০৭:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
আফ্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে চীনের ইউয়ান, কমছে ডলারের নির্ভরতা জোকবো: পুরুষের বংশলিপির ভেতর নারীর হারানো ইতিহাস ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ইতিহাস গড়লেন অ্যাবি ডনেলি, নারীদের ম্যারাথনে ব্রিটেনের প্রথম পদক সিলিকনকে পেছনে ফেলে চীনের সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তিতে নতুন সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: রান্নার গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ভারতের নতুন উদ্যোগ হংকংয়ের জীবনধারা: খাওয়া, চলাফেরা আর সুস্থ থাকার নতুন কৌশল ইউক্রেনে রুশ হামলায় ইস্পাত কারখানায় নিহত ২, মস্কো অঞ্চলে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা জাহাজে বিদেশি পণ্যবাহী জাহাজের ধাক্কা, অল্পের জন্য রক্ষা ২১ নাবিক আরও ছয় শিশুর মৃত্যু, হামের মৃত্যু বেড়ে ৯০৮ সেলেনা গোমেজের মানসিক স্বাস্থ্য উদ্যোগে বড় সংকট, বিনিয়োগকারীদের মামলা

জ্বালানি ভর্তুকি শেষ হলেই কেন মূল্যস্ফীতির আগুন জ্বলে ওঠে

জ্বালানি ভর্তুকি সাধারণত রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় একটি নীতি। সরকার যখন বাজারদরের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ তৈরি করে, তখন সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক স্বস্তি পায়। পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে, পণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকে এবং সরকারের জন্যও নীতিটি জনবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়। কিন্তু এই স্বস্তির আড়ালে জমতে থাকে বড় আর্থিক দায়। আর একসময় যখন সরকার সেই দায় কমাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে, তখন চাপটি আর বাজেটের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না—সরাসরি গিয়ে পড়ে ভোক্তার পকেটে এবং মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে।

জার্মানির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশটিতে জ্বালানির দাম এক মাসেই ১১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়েছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম ১১ শতাংশ। এই উল্লম্ফনের পেছনে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের চাপ ছিল। ইরান যুদ্ধের পর তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও ছিল। কিন্তু মূল ধাক্কাটি এসেছে সরকারের দেওয়া জ্বালানি-কর ছাড় ও ভর্তুকির মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে।

এখানেই জ্বালানি ভর্তুকির আসল অর্থনীতি বোঝা জরুরি। ভর্তুকি যতদিন থাকে, ততদিন বাজারের প্রকৃত দাম আংশিকভাবে আড়াল করা যায়। কিন্তু ভর্তুকি তুলে নিলে সেই চাপ একবারে প্রকাশ পায়। ফলে একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত একটি মূল্যস্ফীতির ঘটনায় পরিণত হয়।

জার্মানির অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

জার্মানির জুলাইয়ের পরিসংখ্যানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যায়। বরং এটিকে একটি নীতিগত পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখা যায়। সরকার ৩০ জুন পর্যন্ত জ্বালানিতে কর-স্বস্তি ও ভর্তুকির মাধ্যমে ভোক্তাকে যে সুবিধা দিচ্ছিল, সেটি শেষ হওয়ার পর পরের মাসেই বাজারদরে তার প্রভাব দেখা গেল। জার্মানির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ডেস্টাটিসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সামগ্রিক জ্বালানির দাম ৫ শতাংশ এবং নির্দিষ্টভাবে ডিজেল ও পেট্রলের দাম আরও বেশি বেড়েছে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতির সূচকে হঠাৎ বড় উল্লম্ফন দেখা দিলে সুদের হার বাড়ানো যায়। কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ পড়ে। আবার এই মূল্যবৃদ্ধিকে সাময়িক ধরে নিয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিলে মানুষের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আরও বেড়ে যেতে পারে।

জার্মানির ক্ষেত্রে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দেশটির মুদ্রানীতি এককভাবে বার্লিনের হাতে নেই; ইউরো অঞ্চলের সুদের হার নির্ধারণ করে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে জার্মানির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়াও বৃহত্তর ইউরো অঞ্চলের মুদ্রানীতির কাঠামোর মধ্যে বিবেচিত হয়।

