পশ্চিম এশিয়ায় চলমান অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের পণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশটির পণ্য রপ্তানি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৪২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে আমদানি বেড়েছে তুলনামূলক কম, ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন বাজার ও বিকল্প বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ভারত তার রপ্তানি ব্যবস্থা আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলছে।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এ বছরের জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে পণ্য আমদানি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬২০ কোটি ডলারে।
পশ্চিম এশিয়ায় ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানো
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে মার্চ ও এপ্রিলে ভারতীয় পণ্য রপ্তানি বড় ধাক্কা খেয়েছিল। মার্চে ওই অঞ্চলে ভারতের রপ্তানি প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং এপ্রিলে ২৭ শতাংশ কমে যায়।
তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে পশ্চিম এশিয়ায় ভারতের রপ্তানি বেড়ে ৫৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
ভারতের বাণিজ্যসচিব রাজেশ আগরওয়ালের মতে, বিকল্প বন্দর ও নৌপথ ব্যবহারের কারণে এই পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে। হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমানের কয়েকটি বন্দরে পণ্য পরিবহন বেড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ ও খোর ফাক্কান বন্দরেও পণ্য চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে।
নতুন বাজারে বাড়ছে ভারতের উপস্থিতি
রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বাজারের বৈচিত্র্যকরণকে। যেসব দেশে আগে ভারতের রপ্তানি তুলনামূলক কম ছিল, সেসব বাজারেও এখন ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।
চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, অস্ট্রিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ভারতের রপ্তানি ভালো অবস্থানে রয়েছে। আফ্রিকার বাজারেও রপ্তানি বাড়ছে। কেনিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শুল্ক ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে।
তানজানিয়ায় পরিস্থিতি আরও উল্লেখযোগ্য। দেশটিতে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৩০ শতাংশ, যা ভারতের নতুন বাজার খোঁজার কৌশলের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনে রপ্তানি বেড়েছে ৬৫ শতাংশ
চীনের বাজারেও ভারতের পণ্য রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে। জুলাইয়ে চীনে ভারতের রপ্তানি ৬৫ শতাংশ বেড়ে ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। যদিও আগের তুলনামূলক ভিত্তি কম থাকায় এই প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বেশি দেখাচ্ছে, তবু এপ্রিল থেকে জুলাই—এই চার মাসের হিসাবেও চীনে ভারতের রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়েছে।
এতে বোঝা যাচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলেও ভারত একক কোনো বাজার বা নির্দিষ্ট বাণিজ্যপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প বাজার ও পরিবহনপথ তৈরির চেষ্টা করছে।
রপ্তানি বাড়লেও বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি

তবে ভারতের বাণিজ্য পরিস্থিতির সব সূচক ইতিবাচক নয়। পণ্য রপ্তানিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।
জুলাইয়ে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৪০ কোটি ডলার।
এর পেছনে মূল কারণ পরিষেবা খাতের রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধির পার্থক্য। জুলাইয়ে পরিষেবা রপ্তানি ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৫৯০ কোটি ডলারে উঠেছে। অন্যদিকে পরিষেবা আমদানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ পরিষেবা রপ্তানিতে
পরিষেবা রপ্তানির তুলনামূলক ধীর প্রবৃদ্ধি ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক এক জরিপেও পরিষেবা খাতের রপ্তানি আদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে দুর্বল আশাবাদ দেখা গেছে।
তারপরও জুলাইয়ের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানির চিত্র ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের মধ্যেও বিকল্প বন্দর, নতুন নৌপথ এবং নতুন বাজারকে কাজে লাগিয়ে ভারত রপ্তানি ধরে রাখতে পেরেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য যখন যুদ্ধ, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপে রয়েছে, তখন ভারতের এই বাজার বৈচিত্র্যকরণের কৌশল দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















