০৪:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
ইয়াসুকুনিতে পুরোনো রাজনীতি, নতুন বার্তা: জাপানের যুদ্ধস্মৃতিতে কি বদলের ইঙ্গিত? বালুচিস্তান সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান ট্রাম্পের প্রশংসায় পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি, বললেন ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে পাকিস্তানের বড় শহরে জামায়াতের অবস্থান কর্মসূচি হামে মৃতের সংখ্যা ৯১৫, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু ব্যাংকে বাড়তি তারল্য, ৯ শতাংশের নিচে নামল ট্রেজারি বিলের সুদ শেখ হাসিনা ভারতে কোন স্ট্যাটাসে, জানে না বাংলাদেশ: চিফ প্রসিকিউটর আলোচনার দরজা খোলা রাখছে পিটিআই, সমঝোতার গুঞ্জনে বাড়ছে জল্পনা নৌবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত, উত্তর বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সকালে কফি খাওয়ার পর হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে? যে ৬ লক্ষণ একেবারেই উপেক্ষা করবেন না

তীব্র গরমে কর্মক্ষেত্রে বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত শ্রমিক, সুরক্ষা ঠেকাচ্ছে কিছু অঙ্গরাজ্য

যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র গরম এখন শুধু জনজীবনের জন্যই নয়, কর্মক্ষেত্রেও ভয়াবহ ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর দেশটিতে শত শত শ্রমিক অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অনেক এলাকায় শ্রমিকদের সুরক্ষায় স্থানীয় সরকারগুলোকে নিজস্ব নিয়ম তৈরির সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না।

চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে আর্দ্রতাও। ফলে নির্মাণ, কৃষি, ডাক পরিবহনসহ বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কিন্তু দেশজুড়ে চরম গরমের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষায় এখনো নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক জাতীয় নিয়ম কার্যকর হয়নি।

গরমে কাজের ভয়াবহ মূল্য

ডালাসের ডাককর্মী ড্যানি রদ্রিগেজ ১৩ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তাঁকে প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি ডাক পৌঁছে দিতে হয়। ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এক বিকেলে ডাক পরিবহনের গাড়ি থেকে নেমে কাজ করার সময় তিন বছর আগের একটি মৃত্যুর ঘটনা তাঁর মনে পড়ে যায়।

সেই একই পথে কাজ করার সময় আরেক ডাককর্মী ইউজিন গেটস জুনিয়র প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। রদ্রিগেজ বলেন, এই কাজ শরীরকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে তিনি চওড়া কিনারার টুপি ব্যবহার করেন।

Danny Rodriguez, in a Postal Service uniform, clutches a white hat as he delivers mail.

গেটসের মৃত্যুর ঘটনা আরও মর্মান্তিক। ২০২৩ সালের ২০ জুন, টেক্সাসে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিকদের জন্য পানি পানের বিরতি বাধ্যতামূলক করার নিয়ম বাতিলের কয়েক দিন পর তিনি নিজের ডাক বিতরণের পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিন তাপমাত্রার অনুভূত মাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল।

গেটস প্রতিদিন প্রায় ৪০০টি ঠিকানায় ডাক পৌঁছে দিতেন। তাঁর জন্য ছিল দুই দফা ১০ মিনিটের বেতনসহ বিরতি এবং ৩০ মিনিটের বেতনবিহীন মধ্যাহ্নভোজের সময়। তিনি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখতেন, অতিরিক্ত পানির বোতল সঙ্গে রাখতেন এবং বরফভর্তি বাক্সও বহন করতেন। তারপরও সেদিন বিকেলে একটি বাড়ির সামনে ডাক পৌঁছে দেওয়ার সময় তিনি মাটিতে পড়ে যান।

হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শরীরের তাপমাত্রা তখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। চিকিৎসকদের মতে, হৃদ্‌রোগের পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপও তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।

তাঁর স্ত্রী কার্লা গেটসের ভাষায়, তাঁর স্বামীর আরও সহায়তা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শ্রমিকদের যেন নিজেদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। ডাক পৌঁছাতে না পারলে দায়ও যেন তাঁদেরই নিতে হয়।

বছরে ৫৫০-এর বেশি মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশটিতে ৫৫০-এর বেশি শ্রমিক অতিরিক্ত তাপের কারণে মারা যান। নির্মাণ ও কৃষিকাজ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোর মধ্যে রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতিবছর প্রায় ২৮ হাজার শ্রমিক তাপজনিত বিভিন্ন ধরনের আঘাত বা অসুস্থতার শিকার হন। অতিরিক্ত গরম শুধু অজ্ঞান হওয়ার কারণই নয়; এটি শরীরে আগে থেকে থাকা ডায়াবেটিস ও হাঁপানির মতো সমস্যাকে আরও তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, পেশির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকিকে সমাজ ও নিয়োগকর্তারা প্রায়ই যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। অথচ তাপজনিত অসুস্থতা শুধু একজন শ্রমিক হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পরিণতি অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে।

A construction worker in a hard hat drinks from a bottle of water.

