা, যা অন্য সংস্কৃতির মানুষও নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।

বিশ্বসংগীতের বাজারে নিজস্ব শক্তি
কোরীয় ঐতিহ্যবাহী সংগীতকে আধুনিক ধারার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা যে নতুন পথ তৈরি করছেন, সেটিকে স্বাভাবিক বিকাশ হিসেবেই দেখছেন সিওডো।
তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে হিপহপের বিকাশ যেমন একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক শক্তি তৈরি করেছিল, কোরীয় ঐতিহ্যবাহী সংগীতের আধুনিক রূপও তেমন একটি শক্তি হতে পারে। বিশ্বসংগীতের বাজারে অন্যরা যেটি সহজে অনুকরণ করতে পারবে না, সেটিই হতে পারে কোরিয়ার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বারো গানের অ্যালবামে ঐতিহ্যের নতুন যাত্রা
‘ওয়ান’ অ্যালবামে রয়েছে মোট বারোটি গান। এর মধ্যে সাতটি মূল গান এবং পাঁচটি অংশে রয়েছে প্যানসোরির কথকতামূলক পরিবেশনা। পাঁচটি কথনাংশের প্রতিটি আলাদাভাবে তৈরি করেছেন ব্যান্ডের সদস্যরা।
অ্যালবামের শুরুতেই রয়েছে ‘আরিরাং’, যেখানে কোরীয় ঐতিহ্যবাহী সংগীতের ত্রিমাত্রিক ছন্দকে ঘুরে ফিরে চলা সুরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আর গিটারবাদক ইয়োন তে-হির পছন্দ ‘লাভ সং’, যেখানে ছন্দে আধুনিক আরঅ্যান্ডবি ঘরানার প্রভাব থাকলেও সুরের ভিত্তি তৈরি হয়েছে পাঁচ স্বরের ঐতিহ্যবাহী বিন্যাসে।
অ্যালবামটিতে কোনো ইংরেজি ভাষার গান নেই—যদিও ব্যান্ডের সদস্যদের মতে এটি কোনো পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল না।
পুরোনো কাহিনি থেকে শুরু করে আধুনিক রকসংগীতের মঞ্চ—সিওডো ব্যান্ডের এই যাত্রা যেন সত্যিই একটি বৃত্তের মতো। জোসন যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘুরে আসা সেই সাংস্কৃতিক সুরকে এবার তারা নতুন করে সামনে এগিয়ে দিতে চাইছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