লাতিন আমেরিকার জন্য সতর্কবার্তা

এই অভিজ্ঞতা ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ভর্তুকিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং সীমিত সরকারি অর্থের কারণে সেই নীতি এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ইকুয়েডর তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২৬ সালের বাজেটে দেশটি জ্বালানি ভর্তুকির জন্য প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেখেছে, যেখানে ২০২৫ সালে এই বরাদ্দ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকার ভর্তুকির বোঝা অর্ধেকেরও বেশি কমানোর পথে গেছে। একই সময়ে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানি-উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫৭ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো আসলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে: সরকার কতদিন বাজারদরের নিচে জ্বালানি বিক্রি করে যেতে পারে? ভর্তুকি যত বাড়ে, রাষ্ট্রকে তত বেশি অর্থ অন্য খাত থেকে সরিয়ে আনতে হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো কিংবা সামাজিক সুরক্ষায় যে অর্থ ব্যয় করা যেত, তার একটি অংশ চলে যায় জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে কম রাখার পেছনে।

কিন্তু ভর্তুকি কমানোর মুহূর্তেই সমস্যার আরেকটি দিক সামনে আসে। পাম্পের দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং সেই প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্যের দামেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ সরকার বাজেট বাঁচাতে যে সিদ্ধান্ত নেয়, তার তাৎক্ষণিক মূল্য দিতে হয় ভোক্তাকে।

বলিভিয়া দেখাচ্ছে দীর্ঘদিনের ভর্তুকির শেষ পরিণতি

বলিভিয়ার পরিস্থিতি আরও কঠিন। বছরের পর বছর ধরে জ্বালানি ভর্তুকি দেশটির অর্থনীতিতে বড় বোঝা তৈরি করেছে। এর বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার। এই ব্যয় ছোট একটি অর্থনীতির জন্য কতটা বড়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

শেষ পর্যন্ত সরকার বড় ধরনের সংস্কারের পথে যায়। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৩ দশমিক ৭২ বলিভিয়ানো থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৮০ বলিভিয়ানো হয়েছে। নিয়মিত পেট্রলের দামও ৩ দশমিক ৭৪ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯৬ বলিভিয়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের একটি ডিক্রির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়েছে।

এটি কেবল জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে একটি স্বীকারোক্তিও। সরকার বুঝতে পেরেছে, আগের কাঠামোয় আমদানি ব্যয় বহন করা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালে জ্বালানি আমদানির জন্য বরাদ্দও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।

এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বাস্তবতাও যুক্ত হয়েছে। ২৯ জুলাই ২০২৬ বলিভিয়া ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। ফলে জ্বালানি সংস্কারকে শুধু অভ্যন্তরীণ মূল্যনীতি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি ছিল বৃহত্তর আর্থিক সংকট, বাজেট নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি পদক্ষেপ।

Fuel Price Hike Impact On Inflation | Ministers see limited impact,  economists warn fuel price hikes will feed inflation | The Daily Star

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে কঠিন সমীকরণ

জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের সবচেয়ে জটিল দিকটি এখানেই। সরকার অর্থ সাশ্রয়ের জন্য একটি সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে দুটি পথ থাকে।

প্রথমত, সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা। এতে ঋণের খরচ বাড়ে, বিনিয়োগ কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, মূল্যবৃদ্ধিকে সাময়িক ধরে নিয়ে অপেক্ষা করা। কিন্তু এতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।

এই ধারাবাহিকতা মোটামুটি পরিচিত: প্রথমে ভর্তুকি কমে, এরপর জ্বালানির দাম বাড়ে, তারপর মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং শেষ পর্যন্ত মুদ্রানীতিকে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়। কোনো কোনো দেশে এর সঙ্গে মুদ্রার দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতিও যুক্ত হতে পারে।