স্থানীয় সুরক্ষা আইনেও বাধা

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে শ্রমিকদের তাপ থেকে সুরক্ষায় নিয়োগকর্তাদের কিছু ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে ছায়ার ব্যবস্থা করতে হয় এবং কর্মীদের বিরতি নিতে উৎসাহিত করতে হয়।

সেখানে শ্রমিকদের তাপজনিত অসুস্থতা ঠেকাতে ছায়া, পানি ও বিশ্রামের মতো ব্যবস্থা না নেওয়া কর্মক্ষেত্রের অন্যতম বেশি সংঘটিত লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হয়। ২০২৪ সালে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বাগান পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়। অভিযোগের মধ্যে ছিল শ্রমিকদের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া এবং নিজেদের পানির ব্যবস্থা নিজেরাই করতে বাধ্য করা।

পূর্ব উপকূলে মেরিল্যান্ডই একমাত্র অঙ্গরাজ্য যেখানে শ্রমিকদের জন্য তাপ সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে স্থানীয় উদ্যোগ বন্ধ

দেশটির সবচেয়ে উষ্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে থাকা ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে শুধু রাজ্য পর্যায়ে তাপ সুরক্ষার নির্দিষ্ট আইন নেই, স্থানীয় সরকারগুলো নিজেদের নিয়ম করতেও বাধার মুখে পড়েছে।

ফ্লোরিডার মিয়ামি-ডেড কাউন্টি বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য ছায়া, পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে অঙ্গরাজ্যের আইনসভা শহর ও কাউন্টিগুলোকে নিজেদের তাপ সুরক্ষা বিধি প্রণয়ন থেকে বিরত রাখে।

টেক্সাসেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। অস্টিন ও ডালাসের মতো শহর নির্মাণশ্রমিকদের প্রতি চার ঘণ্টায় ১০ মিনিটের বিরতির নিয়ম চালু করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এমন একটি আইনে স্বাক্ষর করেন, যার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিকদের পানি পানের বিরতি বাধ্যতামূলক করার নিয়ম বাতিল হয়ে যায়।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এই আইনের পক্ষে ছিল। তাদের যুক্তি ছিল, বিভিন্ন শহর ও এলাকায় আলাদা আলাদা নিয়ম থাকলে ছোট ব্যবসাগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। নির্মাণশিল্পের একটি সংগঠনও বলেছে, একই অঙ্গরাজ্যে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ের পরস্পরবিরোধী নিয়মের মধ্যে পড়া থেকে এই আইন রক্ষা করবে।

কেন্দ্রীয় নীতিতেও অনিশ্চয়তা

চরম তাপ থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক নিয়ম এখনো কার্যকর হয়নি। আগের প্রশাসনের সময়ে এমন নিয়ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রচণ্ড গরমের সময় শ্রমিকদের বিরতি এবং পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার কথা ছিল।

কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই প্রস্তাবিত নিয়মগুলো শিথিল বা পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কংগ্রেসের কিছু রিপাবলিকান সদস্য আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন আইন প্রস্তাব করেছেন, যাতে শ্রম বিভাগ ওই ধরনের নিয়ম গ্রহণই করতে না পারে।

গেটসের মৃত্যু এখনও প্রশ্ন হয়ে আছে

গেটসের মৃত্যুর ঘটনায় পেশাগত নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ডাক বিভাগকে ১৫ হাজার ৬২৫ ডলার জরিমানা করেছিল। অভিযোগ ছিল, প্রচণ্ড গরম, উচ্চ আর্দ্রতা এবং সরাসরি সূর্যের আলোয় কাজ করার ঝুঁকি যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।

গেটসের সহকর্মীদের কাছে এই জরিমানার অঙ্ক ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। শ্রমিক সংগঠনের স্থানীয় নেতারা মনে করেন, ডাক বিভাগ এবং অঙ্গরাজ্য—দুই পক্ষই তাঁকে যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

চলতি বছরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। গত মাসে ডালাস এলাকার আরেক ডাককর্মী প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করার সময় মাটিতে পড়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি।

জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি আরও বাড়বে

বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সামনে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাপমাত্রা যত বাড়বে, বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত পানি, ছায়া, বিশ্রাম ও কাজের সময়সূচি সামঞ্জস্য করার প্রয়োজনও তত বাড়বে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, গরমে কাজের সময় শরীরকে ধীরে ধীরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত বিশ্রাম এবং আগেভাগে সঠিক পরিকল্পনা—এসব ব্যবস্থা জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু শুধু শ্রমিকদের নিজেদের সতর্কতার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।

গেটসের পরিবারের কাছে তাঁর মৃত্যু তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়। এটি এমন এক কর্মব্যবস্থার প্রশ্নও তুলে ধরে, যেখানে একজন শ্রমিক নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারালেও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় শেষ পর্যন্ত কার—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

A man rests under a tree with a cowboy hat covering his face.

