মা হওয়ার আগে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলতে অনেকটা ‘সবকিছুতে হ্যাঁ বলা’কেই বোঝাতেন লেখিকা। ভালো পারিশ্রমিক না থাকলেও নতুন কাজ নেওয়া, খুব একটা প্রয়োজন না থাকলেও বৈঠকে যোগ দেওয়া কিংবা শুধু দেখতে আকর্ষণীয় বলে কোনো সুযোগ গ্রহণ—সবই তাঁর কাছে এগিয়ে যাওয়ার প্রমাণ ছিল। ফলে কাজের চাপে ক্যালেন্ডার ভরে থাকলেও কোন কাজটি সত্যিই তাঁর সময়ের মূল্য রাখে, সে প্রশ্ন করার সুযোগ বা ইচ্ছা কোনোটিই ছিল না।
কিন্তু মহামারির ভয়াবহ সময়ের শুরুতে মা হওয়ার পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন আসে। নতুন সন্তান, অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি আর দায়িত্বের চাপে নিজের আগের আত্মবিশ্বাসী পরিচয়টিই যেন হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
একটি ছোট কাজ ফিরিয়ে দিয়েছিল আত্মবিশ্বাস
মা হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর একটি পনির বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের হয়ে লেখার কাজ পান তিনি। সন্তানকে কোলে নিয়ে, পাশে কুকুরের খেলনা পড়ে থাকা অবস্থায়, অগোছালো পরিবেশেই তাঁকে কাজটি করতে হয়েছিল।
কাজটি খুব বড় কোনো পেশাগত সুযোগ ছিল না। তবু সেটিই তাঁর কাছে হয়ে ওঠে আশীর্বাদের মতো।
কারণ লেখার কাজটি তিনি জানতেন। কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে শব্দ সাজিয়ে গল্প তৈরি করতে হয়—এসব তাঁর পরিচিত জগৎ। সন্তানের কান্নার কারণ বা নতুন বাস্তবতায় কীভাবে জীবন সামলাতে হবে, তা তিনি তখনও বুঝে উঠতে পারেননি। কিন্তু তিনি জানতেন কীভাবে লিখতে হয়।
সেই কাজ তাঁকে মনে করিয়ে দেয়, তিনি শুধু একজন নতুন মা নন; তিনি একজন দক্ষ লেখিকাও।
বদলায়নি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বদলেছে কাজ বেছে নেওয়ার ধরন
মা হওয়ার আগে অনেক নারীর কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন, সন্তান জন্মের পর তাঁদের পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। আগে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো, সন্তান হওয়ার পর সেগুলো আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।
তিনি ভেবেছিলেন, তাঁর ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটবে।
কিন্তু তা হয়নি।
বরং লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। নিজের অভিজ্ঞতা কিংবা অন্য মানুষের জীবনের গল্প তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা তাঁর কাছে কমেনি, বরং বেড়েছে। মাতৃত্ব তাঁর অনুভূতির জগতকে আরও বিস্তৃত করেছে। পরিবার, শরীর, কাজ এবং মানুষের জীবন গড়ে তোলার নানা জটিলতা নিয়ে তাঁর কৌতূহল বেড়েছে।
তাঁর বলার মতো কথা আরও বেশি হয়েছে। আর সেগুলো বলার তাগিদও বেড়েছে।
তবে বদলেছে একটি বিষয়—যে কাজ তাঁর কাছে অর্থবহ নয়, তার জন্য সময় ব্যয় করার আগ্রহ কমে গেছে।
সময়ের সংকট শিখিয়েছে মনোযোগী হতে
সন্তান জন্মের পর কাজের জন্য সময় পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো দুই ঘণ্টার শিশুযত্ন, কখনো মাত্র দেড় ঘণ্টার ঘুম, আবার কখনো হঠাৎ পাওয়া অল্প কিছু নিরিবিলি সময়—এই সামান্য সময়ের মধ্যেই কাজ করতে হতো।
প্রতিটি কর্মঘণ্টার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় শিশুযত্নের খরচ, সন্তানের কাছ থেকে দূরে থাকার সময় কিংবা নিজের বিশ্রামের সময় হারানোর বিষয়টি।
ফলে কাজের টেবিলে বসার পর আর সময় নষ্ট করার সুযোগ থাকত না। বার্তা দেখা, কাজ গুছিয়ে নেওয়া কিংবা অনুপ্রেরণার অপেক্ষায় বসে থাকার পরিবর্তে সরাসরি লেখায় মন দিতে হতো।
এই সীমিত সময়ই তাঁকে শিখিয়েছে, ব্যস্ত থাকা আর অর্থবহ কাজ করা এক বিষয় নয়।
যে কাজ কাগজে-কলমে আকর্ষণীয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিঃশেষ করে দেয়, সেসব কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য জায়গা তৈরি
কম সময় পাওয়াই তাঁকে নিজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে—কোনো কাজের জন্য জীবনের এতটা সময় ব্যয় করা সত্যিই কি সার্থক?
এই প্রশ্ন তাঁর পেশাগত জীবনকে বদলে দিয়েছে।
মা হওয়ার পর তিনি এমন অনেক কাজ ছেড়ে দিয়েছেন, যেগুলো তাঁর মূল্যবোধের সঙ্গে আর মিলছিল না। যে প্রকাশনাগুলোতে একসময় লেখার স্বপ্ন দেখতেন, সেখানেও কাজের সুযোগ পেয়েছেন। তৈরি করেছেন লেখকদের একটি নিজস্ব পরিসর। এমনকি বহু বছর ধরে পিছিয়ে রাখা একটি উপন্যাস লেখার জন্যও শেষ পর্যন্ত সময় বের করেছেন।
তিনি হয়তো এখন আগের মতো বিপুলসংখ্যক কাজ করেন না। কিন্তু যে কাজগুলো করছেন, সেগুলো তাঁর কাছে বেশি অর্থবহ এবং নিজের পরিচয়ের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সন্তান ও স্বপ্ন—দুটোরই মূল্য আছে
মাতৃত্বের সঙ্গে উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভারসাম্য তৈরি করা এখনও তাঁর কাছে কঠিন। সন্তানদের জন্য পুরোপুরি উপস্থিত থাকা এবং একই সঙ্গে নিজের প্রতিটি পেশাগত স্বপ্নকে সমান সময় ও শক্তি দেওয়া বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
কখনো কাজ করতে বসে সন্তানের কাছে থাকতে ইচ্ছে করে। আবার সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময়ও মাথায় ঘুরতে থাকে অসমাপ্ত লেখার কথা।
তবু তিনি চান, তাঁর সন্তানরা জানুক—তারা তাঁর কাছে যেকোনো পেশাগত সাফল্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি এটাও চান, সন্তানরা যেন দেখে যে মায়ের নিজের স্বপ্নগুলোরও মূল্য আছে।
মাতৃত্ব তাঁর পেশাগত জীবনকে ছোট করেনি। বরং সেটিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তাঁর উপলব্ধি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানে জীবনের মধ্যে যত বেশি সম্ভব সাফল্য গুঁজে দেওয়া নয়। বরং জীবনের মূল্যবান সময় কোন কাজের জন্য উৎসর্গ করা সত্যিই সার্থক—সেটি বুঝে নেওয়াই আসল উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















