বংশপরিচয়ের নথি বলতেই আমাদের চোখের সামনে সাধারণত পুরুষদের একটি ধারাবাহিক তালিকা ভেসে ওঠে—কে কার ছেলে, কোন পরিবার কোথা থেকে এসেছে, কোন পূর্বপুরুষের নামের সঙ্গে বংশের পরিচয় যুক্ত। কিন্তু কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘জোকবো’ নিয়ে গভীরভাবে কাজ করলে এই প্রচলিত ধারণার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক চোখে পড়ে। বাইরে থেকে এগুলো পুরুষের বংশতালিকা মনে হলেও, ভেতরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীর পারিবারিক পরিচয় ও বংশগত সম্পর্ক বোঝার জন্য এগুলো অসাধারণ সমৃদ্ধ দলিল।
চীনের ‘জিয়াপু’ এবং কোরিয়ার ‘জোকবো’—দুই ধরনের বংশলিপির কাঠামোগত মিল আছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের সম্পর্ক এবং পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে প্রথম দর্শনে এগুলোকে প্রায় একই ধরনের দলিল মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়বস্তু ও তথ্যের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে নারীদের পরিচয় কীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, সেখানে কোরিয়ার জোকবো একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক জানালা খুলে দেয়।
নারীর পরিচয় যেখানে হারিয়ে যেতে পারত
চীনা বংশলিপিতে অনেক সময় নারীর পরিচয় সীমিত থাকে তার পারিবারিক পদবি পর্যন্ত। কখনও তার জন্মস্থান বা বাবার নাম পাওয়া যায়, কিন্তু সেই তথ্য দিয়ে তার পারিবারিক ইতিহাস অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোরিয়ার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন।
জোকবোতে বিবাহিত নারীর নিজের বংশপরিচয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। এর কেন্দ্রীয় ধারণাগুলোর একটি হলো ‘বংগোয়ান’—একটি বংশের আদি নিবাস বা প্রতিষ্ঠাতা পূর্বপুরুষের সঙ্গে যুক্ত পরিচয়। একজন নারীর বংগোয়ান জানা থাকলে তার নিজের বংশের জোকবোতে গিয়ে তার পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়।
অর্থাৎ একজন নারী বিয়ের পর স্বামীর পরিবারের অংশ হলেও তার নিজের বংশগত পরিচয় পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়নি। বরং তার পিতৃপরিচয় এমনভাবে নথিভুক্ত হয়েছে, যা তাকে তার জন্মপরিবারের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার সুযোগ দেয়।
পিতৃতান্ত্রিক দলিল, কিন্তু নারীর জন্যও মূল্যবান
জোকবো মূলত পিতৃসূত্রীয় বংশের দলিল। অর্থাৎ বংশের প্রধান ধারাটি পুরুষের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এগিয়েছে। বিশেষ করে সপ্তদশ শতাব্দী থেকে চীনা প্রভাব এবং নব্য-কনফুসীয় সামাজিক ধারণার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জোকবোর মূল তালিকা ক্রমশ পুরুষকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয়। পুরুষের নাম প্রধান ধারায় থাকলেও তার স্ত্রীকে বাদ দেওয়া হয়নি। বরং প্রধান স্ত্রী সম্পর্কে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তার নিজের বংশের পরিচয়ও অনুসরণ করা যায়।
প্রাথমিক যুগের জোকবোতে পরিস্থিতি আরও ভিন্ন ছিল। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর কিছু নথিতে ছেলে ও মেয়েদের এবং তাদের সন্তানদের প্রায় সমানভাবে তালিকাভুক্ত করা হতো। পরবর্তী সময়ে সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে নারীর সরাসরি অন্তর্ভুক্তি কমে যায়। কিন্তু বিবাহিত নারীর বংশপরিচয় নথিবদ্ধ করার প্রথা টিকে থাকে।
একজন পুরুষের স্ত্রী মানেই একটি নতুন বংশের দরজা
জোকবোতে একজন প্রধান স্ত্রীর বংগোয়ান, বাবার নাম এবং অনেক ক্ষেত্রে তার চার পূর্বপুরুষের তথ্য—বাবা, দাদা, প্রপিতামহ ও মাতামহ—লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কোনো নারী যদি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের বংশধর হন, সেই পরিচয়ও কখনও উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একজন পুরুষের বংশের তালিকায় তার স্ত্রীর পরিচয় যুক্ত হওয়া মানে শুধু একজন নতুন ব্যক্তির নাম যোগ হওয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি সম্পূর্ণ পারিবারিক নেটওয়ার্ক। স্ত্রী কোথা থেকে এসেছেন, তার বাবা কে, তার পূর্বপুরুষ কারা—এসব তথ্য অনুসরণ করতে গিয়ে গবেষক আরেকটি বংশের দরজায় পৌঁছে যান।