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ইয়াসুকুনিতে পুরোনো রাজনীতি, নতুন বার্তা: জাপানের যুদ্ধস্মৃতিতে কি বদলের ইঙ্গিত?

তীব্র গরমে কর্মক্ষেত্রে বছরে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত শ্রমিক, সুরক্ষা ঠেকাচ্ছে কিছু অঙ্গরাজ্য

০২:২০:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র গরম এখন শুধু জনজীবনের জন্যই নয়, কর্মক্ষেত্রেও ভয়াবহ ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর দেশটিতে শত শত শ্রমিক অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অনেক এলাকায় শ্রমিকদের সুরক্ষায় স্থানীয় সরকারগুলোকে নিজস্ব নিয়ম তৈরির সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না।

চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে আর্দ্রতাও। ফলে নির্মাণ, কৃষি, ডাক পরিবহনসহ বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কিন্তু দেশজুড়ে চরম গরমের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষায় এখনো নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক জাতীয় নিয়ম কার্যকর হয়নি।

গরমে কাজের ভয়াবহ মূল্য

ডালাসের ডাককর্মী ড্যানি রদ্রিগেজ ১৩ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তাঁকে প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি ডাক পৌঁছে দিতে হয়। ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এক বিকেলে ডাক পরিবহনের গাড়ি থেকে নেমে কাজ করার সময় তিন বছর আগের একটি মৃত্যুর ঘটনা তাঁর মনে পড়ে যায়।

সেই একই পথে কাজ করার সময় আরেক ডাককর্মী ইউজিন গেটস জুনিয়র প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। রদ্রিগেজ বলেন, এই কাজ শরীরকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে তিনি চওড়া কিনারার টুপি ব্যবহার করেন।

Danny Rodriguez, in a Postal Service uniform, clutches a white hat as he delivers mail.

গেটসের মৃত্যুর ঘটনা আরও মর্মান্তিক। ২০২৩ সালের ২০ জুন, টেক্সাসে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিকদের জন্য পানি পানের বিরতি বাধ্যতামূলক করার নিয়ম বাতিলের কয়েক দিন পর তিনি নিজের ডাক বিতরণের পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিন তাপমাত্রার অনুভূত মাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল।

গেটস প্রতিদিন প্রায় ৪০০টি ঠিকানায় ডাক পৌঁছে দিতেন। তাঁর জন্য ছিল দুই দফা ১০ মিনিটের বেতনসহ বিরতি এবং ৩০ মিনিটের বেতনবিহীন মধ্যাহ্নভোজের সময়। তিনি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখতেন, অতিরিক্ত পানির বোতল সঙ্গে রাখতেন এবং বরফভর্তি বাক্সও বহন করতেন। তারপরও সেদিন বিকেলে একটি বাড়ির সামনে ডাক পৌঁছে দেওয়ার সময় তিনি মাটিতে পড়ে যান।

হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর শরীরের তাপমাত্রা তখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। চিকিৎসকদের মতে, হৃদ্‌রোগের পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপও তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল।

তাঁর স্ত্রী কার্লা গেটসের ভাষায়, তাঁর স্বামীর আরও সহায়তা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শ্রমিকদের যেন নিজেদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। ডাক পৌঁছাতে না পারলে দায়ও যেন তাঁদেরই নিতে হয়।

বছরে ৫৫০-এর বেশি মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রের পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশটিতে ৫৫০-এর বেশি শ্রমিক অতিরিক্ত তাপের কারণে মারা যান। নির্মাণ ও কৃষিকাজ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোর মধ্যে রয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতিবছর প্রায় ২৮ হাজার শ্রমিক তাপজনিত বিভিন্ন ধরনের আঘাত বা অসুস্থতার শিকার হন। অতিরিক্ত গরম শুধু অজ্ঞান হওয়ার কারণই নয়; এটি শরীরে আগে থেকে থাকা ডায়াবেটিস ও হাঁপানির মতো সমস্যাকে আরও তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, পেশির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকিকে সমাজ ও নিয়োগকর্তারা প্রায়ই যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না। অথচ তাপজনিত অসুস্থতা শুধু একজন শ্রমিক হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পরিণতি অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে।

A construction worker in a hard hat drinks from a bottle of water.