তবে সব দেশের ফলাফল এক হবে না। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্থিতিশীল মুদ্রা এবং নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির দেশ তুলনামূলকভাবে সহজে এই ধাক্কা সামলাতে পারে। বিপরীতে যেখানে আগে থেকেই মূল্যস্ফীতি বেশি, মুদ্রার ওপর চাপ রয়েছে এবং সরকারের আর্থিক জায়গা সীমিত, সেখানে একই ধরনের সংস্কার অনেক বেশি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা আরও একটি মাত্রা যোগ করে

আর্জেন্টিনা দেখায়, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির অর্থনীতিতে জ্বালানি সংস্কারের ঝুঁকি কেন বেশি। দেশটি কয়েক বছর ধরে জ্বালানি ভর্তুকি কমিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের জুনে জ্বালানি ও লুব্রিকেন্টের মূল্য মাসিক হিসাবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বার্ষিক হিসাবে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছিল।

এখানে সমস্যা শুধু এক মাসের মূল্যবৃদ্ধি নয়। যে দেশে মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই উচ্চ, সেখানে জ্বালানির দাম বাড়লে তা পরিবহন, উৎপাদন, খাদ্য এবং মজুরি আলোচনায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে একটি প্রশাসনিক মূল্য সমন্বয় বৃহত্তর মূল্যস্ফীতির প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে।

এ কারণেই জার্মানি, ইকুয়েডর, বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনাকে একই সূত্রে বিচার করলেও তাদের সক্ষমতা এক নয়। জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া প্রায় একই হতে পারে, কিন্তু সেই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা দেশভেদে ব্যাপকভাবে আলাদা।

ভর্তুকি সংস্কার মানেই মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জ্বালানি ভর্তুকি কোনো সাধারণ বাজেট ব্যয় নয়। এটি কার্যত একটি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। রাষ্ট্র যখন বাজারদরের নিচে জ্বালানি রাখে, তখন মূল্যকে সাময়িকভাবে আটকে রাখে। সেই নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলে বাজারদর এক ধাক্কায় সামনে আসে।

তাই ভর্তুকি সংস্কারের প্রশ্নটি শুধু ‘সরকার কত টাকা বাঁচাবে’—এমন সরল হিসাব নয়। একই সঙ্গে দেখতে হবে, সংস্কারের পর মূল্যস্ফীতির অভিঘাত কতটা হবে, নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর তার প্রভাব কী হবে, পরিবহন ও খাদ্যদামের ওপর চাপ কতটা ছড়াবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো নীতিগত জায়গা রাখে কি না।

জার্মানির জুলাইয়ের তথ্য এই সম্পর্কটিকে খুব স্পষ্ট করেছে। ৩০ জুন ভর্তুকি ও কর-স্বস্তি শেষ হয়েছে, আর জুলাইয়ে জ্বালানির দাম লাফ দিয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্যও মূল বার্তা একই: ভর্তুকি প্রত্যাহার একটি আর্থিক সংস্কার হলেও এর প্রথম দৃশ্যমান ফল হতে পারে মূল্যস্ফীতি।

সুতরাং সরকারগুলোকে শুধু ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না; কীভাবে তা করবে, কত দ্রুত করবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে কীভাবে সুরক্ষা দেবে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে সমন্বয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ মূল্যধাক্কার ঝুঁকি কমাতে পারে।

বিনিয়োগকারী কিংবা নীতিনির্ধারকের জন্যও তাই শুধু আন্তর্জাতিক তেলের দাম দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে সরকারের ভর্তুকি নীতির সময়সূচি। কারণ তেলের বাজার একটি চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভর্তুকি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সেই চাপকে সরাসরি ভোক্তার দামে স্থানান্তর করতে পারে।

জ্বালানি ভর্তুকির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধা হলো এটি আজকের কষ্ট কমায়। সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দুর্বলতা হলো সেই কষ্ট পুরোপুরি দূর করে না—শুধু ভবিষ্যতের জন্য সরিয়ে রাখে। যখন সেই ভবিষ্যৎ এসে উপস্থিত হয়, তখন সরকারের বাজেটের সমস্যা হয়ে ওঠে মূল্যস্ফীতির সমস্যা, আর মূল্যস্ফীতির সমস্যা পরিণত হয় মুদ্রানীতির পরীক্ষায়।