একটি জোকবোর একটি পৃষ্ঠার উদাহরণ এই বিষয়টি স্পষ্ট করে। পাঁচ প্রজন্মে সেখানে পাঁচজন পুরুষের তথ্যের সঙ্গে সাতজন স্ত্রীর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রতিটি স্ত্রীর সঙ্গে আবার চারজন করে পূর্বপুরুষের তথ্য যুক্ত রয়েছে। ফলে কেবল ওই নারীদের মাধ্যমেই বিপুলসংখ্যক আত্মীয়ের পরিচয় সামনে আসে। তাদের মাতামহদের নাম যুক্ত হলে আরও নতুন পদবি ও পারিবারিক সংযোগের সন্ধান পাওয়া যায়।
এই হিসাবটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে একটি পুরুষকেন্দ্রিক বংশতালিকা আসলে কতটা নারী-নির্ভর তথ্য ধারণ করতে পারে।
নারীর ইতিহাস অনুসন্ধানে এক অনন্য উৎস
পশ্চিমা সমাজে বহু শতাব্দী আগের কোনো নারী পূর্বপুরুষকে খুঁজে বের করতে গবেষককে প্রায়ই আলাদা আলাদা নথির ওপর নির্ভর করতে হয়—জনগণনা, জন্মনিবন্ধন, বিবাহের সনদ, মৃত্যুর সনদ কিংবা অন্যান্য সরকারি দলিল। প্রতিটি নথি থেকে সামান্য তথ্য সংগ্রহ করে তারপর পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হয়।
কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী জোকবো অনেক ক্ষেত্রে সেই কাজটিকে ভিন্নভাবে সম্ভব করে। একজন নারীর জন্মপরিবার, বাবার পরিচয়, বংশের আদি নিবাস এবং পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে তথ্য একই ধারার নথিতে পাওয়া যেতে পারে। ফলে নারীর বংশপরিচয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে জোকবো শুধু সহায়ক দলিল নয়, অনেক সময় প্রধান উৎস হিসেবেও কাজ করতে পারে।
অতীতের সামাজিক কাঠামোর একটি অপ্রত্যাশিত পাঠ
এখানে জোকবোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো এর ঐতিহাসিক বৈপরীত্য। যে সমাজে বংশপরিচয় প্রধানত পুরুষের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয়েছে, সেই সমাজের পুরুষদের জন্য তৈরি নথিই আজ নারীর ইতিহাস অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
এটি অবশ্যই এমন কোনো প্রমাণ নয় যে ঐতিহ্যবাহী কোরীয় সমাজ পিতৃতান্ত্রিক ছিল না। বরং উল্টোটা সত্য। জোকবোর কাঠামো সেই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন। কিন্তু সেই ব্যবস্থার মধ্যেই নারীর জন্মপরিবারের পরিচয় সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী প্রথা তৈরি হয়েছিল। তাই আধুনিক গবেষকের চোখে একই দলিলের অর্থ বদলে যায়।
একসময় যে নথি একটি পরিবারের পুরুষদের সামাজিক মর্যাদা, বংশগত বৈধতা ও অভিজাত পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি হয়েছিল, আজ সেটিই নারীদের হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক ইতিহাস পুনর্গঠনের উপকরণ হতে পারে।
জোকবোর এই বৈপরীত্য আমাদের বংশপরিচয় সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ইতিহাস শুধু যে উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল, তার মধ্যেই আটকে থাকে না। একটি নথি তার সময়ের সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোকে প্রতিফলিত করতে পারে, আবার বহু শতাব্দী পর সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারে।
তাই জোকবোকে শুধু পুরুষের বংশলিপি হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এর পাতায় পুরুষের নাম যতটা দৃশ্যমান, নারীর পারিবারিক ইতিহাসের সম্ভাবনাও ততটাই গভীর। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তৈরি এই দলিল শেষ পর্যন্ত নারীর বংশপরিচয় খোঁজার জন্য এক অমূল্য ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।
লেখকঃ মার্ক পিটারসন ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির কোরিয়ান স্টাডিজের এমেরিটাস অধ্যাপক।
মার্ক পিটারসন 


