স্থানীয় সুরক্ষা আইনেও বাধা

যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে শ্রমিকদের তাপ থেকে সুরক্ষায় নিয়োগকর্তাদের কিছু ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে ছায়ার ব্যবস্থা করতে হয় এবং কর্মীদের বিরতি নিতে উৎসাহিত করতে হয়।

সেখানে শ্রমিকদের তাপজনিত অসুস্থতা ঠেকাতে ছায়া, পানি ও বিশ্রামের মতো ব্যবস্থা না নেওয়া কর্মক্ষেত্রের অন্যতম বেশি সংঘটিত লঙ্ঘন হিসেবে ধরা হয়। ২০২৪ সালে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বাগান পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়। অভিযোগের মধ্যে ছিল শ্রমিকদের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া এবং নিজেদের পানির ব্যবস্থা নিজেরাই করতে বাধ্য করা।

পূর্ব উপকূলে মেরিল্যান্ডই একমাত্র অঙ্গরাজ্য যেখানে শ্রমিকদের জন্য তাপ সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে স্থানীয় উদ্যোগ বন্ধ

দেশটির সবচেয়ে উষ্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে থাকা ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে শুধু রাজ্য পর্যায়ে তাপ সুরক্ষার নির্দিষ্ট আইন নেই, স্থানীয় সরকারগুলো নিজেদের নিয়ম করতেও বাধার মুখে পড়েছে।

ফ্লোরিডার মিয়ামি-ডেড কাউন্টি বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য ছায়া, পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে অঙ্গরাজ্যের আইনসভা শহর ও কাউন্টিগুলোকে নিজেদের তাপ সুরক্ষা বিধি প্রণয়ন থেকে বিরত রাখে।

টেক্সাসেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। অস্টিন ও ডালাসের মতো শহর নির্মাণশ্রমিকদের প্রতি চার ঘণ্টায় ১০ মিনিটের বিরতির নিয়ম চালু করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালে অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এমন একটি আইনে স্বাক্ষর করেন, যার ফলে স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিকদের পানি পানের বিরতি বাধ্যতামূলক করার নিয়ম বাতিল হয়ে যায়।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এই আইনের পক্ষে ছিল। তাদের যুক্তি ছিল, বিভিন্ন শহর ও এলাকায় আলাদা আলাদা নিয়ম থাকলে ছোট ব্যবসাগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। নির্মাণশিল্পের একটি সংগঠনও বলেছে, একই অঙ্গরাজ্যে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় পর্যায়ের পরস্পরবিরোধী নিয়মের মধ্যে পড়া থেকে এই আইন রক্ষা করবে।

কেন্দ্রীয় নীতিতেও অনিশ্চয়তা

চরম তাপ থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক নিয়ম এখনো কার্যকর হয়নি। আগের প্রশাসনের সময়ে এমন নিয়ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রচণ্ড গরমের সময় শ্রমিকদের বিরতি এবং পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার কথা ছিল।

কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেই প্রস্তাবিত নিয়মগুলো শিথিল বা পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কংগ্রেসের কিছু রিপাবলিকান সদস্য আরও এক ধাপ এগিয়ে এমন আইন প্রস্তাব করেছেন, যাতে শ্রম বিভাগ ওই ধরনের নিয়ম গ্রহণই করতে না পারে।

গেটসের মৃত্যু এখনও প্রশ্ন হয়ে আছে

গেটসের মৃত্যুর ঘটনায় পেশাগত নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ডাক বিভাগকে ১৫ হাজার ৬২৫ ডলার জরিমানা করেছিল। অভিযোগ ছিল, প্রচণ্ড গরম, উচ্চ আর্দ্রতা এবং সরাসরি সূর্যের আলোয় কাজ করার ঝুঁকি যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।

গেটসের সহকর্মীদের কাছে এই জরিমানার অঙ্ক ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। শ্রমিক সংগঠনের স্থানীয় নেতারা মনে করেন, ডাক বিভাগ এবং অঙ্গরাজ্য—দুই পক্ষই তাঁকে যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

চলতি বছরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। গত মাসে ডালাস এলাকার আরেক ডাককর্মী প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করার সময় মাটিতে পড়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নির্ধারিত হয়নি।

জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি আরও বাড়বে

বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সামনে কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাপমাত্রা যত বাড়বে, বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত পানি, ছায়া, বিশ্রাম ও কাজের সময়সূচি সামঞ্জস্য করার প্রয়োজনও তত বাড়বে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, গরমে কাজের সময় শরীরকে ধীরে ধীরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত বিশ্রাম এবং আগেভাগে সঠিক পরিকল্পনা—এসব ব্যবস্থা জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু শুধু শ্রমিকদের নিজেদের সতর্কতার ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।

গেটসের পরিবারের কাছে তাঁর মৃত্যু তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়। এটি এমন এক কর্মব্যবস্থার প্রশ্নও তুলে ধরে, যেখানে একজন শ্রমিক নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারালেও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় শেষ পর্যন্ত কার—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

A man rests under a tree with a cowboy hat covering his face.