জার্মানির জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতার একটি পরিষ্কার উদাহরণ। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এখন সেই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে—সংস্কার অনিবার্য হতে পারে, কিন্তু সংস্কারের পদ্ধতিই নির্ধারণ করবে তার মূল্য কে এবং কতটা দেবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আফ্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে চীনের ইউয়ান, কমছে ডলারের নির্ভরতা

জ্বালানি ভর্তুকি শেষ হলেই কেন মূল্যস্ফীতির আগুন জ্বলে ওঠে

০৬:২০:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

জ্বালানি ভর্তুকি সাধারণত রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় একটি নীতি। সরকার যখন বাজারদরের তুলনায় কম দামে জ্বালানি বিক্রির সুযোগ তৈরি করে, তখন সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক স্বস্তি পায়। পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে, পণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকে এবং সরকারের জন্যও নীতিটি জনবান্ধব হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়। কিন্তু এই স্বস্তির আড়ালে জমতে থাকে বড় আর্থিক দায়। আর একসময় যখন সরকার সেই দায় কমাতে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে, তখন চাপটি আর বাজেটের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না—সরাসরি গিয়ে পড়ে ভোক্তার পকেটে এবং মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে।

জার্মানির সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই প্রক্রিয়াটিকে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশটিতে জ্বালানির দাম এক মাসেই ১১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়েছে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম ১১ শতাংশ। এই উল্লম্ফনের পেছনে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের চাপ ছিল। ইরান যুদ্ধের পর তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও ছিল। কিন্তু মূল ধাক্কাটি এসেছে সরকারের দেওয়া জ্বালানি-কর ছাড় ও ভর্তুকির মেয়াদ ৩০ জুন শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে।

এখানেই জ্বালানি ভর্তুকির আসল অর্থনীতি বোঝা জরুরি। ভর্তুকি যতদিন থাকে, ততদিন বাজারের প্রকৃত দাম আংশিকভাবে আড়াল করা যায়। কিন্তু ভর্তুকি তুলে নিলে সেই চাপ একবারে প্রকাশ পায়। ফলে একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত একটি মূল্যস্ফীতির ঘটনায় পরিণত হয়।

জার্মানির অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

জার্মানির জুলাইয়ের পরিসংখ্যানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমে যায়। বরং এটিকে একটি নীতিগত পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখা যায়। সরকার ৩০ জুন পর্যন্ত জ্বালানিতে কর-স্বস্তি ও ভর্তুকির মাধ্যমে ভোক্তাকে যে সুবিধা দিচ্ছিল, সেটি শেষ হওয়ার পর পরের মাসেই বাজারদরে তার প্রভাব দেখা গেল। জার্মানির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ডেস্টাটিসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে সামগ্রিক জ্বালানির দাম ৫ শতাংশ এবং নির্দিষ্টভাবে ডিজেল ও পেট্রলের দাম আরও বেশি বেড়েছে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। মূল্যস্ফীতির সূচকে হঠাৎ বড় উল্লম্ফন দেখা দিলে সুদের হার বাড়ানো যায়। কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ পড়ে। আবার এই মূল্যবৃদ্ধিকে সাময়িক ধরে নিয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিলে মানুষের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আরও বেড়ে যেতে পারে।

জার্মানির ক্ষেত্রে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দেশটির মুদ্রানীতি এককভাবে বার্লিনের হাতে নেই; ইউরো অঞ্চলের সুদের হার নির্ধারণ করে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে জার্মানির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়াও বৃহত্তর ইউরো অঞ্চলের মুদ্রানীতির কাঠামোর মধ্যে বিবেচিত হয়।

লাতিন আমেরিকার জন্য সতর্কবার্তা

এই অভিজ্ঞতা ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি ভর্তুকিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং সীমিত সরকারি অর্থের কারণে সেই নীতি এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

ইকুয়েডর তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ২০২৬ সালের বাজেটে দেশটি জ্বালানি ভর্তুকির জন্য প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেখেছে, যেখানে ২০২৫ সালে এই বরাদ্দ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকার ভর্তুকির বোঝা অর্ধেকেরও বেশি কমানোর পথে গেছে। একই সময়ে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত আমদানি করা জ্বালানি-উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫৭ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের নেতিবাচক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।

