কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে প্রযুক্তি খাতের যে বিপুল বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ চলছে, তাতে দুই দশকেরও বেশি আগে ধসে পড়া মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এনরনের কৌশলের কিছুটা মিল দেখতে পাচ্ছেন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ রাম বালা। তবে তাঁর মতে, এই মিল থাকলেই বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এনরনের মতো ভয়াবহ পতনের দিকে যাবে—এমনটা নিশ্চিত নয়।
সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্লেষণবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক রাম বালার মতে, এনরনের সংকটকে মূলত তিনটি আর্থিক কৌশলের মাধ্যমে বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের হিসাবের বাইরে ঋণের ঝুঁকি সরিয়ে দিয়েছিল, ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাব্য বিক্রয়কে বর্তমান আয় হিসেবে দেখিয়েছিল এবং এমন কিছু পারস্পরিক লেনদেন করেছিল, যার ফলে প্রকৃত চাহিদার তুলনায় ব্যবসার চিত্র বেশি শক্তিশালী বলে মনে হয়েছিল।
তাঁর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও এই তিন কৌশলের কিছু বৈধ সংস্করণ দেখা যাচ্ছে। আর এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ঋণের ঝুঁকি কোথায় যাচ্ছে
বালার মতে, বর্তমানে ব্যক্তিগত ঋণব্যবস্থা অনেকটা সেই ভূমিকা পালন করছে, যা এনরনের বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো করত। অর্থাৎ ঝুঁকিকে এমন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যেখানে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে তুলনামূলক কম দৃশ্যমান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ ঢালছে বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। এই ব্যবস্থায় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় আগাম অর্থ পেয়ে যাচ্ছে, আর ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতারা বহন করছে খেলাপির ঝুঁকি।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো, ব্যক্তিগত ঋণের অর্থের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সঞ্চয়, অবসর তহবিল ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বড় ধরনের ব্যর্থতা ঘটলে এর প্রভাব শুধু প্রযুক্তি কোম্পানি বা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
ভবিষ্যৎ চাহিদার ওপর বড় বাজি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোয় বর্তমান বিনিয়োগের আরেকটি ঝুঁকি রয়েছে ভবিষ্যৎ চাহিদার হিসাবকে ঘিরে। বালার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক বিনিয়োগ বাস্তব বাজারচাহিদার পরিবর্তে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ চাহিদার মডেলের ওপর নির্ভর করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইও এর আগে ভবিষ্যৎ গণনাশক্তির চাহিদা অনুমানের অনিশ্চয়তা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। সামান্য ভুল হিসাবও কোনো উচ্চঋণনির্ভর প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও দেউলিয়াত্বের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
বালার মতে, যখন খাতের সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিরাই ভবিষ্যৎ চাহিদার পূর্বাভাস কতটা নাজুক হতে পারে তা স্বীকার করছেন, তখন অতিরিক্ত আশাবাদী হিসাবের ওপর নির্ভর করে বড় ঋণ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক।
একে অন্যকে অর্থ জোগানোর চক্র
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো পারস্পরিক অর্থায়ন। উদাহরণ হিসেবে চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার পক্ষ থেকে ওপেনএআইয়ে বিনিয়োগ এবং পরে সেই অর্থ ব্যবহার করে ওপেনএআইয়ের চিপ কেনার মতো ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে।
বালা এটিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের একটি রূপ হিসেবে দেখছেন। ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি প্রয়োজন এমন শিল্পে এ ধরনের ব্যবস্থা নতুন নয়। যেমন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের মাধ্যমে কেউ গাড়ি কেনার সুযোগ পেতে পারে।
এ ধরনের অর্থায়ন বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ফলাফলের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হলে ঝুঁকিও দ্রুত বাড়তে পারে।
মাইকেল বারির সতর্কবার্তা
বিনিয়োগকারী মাইকেল বারি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বর্তমান উন্মাদনা নিয়ে সবচেয়ে সরব সমালোচকদের একজন। তাঁর মতে, ইতিহাস যেন আবারও একই ধরনের পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে।
বারি এনরনের উত্থান ও পতন নিয়ে লেখা বিখ্যাত বই ‘দ্য স্মার্টেস্ট গাইজ ইন দ্য রুম’-এর দিকে অনুসারীদের নজর দিতে বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব এনরনের চেয়েও অনেক বড় এবং অর্থনীতি ও বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও বিপজ্জনক হতে পারে।
তবে রাম বালা এই তুলনায় পুরোপুরি একমত নন। তাঁর মতে, বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান অতীতের প্রচলিত সম্পদমূল্যের বুদ্বুদের মতো নয়। দীর্ঘমেয়াদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত চাহিদা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বর্তমান আর্থিক কৌশলকে সমর্থন করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















