টানা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার। চলতি বছরেও সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশটির প্রধান শেয়ারসূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এখন টানা চতুর্থ বছর দুই অঙ্কের হারে বাড়ার বিরল সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে।
১৯২৮ সালের পর এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র তিনবার। সর্বশেষ ঘটেছিল ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে। সেই সময়ও বাজারের উত্থানের পেছনে ছিল একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তিকে ঘিরে বিপুল আশাবাদ। তখন সেই প্রযুক্তি ছিল ইন্টারনেট। আর এবার বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে সতর্কও করছে। কারণ ১৯৯০-এর দশকের সেই অভূতপূর্ব উত্থানের পরই এসেছিল ভয়াবহ পতন। ফলে বর্তমানের দ্রুতগতির বাজারে বিনিয়োগকারীদের সামনে বড় প্রশ্ন—এই ঊর্ধ্বগতি কত দিন চলবে, আর ঝুঁকি সামলাতে এখন কী করা উচিত?
ইতিহাসের উত্থানের পর এসেছিল বড় পতন
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রতিবছর ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। ৯৮ বছরের ইতিহাসে সেটিই ছিল টানা পাঁচ বছরের একমাত্র দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির সময়কাল।
তখন প্রযুক্তি খাতকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের উচ্ছ্বাস এতটাই প্রবল ছিল যে, অনেকেই মনে করেছিলেন বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকবে। কিন্তু ২০০০ সালে সেই আশাবাদের অবসান ঘটে। শুরু হয় বাজারধস। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগকারীদের হতাশা কাটেনি।
২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের আর্থিক সংকটের সময় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ শীর্ষ থেকে তলানিতে নেমে প্রায় ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ মূল্য হারায়। এমনকি ২০০৯ সালেও এই সূচক ১৯৯৯ সালের অবস্থানের নিচে ছিল।
অর্থাৎ, বাজার যতই শক্তিশালী মনে হোক, দীর্ঘমেয়াদে বড় পতনের ঝুঁকি কখনো পুরোপুরি দূর হয় না।
এবারও কি একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে?
বর্তমান বাজারের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে থামবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এমনকি পেশাদার বাজার বিশ্লেষকরাও তা জানেন না। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাজারের সময় নির্ধারণ করে ঠিক কখন শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে হবে, এমন নিখুঁত কৌশল বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
অনেক বিনিয়োগকারী বাজারের উত্থানের সময় আরও বেশি শেয়ার কিনতে চান। আবার পতনের আশঙ্কায় বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথাও ভাবেন। কিন্তু সমস্যাটি হলো, বাজারের সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোর কাছাকাছিই অনেক সময় সবচেয়ে ভালো দিনগুলোও আসে।
ফলে আতঙ্কে বাজার থেকে বেরিয়ে গেলে বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগও হাতছাড়া হতে পারে।
বাজার থেকে সরে যাওয়ার ঝুঁকি কতটা?
