কখনো দিনে ৮০০ বার পর্যন্ত প্রাণঘাতী খিঁচুনিতে আক্রান্ত হওয়া বিলি ক্যাল্ডওয়েল এখন টানা তিন বছর খিঁচুনিমুক্ত। ২১তম জন্মদিনে তাই তাঁর পরিবার উদযাপন করছে শুধু একটি বয়সের মাইলফলক নয়, বরং দীর্ঘ এক সংগ্রামের অবিশ্বাস্য পরিণতি।
দিনে শত শত খিঁচুনি
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাসলডার্গের বাসিন্দা বিলি ছোটবেলা থেকেই গুরুতর মৃগীরোগে ভুগছিলেন। একসময় তাঁর দিনে ৩০০ থেকে ৮০০ বার পর্যন্ত খিঁচুনি হতো। প্রচলিত একাধিক ওষুধ ব্যবহার করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছিল না।
বিলির মা শার্লট ক্যাল্ডওয়েল ছেলের অবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিকল্প চিকিৎসার সন্ধান শুরু করেন। সেই অনুসন্ধান তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও কানাডা পর্যন্ত নিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত গাঁজা-উৎপন্ন ওষুধের মাধ্যমে বিলির খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে।
এখন টানা তিন বছর ধরে তাঁর কোনো খিঁচুনি হয়নি। শার্লটের ভাষায়, বিলি এখন শুধু বেঁচে নেই, বরং ভালোভাবে জীবন উপভোগও করছে।
বিমানবন্দরে ওষুধ জব্দ, শুরু আন্দোলন
বিলির চিকিৎসা ঘিরে ঘটনাটি একসময় যুক্তরাজ্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। কানাডা থেকে ছেলের জন্য গাঁজার তেল নিয়ে ফেরার সময় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে সেটি জব্দ করা হয়েছিল।
ঘটনাটি চিকিৎসায় গাঁজা-উৎপন্ন ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করে। বিলির পরিবার তখন চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই শুরু করে।
এরপর ২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের গাঁজা-উৎপন্ন ওষুধ ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিলির ঘটনা এই আইন পরিবর্তনের আন্দোলনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আইন বদলালেও চিকিৎসা সহজ হয়নি
আইন পরিবর্তনের পরও শার্লট মনে করেন, প্রয়োজনীয় রোগীদের জন্য চিকিৎসা পাওয়া এখনো সহজ নয়। বিশেষ করে যারা বেসরকারি চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেন না, তাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন।
বিলি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁর ওষুধ পাচ্ছেন। কিন্তু শার্লটের দাবি, অনেক পরিবারকে মাসে কয়েকশ থেকে এক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা এবং কাজ করতে না পারা মানুষের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব।
তিনি অবশ্য গাঁজা-ভিত্তিক চিকিৎসাকে কোনো অলৌকিক সমাধান হিসেবে দেখেন না। তাঁর মতে, অন্যান্য ওষুধের মতো এই চিকিৎসাও একজনের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে, আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে নাও হতে পারে।
শুধু খিঁচুনি নয়, বদলেছে পুরো জীবন
বিলির উন্নতি শুধু খিঁচুনি বন্ধ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর হাঁটা ও শরীরের ভারসাম্যও আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে। এখন তিনি সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে পারেন, যা কিছুদিন আগেও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
সামাজিক যোগাযোগেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে ঘরে কেউ এলে বিলি প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করতেন। এখন কেউ এলে তিনি এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেন—এটাই তাঁর নিজের মতো করে শুভেচ্ছা জানানোর পদ্ধতি।
বিলি এখন সাঁতার কাটতে, ঘোড়ায় চড়তে এবং হ্যারি পটার উপভোগ করতে ভালোবাসেন।
ভয় আর যন্ত্রের শব্দে ভরা রাত এখন শান্ত
বিলির সার্বক্ষণিক যত্ন এখনো প্রয়োজন। তবে তাঁর পরিবারের ঘরের পরিবেশে এসেছে আমূল পরিবর্তন।
একসময় তাঁর মা রাতে ঘুমাতে ভয় পেতেন। ঘুমের মধ্যে ছেলের খিঁচুনি শুরু হয়ে জীবনহানি ঘটতে পারে—এই আতঙ্ক সবসময় তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত।
এখন সেই ভয় নেই। বাড়িতে আর সারাক্ষণ যন্ত্রের শব্দ, ওষুধের সারি আর আতঙ্কের পরিবেশ নেই। তার বদলে এসেছে অনেক বেশি স্বাভাবিক ও শান্ত জীবন।
২১তম জন্মদিনে পরিবারের সঙ্গে বিলির এই উদযাপন তাই শুধু একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠান নয়। এটি এমন এক দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক, যেখানে একটি শিশুর চিকিৎসার অধিকার আদায়ের লড়াই শেষ পর্যন্ত একটি দেশের আইন পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















