মানুষের মন কখন কখন অন্ধকারে ঢেকে যেতে পারে, তা যদি আগেই জানা যেত—তাহলে হয়তো অনেক কষ্ট শুরু হওয়ার আগেই থামানো সম্ভব হতো। সেই সম্ভাবনাই এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে দিলেন চীনের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের তৈরি নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি মডেল মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম সংকেত বিশ্লেষণ করে একজন মানুষের বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি চার বছর আগেই অনুমান করতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
মনের অদৃশ্য সংকেত পড়বে প্রযুক্তি
শেনঝেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যেখানে মস্তিষ্কের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া, রক্ত পরীক্ষার তথ্য এবং মানসিক অবস্থাসংক্রান্ত প্রশ্নমালার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে মানুষের মুখের অভিব্যক্তির প্রতি মস্তিষ্ক কীভাবে সাড়া দেয়, সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তনও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
অর্থাৎ, বাইরে থেকে একজন মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হলেও তাঁর মস্তিষ্কের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা ভবিষ্যতে বিষণ্নতার ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। সেই অদৃশ্য সংকেতগুলো ধরতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানো হয়েছে।
চার বছর আগে সতর্ক হওয়ার সুযোগ
বিষণ্নতা সাধারণত হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর পেছনে দীর্ঘদিনের মানসিক, সামাজিক ও জৈবিক নানা পরিবর্তন কাজ করতে পারে। যদি এসব পরিবর্তনের আগাম সংকেত শনাক্ত করা যায়, তাহলে একজন মানুষ গুরুতর সমস্যায় পৌঁছানোর আগেই প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি চিকিৎসকদের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের আরও আগে শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। প্রয়োজন হলে মানসিক সহায়তা, জীবনযাপনে পরিবর্তন কিংবা অন্যান্য প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও আগেভাগে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তরুণদের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা আরও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় কিশোর ও তরুণদের তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এই বয়সে মানসিক স্বাস্থ্যের পরিবর্তন অনেক সময় পরিবার বা আশপাশের মানুষ সহজে বুঝতে পারেন না। একজন তরুণ বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও তাঁর ভেতরে তৈরি হতে পারে ভবিষ্যৎ বিষণ্নতার ঝুঁকি।
সেই জায়গায় মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করার প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষকেরা যে সম্ভাবনার কথা বলছেন, সেটিকে এখনই নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি হিসেবে দেখা যাবে না। আরও বড় পরিসরে গবেষণা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা এবং বাস্তব চিকিৎসাক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা যাচাই প্রয়োজন।
চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই হতে পারে বড় সাফল্য
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছেন। রোগটি অনেক সময় শনাক্ত হতে দেরি হয়, আবার চিকিৎসার ফলও সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না। তাই রোগ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের ঝুঁকি আগে থেকেই বুঝে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া ভবিষ্যতের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
চীনা বিজ্ঞানীদের এই উদ্যোগ সেই ভবিষ্যতেরই একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু রোগ শনাক্ত করবে না, বরং রোগ আসার আগেই মানুষকে সতর্ক করে দিতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনার সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ভুল পূর্বাভাস এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক ও মানসিক অবস্থার তথ্য অন্য যেকোনো ব্যক্তিগত তথ্যের চেয়েও সংবেদনশীল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