১৯৮৭ সালের শেষ দিন থেকে ২০২৫ সালের শেষ দিন পর্যন্ত সময়ের হিসাব দেখলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে থাকার শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই সময় এসঅ্যান্ডপি ৫০০-তে কিনে রেখে দেওয়ার কৌশলে বার্ষিক গড় আয় ছিল প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।
ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারী আগেভাগে জানতে পারতেন বাজারের সবচেয়ে খারাপ দিনগুলো কোনগুলো। সেই দিনগুলো এড়িয়ে যেতে পারলে তার বার্ষিক গড় আয় আরও বেশি হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে আগেভাগে কোন দিনটি বাজারের সবচেয়ে খারাপ দিন হবে, তা জানা সম্ভব নয়।
বরং উল্টোভাবে বাজারের সবচেয়ে ভালো দিনগুলো এড়িয়ে গেলে ফলাফল নাটকীয়ভাবে খারাপ হতো। সেরা ১০টি দিন বাদ দিলে বার্ষিক গড় আয় নেমে আসত প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশে। সেরা ২০টি দিন বাদ দিলে তা হতো ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সেরা ৩০টি দিন বাদ দিলে ৬ শতাংশ এবং সেরা ৪০টি দিন বাদ দিলে মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ বাজারের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত কখন নেওয়া হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি আয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
তবে এক দশক শেয়ার না রাখলেও লাভ হতো
:max_bytes(150000):strip_icc()/13_YourInvestments_WhenToSellandWhenToHold-399c841ff3ed4674a9ed51a25d6b5cdf.jpg)
এর মধ্যেও ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম দেখায়। ১৯৯৯ সালের শেষ দিন থেকে ২০০৯ সালের ৯ মার্চ পর্যন্ত যদি কেউ একেবারেই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ না করতেন, তাহলে তিনি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকতেন।
কারণ ওই সময়ের মধ্যে বাজার ধস, প্রযুক্তিখাতের বিপর্যয় এবং পরবর্তী আর্থিক সংকট বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ নিয়ে এসেছিল।
সে সময় শেয়ারের বদলে বন্ড বা তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ ধরে রাখা অনেকের জন্য স্বস্তির কারণ হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই অভিজ্ঞতা মনে রাখা জরুরি। তবে তার অর্থ এই নয় যে শেয়ারবাজার থেকে পুরোপুরি পালিয়ে যেতে হবে।
বরং ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়াই হতে পারে বেশি বাস্তবসম্মত পথ।
এখন ঝুঁকির তালিকায় কী কী?
বর্তমান বাজারের দ্রুত উত্থানের পাশাপাশি বেশ কিছু ঝুঁকিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক শুল্ক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, যার একটি অংশ আদৌ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, দেশটির ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা।
অন্যদিকে বন্ডের বাজারে সুদের হার বেড়েছে। ফলে শেয়ারের তুলনায় বন্ড এখন কিছুটা বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তারপরও বাজারের বড় অংশের বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের ওপরই আরও বেশি আস্থা রাখছেন।
বিনিয়োগকারীর করণীয় কী?
সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে বাজার কখন উঠবে বা কখন পড়বে, তা অনুমান করার চেষ্টা না করা। একইভাবে কোন নির্দিষ্ট শেয়ার সবচেয়ে বেশি বাড়বে, সেটিও আগেভাগে অনুমান করার চেষ্টা না করাই ভালো।
এর বদলে বিস্তৃত শেয়ারসূচকভিত্তিক তহবিলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, পাশাপাশি পর্যাপ্ত নগদ অর্থ ও বন্ড রাখা যেতে পারে। এতে বাজারে বড় পতন এলেও পুরো বিনিয়োগ একসঙ্গে বিপদের মুখে পড়বে না।

বাজার যখন দ্রুত বাড়ে, তখন সবাই আরও বেশি ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাফল্যের অন্যতম শর্ত হলো সেই উচ্ছ্বাসের সময়ও নিজের ঝুঁকি নেওয়ার সীমা মনে রাখা।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ কমিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদের অংশ বাড়ানোও একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে।
সামনে আরও খারাপ সময় আসতে পারে, আবার দারুণ সময়ও আসবে
শেয়ারবাজারের সামনে আবার একটি কঠিন দশক আসবে কি না, তা কেউ জানে না। কিন্তু একইভাবে এটাও নিশ্চিত যে ভবিষ্যতে আবার এমন কিছু দুর্দান্ত সময় আসবে, যখন শেয়ারবাজার দ্রুত বাড়বে।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আসল শিক্ষা লুকিয়ে আছে। বাজারের উত্থান দেখে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি পতনের ভয়ে পুরোপুরি বাজার ছেড়ে দেওয়াও ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাজারের পরবর্তী মোড় অনুমান করা নয়; বরং এমনভাবে বিনিয়োগ সাজানো, যাতে বাজার বাড়লে তার সুফল পাওয়া যায় এবং বড় ধস এলেও আর্থিকভাবে টিকে থাকা সম্ভব হয়।
শেয়ারবাজারের শিক্ষা তাই সহজ—দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে থাকুন, কিন্তু সব ঝুঁকি এক জায়গায় রাখবেন না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