এই সংখ্যাগুলো আসলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে: সরকার কতদিন বাজারদরের নিচে জ্বালানি বিক্রি করে যেতে পারে? ভর্তুকি যত বাড়ে, রাষ্ট্রকে তত বেশি অর্থ অন্য খাত থেকে সরিয়ে আনতে হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো কিংবা সামাজিক সুরক্ষায় যে অর্থ ব্যয় করা যেত, তার একটি অংশ চলে যায় জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে কম রাখার পেছনে।

কিন্তু ভর্তুকি কমানোর মুহূর্তেই সমস্যার আরেকটি দিক সামনে আসে। পাম্পের দাম বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে এবং সেই প্রভাব ধীরে ধীরে অন্যান্য পণ্যের দামেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ সরকার বাজেট বাঁচাতে যে সিদ্ধান্ত নেয়, তার তাৎক্ষণিক মূল্য দিতে হয় ভোক্তাকে।

বলিভিয়া দেখাচ্ছে দীর্ঘদিনের ভর্তুকির শেষ পরিণতি

বলিভিয়ার পরিস্থিতি আরও কঠিন। বছরের পর বছর ধরে জ্বালানি ভর্তুকি দেশটির অর্থনীতিতে বড় বোঝা তৈরি করেছে। এর বার্ষিক ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার। এই ব্যয় ছোট একটি অর্থনীতির জন্য কতটা বড়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

শেষ পর্যন্ত সরকার বড় ধরনের সংস্কারের পথে যায়। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৩ দশমিক ৭২ বলিভিয়ানো থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৮০ বলিভিয়ানো হয়েছে। নিয়মিত পেট্রলের দামও ৩ দশমিক ৭৪ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯৬ বলিভিয়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের একটি ডিক্রির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়েছে।

এটি কেবল জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে একটি স্বীকারোক্তিও। সরকার বুঝতে পেরেছে, আগের কাঠামোয় আমদানি ব্যয় বহন করা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালে জ্বালানি আমদানির জন্য বরাদ্দও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।

এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের বাস্তবতাও যুক্ত হয়েছে। ২৯ জুলাই ২০২৬ বলিভিয়া ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। ফলে জ্বালানি সংস্কারকে শুধু অভ্যন্তরীণ মূল্যনীতি হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি ছিল বৃহত্তর আর্থিক সংকট, বাজেট নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি পদক্ষেপ।

Fuel Price Hike Impact On Inflation | Ministers see limited impact,  economists warn fuel price hikes will feed inflation | The Daily Star

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে কঠিন সমীকরণ

জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের সবচেয়ে জটিল দিকটি এখানেই। সরকার অর্থ সাশ্রয়ের জন্য একটি সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেয়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে দুটি পথ থাকে।

প্রথমত, সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা। এতে ঋণের খরচ বাড়ে, বিনিয়োগ কমতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, মূল্যবৃদ্ধিকে সাময়িক ধরে নিয়ে অপেক্ষা করা। কিন্তু এতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা মানুষের মধ্যে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।

এই ধারাবাহিকতা মোটামুটি পরিচিত: প্রথমে ভর্তুকি কমে, এরপর জ্বালানির দাম বাড়ে, তারপর মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং শেষ পর্যন্ত মুদ্রানীতিকে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়। কোনো কোনো দেশে এর সঙ্গে মুদ্রার দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতিও যুক্ত হতে পারে।

তবে সব দেশের ফলাফল এক হবে না। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্থিতিশীল মুদ্রা এবং নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির দেশ তুলনামূলকভাবে সহজে এই ধাক্কা সামলাতে পারে। বিপরীতে যেখানে আগে থেকেই মূল্যস্ফীতি বেশি, মুদ্রার ওপর চাপ রয়েছে এবং সরকারের আর্থিক জায়গা সীমিত, সেখানে একই ধরনের সংস্কার অনেক বেশি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা আরও একটি মাত্রা যোগ করে

