রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রায় থমকে যাওয়ায় দেশটির কৃষকরা এখন সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি। মাঠে এবার ভালো ফলন হলেও সেই শস্য কোথায় বিক্রি করবেন, কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করবেন এবং আগামী মৌসুমের চাষের খরচ জোগাবেন—এসব প্রশ্নেই গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম বড় গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী বীজ উৎপাদনকারী দেশ। এসব কৃষিপণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই কৃষ্ণসাগর হয়ে বিদেশে যায়। ফলে এই নৌপথে রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় শুধু কৃষকরাই নন, দেশটির যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিও নতুন চাপের মধ্যে পড়েছে।
ভালো ফলন, কিন্তু বিক্রির বাজার নেই
ঝিতোমির অঞ্চলের কৃষক সেরহি রিবালকো যুদ্ধ শুরুর পর রুশ দখলের কারণে তার জমির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হারিয়েছেন। যুদ্ধের চার বছর পরও তিনি কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এবার নতুন বিপদের মুখে পড়েছেন তিনি।
তার গুদাম প্রায় পূর্ণ। সামনে আবার ভুট্টা কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার কথা। অথচ নতুন শস্য রাখার মতো জায়গা যেমন কমে আসছে, তেমনি উৎপাদিত শস্য কেনার ক্রেতাও পাওয়া যাচ্ছে না।
রিবালকোর ভাষায়, শস্য পাঠানোর মতো কোনো জায়গা নেই। তার ব্যবসার আয় থেমে গেছে, অর্থপ্রবাহ শুকিয়ে গেছে এবং রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের পর বিপুল ঋণ নিয়ে কৃষি ব্যবসা পুনর্গঠন করেছিলেন তিনি। এখন ফসল কাটার মৌসুমে প্রতি মাসে প্রায় দুই কোটি ইউক্রেনীয় মুদ্রা প্রয়োজন হয় ঋণের কিস্তি পরিশোধ, শ্রমিকদের মজুরি ও জ্বালানি কেনার জন্য। এই অর্থ না এলে শরতের জমি প্রস্তুতের কাজও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
দেশের রপ্তানি আয়ের বড় ভরসা কৃষি
ইউক্রেনের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষিখাত থেকে আসে। ফলে কৃষ্ণসাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশটির যুদ্ধকালীন অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত তৈরি করছে।
ইউক্রেন বিশ্বের মোট গম সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ এবং ভুট্টার প্রায় ১১ শতাংশ জোগান দেয়। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু খাদ্যনির্ভর দেশ ইউক্রেনের শস্যের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে এসব অঞ্চলে খাদ্যসংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক শস্যের দাম এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। অথচ ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বাজারে চিত্র একেবারেই বিপরীত। বিক্রির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে শস্য জমে যাচ্ছে এবং স্থানীয় দাম পড়ে যাচ্ছে।
রপ্তানি বন্ধ হলে পরের মৌসুমও হুমকিতে
ইউক্রেন এ বছর প্রায় ৬ কোটি টন শস্য উৎপাদনের আশা করছে, যা গত বছরের কাছাকাছি। কিন্তু কৃষকদের বড় ভয় আগামী বছরের ফসল নিয়ে।
কারণ উৎপাদিত শস্য বিক্রি করে অর্থ না পেলে কৃষকরা জ্বালানি কিনতে পারবেন না, শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারবেন না এবং শীতকালীন ফসলের জন্য জমি প্রস্তুত ও বীজ কেনার অর্থও জোগাড় করতে পারবেন না।

কৃষি খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, এখনকার অর্থসংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু চলতি মৌসুমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী বছরের উৎপাদনও কমে যেতে পারে।
খারকিভ অঞ্চলের এক খামার পরিচালক জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার গমসহ ফসলের ফলন প্রায় দ্বিগুণ ভালো। কিন্তু দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। ফলে বেশি ফসল উৎপাদন করেও কৃষক কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছেন না।
কৃষ্ণসাগরে হামলা বাড়ায় থেমে গেছে জাহাজ চলাচল
যুদ্ধের শুরুতে কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তির মাধ্যমে খাদ্যশস্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। রাশিয়া ২০২৩ সালে সেই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর ইউক্রেন নিজস্ব উদ্যোগে কৃষ্ণসাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে একটি বিকল্প শস্যপথ চালু করে।
রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার জলসীমা ব্যবহার করে সেই পথ দিয়ে আবার বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য বিদেশে পাঠানো হচ্ছিল। যুদ্ধের নতুন উত্তেজনায় সেই পথও এখন প্রায় অচল।
জুলাই ও আগস্টের শুরুতে ইউক্রেনের বন্দর অবকাঠামোতে ৭০টির বেশি হামলা এবং জাহাজে ৬২টি হামলার কথা জানিয়েছে দেশটির বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর ফলে আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহে শস্য রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে।
রাশিয়ার দাবি, তাদের হামলার লক্ষ্য সামরিক অবকাঠামো, সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিদেশি অস্ত্র পরিবহনকারী জাহাজ।
গুদাম সংকটও বড় বিপদ
শস্য কয়েক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত গুদাম, শুকানোর ব্যবস্থা ও নিরাপদ সংরক্ষণ অবকাঠামো। ইউক্রেনের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, রপ্তানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন পর্যন্ত অতিরিক্ত সংরক্ষণ সংকট তৈরি হতে পারে।
এ কারণে কৃষকদের খামারেই সাময়িকভাবে শস্য রাখার জন্য বিশেষ সংরক্ষণ ব্যাগ সরবরাহে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে শুধু শস্য সংরক্ষণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদিত পণ্য শেষ পর্যন্ত বিদেশে পাঠানোর বিকল্প পথও দরকার।
বিকল্প পথও সংকুচিত
২০২২ সালে কৃষ্ণসাগরের বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইউক্রেন পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে সড়ক ও রেলপথে কৃষিপণ্য ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। এবার সেই বিকল্প পথও আগের মতো সহজ নেই।
প্রতিবেশী পোল্যান্ডের কৃষকরা অতীতে কম দামের ইউক্রেনীয় শস্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কঠোর বাণিজ্যব্যবস্থা, দানিয়ুব নদীতে পানির স্তর কমে যাওয়া এবং রেল অবকাঠামোয় রুশ হামলাও বিকল্প পরিবহনব্যবস্থাকে সীমিত করে দিয়েছে।
কিয়েভের অর্থনীতি বিষয়ক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ ওলেহ নিভিয়েভস্কির মতে, এবার বন্দর অবরোধের অর্থনৈতিক ক্ষতি ২০২২ সালের পরিস্থিতির চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে জানিয়েছে, অবরোধের কারণে বছরের বাকি সময়ে ইউক্রেন প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হারাতে পারে। কৃষকদের অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়জনিত ক্ষতি প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে কৃষক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা।
যুদ্ধের চার বছরে কৃষিতে ক্ষতি ৯ হাজার কোটি ডলারের বেশি
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের কৃষিখাতে ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৯ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। যুদ্ধ, মাইন, গোলাবর্ষণ ও সেচব্যবস্থার সংকটে চাষযোগ্য জমির পরিমাণও প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে।
সরকার কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তা প্যাকেজ চালু করেছে। রাষ্ট্রীয় ঋণ কর্মসূচি বাড়ানো, ঋণ পাওয়ার শর্ত সহজ করা এবং চলতি মূলধনের ঋণের সুদের হার কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবু মাঠের কৃষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থ নয়, বরং সময়। এখন উৎপাদিত শস্য বিক্রি না হলে আগামী মৌসুমের বীজ, জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি ও জমি প্রস্তুতের অর্থ কোথা থেকে আসবে—সেই উত্তরই তারা খুঁজছেন।
আজকের সংকট কালকের খাদ্যসংকটে রূপ নিতে পারে
কৃষক রিবালকোর মতো অনেক কৃষকের কাছে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো আগামী বছরের ফসল। চলতি মৌসুমে ফলন ভালো হলেও বিক্রির সুযোগ না থাকলে সেই সাফল্যই অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হচ্ছে।
ইউক্রেনের কৃষি খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করছেন, এখনই যদি শীতকালীন গম, সরিষা জাতীয় তেলবীজ ও অন্যান্য ফসলের চাষের প্রস্তুতি নেওয়া না যায়, তাহলে এক বছরের মধ্যে বড় ধরনের খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
অর্থাৎ কৃষ্ণসাগরের বন্দর অবরোধ শুধু ইউক্রেনের কৃষকের আয় বন্ধ করছে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারেও। একটি যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকা শস্যের প্রতিটি টন এখন তাই হয়ে উঠেছে কৃষকের বেঁচে থাকা, ইউক্রেনের অর্থনীতি এবং বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