আর্জেন্টিনা দেখায়, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির অর্থনীতিতে জ্বালানি সংস্কারের ঝুঁকি কেন বেশি। দেশটি কয়েক বছর ধরে জ্বালানি ভর্তুকি কমিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের জুনে জ্বালানি ও লুব্রিকেন্টের মূল্য মাসিক হিসাবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বার্ষিক হিসাবে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছিল।

এখানে সমস্যা শুধু এক মাসের মূল্যবৃদ্ধি নয়। যে দেশে মূল্যস্ফীতি আগে থেকেই উচ্চ, সেখানে জ্বালানির দাম বাড়লে তা পরিবহন, উৎপাদন, খাদ্য এবং মজুরি আলোচনায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে একটি প্রশাসনিক মূল্য সমন্বয় বৃহত্তর মূল্যস্ফীতির প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে।

এ কারণেই জার্মানি, ইকুয়েডর, বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনাকে একই সূত্রে বিচার করলেও তাদের সক্ষমতা এক নয়। জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহারের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া প্রায় একই হতে পারে, কিন্তু সেই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা দেশভেদে ব্যাপকভাবে আলাদা।

ভর্তুকি সংস্কার মানেই মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জ্বালানি ভর্তুকি কোনো সাধারণ বাজেট ব্যয় নয়। এটি কার্যত একটি মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। রাষ্ট্র যখন বাজারদরের নিচে জ্বালানি রাখে, তখন মূল্যকে সাময়িকভাবে আটকে রাখে। সেই নিয়ন্ত্রণ তুলে দিলে বাজারদর এক ধাক্কায় সামনে আসে।

তাই ভর্তুকি সংস্কারের প্রশ্নটি শুধু ‘সরকার কত টাকা বাঁচাবে’—এমন সরল হিসাব নয়। একই সঙ্গে দেখতে হবে, সংস্কারের পর মূল্যস্ফীতির অভিঘাত কতটা হবে, নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর তার প্রভাব কী হবে, পরিবহন ও খাদ্যদামের ওপর চাপ কতটা ছড়াবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো নীতিগত জায়গা রাখে কি না।

জার্মানির জুলাইয়ের তথ্য এই সম্পর্কটিকে খুব স্পষ্ট করেছে। ৩০ জুন ভর্তুকি ও কর-স্বস্তি শেষ হয়েছে, আর জুলাইয়ে জ্বালানির দাম লাফ দিয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জন্যও মূল বার্তা একই: ভর্তুকি প্রত্যাহার একটি আর্থিক সংস্কার হলেও এর প্রথম দৃশ্যমান ফল হতে পারে মূল্যস্ফীতি।

সুতরাং সরকারগুলোকে শুধু ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না; কীভাবে তা করবে, কত দ্রুত করবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে কীভাবে সুরক্ষা দেবে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধীরে ধীরে সমন্বয়, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ মূল্যধাক্কার ঝুঁকি কমাতে পারে।

বিনিয়োগকারী কিংবা নীতিনির্ধারকের জন্যও তাই শুধু আন্তর্জাতিক তেলের দাম দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে সরকারের ভর্তুকি নীতির সময়সূচি। কারণ তেলের বাজার একটি চাপ তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভর্তুকি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সেই চাপকে সরাসরি ভোক্তার দামে স্থানান্তর করতে পারে।

জ্বালানি ভর্তুকির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধা হলো এটি আজকের কষ্ট কমায়। সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দুর্বলতা হলো সেই কষ্ট পুরোপুরি দূর করে না—শুধু ভবিষ্যতের জন্য সরিয়ে রাখে। যখন সেই ভবিষ্যৎ এসে উপস্থিত হয়, তখন সরকারের বাজেটের সমস্যা হয়ে ওঠে মূল্যস্ফীতির সমস্যা, আর মূল্যস্ফীতির সমস্যা পরিণত হয় মুদ্রানীতির পরীক্ষায়।

জার্মানির জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতার একটি পরিষ্কার উদাহরণ। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এখন সেই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে—সংস্কার অনিবার্য হতে পারে, কিন্তু সংস্কারের পদ্ধতিই নির্ধারণ করবে তার মূল্য কে এবং কতটা দেবে।