০২:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
বিটিএস তারকা আরএমের শিল্পভ্রমণ, কোরীয় আধুনিকতার সঙ্গে বিশ্বকে সেতুবন্ধনের প্রয়াস লাহোরে আবার বসন্ত উৎসব, ২০২৭ সালের আয়োজন ১২ থেকে ১৪ মার্চ ভারতীয় উড়োজাহাজে পাকিস্তানের আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞা ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ল ইসলামাবাদ-রাওয়ালপিন্ডিতে টানা বৃষ্টি, লেহ নালায় বন্যার সতর্কতা ‘নিট পরীক্ষা পদ্ধতি ভুল-প্রতিরোধী, ফাঁকি দেওয়া কঠিন’: সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র তামিলনাড়ুতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ, মিনিটেই প্রত্যাহার বেগমগঞ্জে ১২ দিনে ৮ জনকে গুলি, অস্ত্রধারীরা এখনও অধরা দীপু মনি প্যারোলে মুক্তি পেলেই স্বামীর জানাজা ও দাফনের সিদ্ধান্ত কলকাতায় হোটেলে নিহত বাংলাদেশিরা সকলে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য মেধাবী বিজ্ঞানীদের টানতে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের লড়াই, বদলে যাচ্ছে আকর্ষণের কেন্দ্র

তুরস্কের কুর্দি সমঝোতার পরীক্ষা: বন্দুকের বদলে কি রাজনীতিই হতে পারে সমাধান?

তুরস্ক এমন এক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও প্রায় অকল্পনীয় মনে হতো। দেশটির পার্লামেন্ট এমন একটি আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের হাজারো সদস্য ও সমর্থক কারাগার কিংবা নির্বাসন থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে ফিরতে পারেন। প্রায় পাঁচ দশকের সংঘাতের পর এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসানের সম্ভাব্য পথ তৈরি করেছে।

আইনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কয়েক দশকের সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ‘সাধারণ ক্ষমা’ শব্দটি তুরস্কে এখনো বিতর্কিত। তাই আঙ্কারা এটিকে সরাসরি সাধারণ ক্ষমা হিসেবে উপস্থাপন করছে না। একই সঙ্গে এটি কোনো বিস্তৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার প্যাকেজও নয়। তবে এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়—তুরস্ক প্রথমবারের মতো দীর্ঘদিনের একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিয়ে আসার বাস্তব পরীক্ষা শুরু করেছে।

এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুরস্কের সীমানার বাইরেও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকারগুলো বছরের পর বছর সামরিক অভিযান, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পরাজিত করার চেষ্টা করেছে। তুরস্ক এখন অন্য একটি ধারণা পরীক্ষা করছে—প্রতিটি যোদ্ধাকে নির্মূল না করেও একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে পরাজিত করা সম্ভব, যদি এমন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করা যায় যেখানে অস্ত্রধারণের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।

সংঘাতের রাজনৈতিক সীমা

পিকেকে বহু দশক ধরে কুর্দিদের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে তুরস্কের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। এই সংঘাত তুরস্কের সীমান্ত ছাড়িয়ে ইরাক ও সিরিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষের মৃত্যু, কারাবরণ, বাস্তুচ্যুতি এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

Kurdish PKK Criticizes Bill on Fate of Its Fighters

গত বছর পিকেকে বিলুপ্তির পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং উত্তর ইরাকে অস্ত্র পুড়িয়ে প্রতীকী একটি অনুষ্ঠানও করে। সংগঠনটির কারাবন্দি প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা আবদুল্লাহ ওজালান পরে স্বীকার করেন, সশস্ত্র সংগ্রামের কার্যকারিতা শেষ হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, অস্ত্র ত্যাগের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বীকৃতি এবং একটি কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন।

তুরস্কের নতুন আইন সেই কাঠামোর একটি অংশ তৈরি করছে।

তবে এই আইনি সুরক্ষা সবার জন্য নিঃশর্ত নয়। তুরস্কের কর্তৃপক্ষকে প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে যে পিকেকে সত্যিই অস্ত্র ত্যাগ করেছে। গুরুতর অপরাধে জড়িতদের সঙ্গে সাধারণ সদস্যদের ক্ষেত্রেও আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সাধারণ যোদ্ধা, কারাবন্দি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং নির্বাসনে থাকা অনেকের জন্য এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বিচারিক কার্যক্রম পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত স্থগিত রাখার সুযোগ রয়েছে। শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নতুন করে সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া যাবে না।

এই সময়ের ব্যবস্থাটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে সাবেক যোদ্ধারা ধীরে ধীরে সমাজে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে তুরস্কের নিরাপত্তা কাঠামোও তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা ফিরে আসার ঝুঁকি মোকাবিলায় কিছু সুরক্ষা ধরে রাখবে।

পিকেকের শীর্ষ কমান্ডাররা আপাতত এই ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়া তদারকির জন্য পার্লামেন্টারি কমিশনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আর কুর্দিদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দেশের রাজনৈতিক পরিসরের ওপর।

অর্থাৎ এটি কোনো একক শান্তিচুক্তি নয়। বরং সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যাওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা।

যুদ্ধের ধরন বদলে যাওয়ার প্রভাব

তুরস্কের এই উদ্যোগ আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

প্রথাগত গেরিলা যুদ্ধের বড় শক্তি ছিল আত্মগোপন, দুর্গম ভূখণ্ড ব্যবহার এবং দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন সেই সুবিধাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে।

ড্রোন, ব্যাপক নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আরও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর গোপন চলাচল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে। তুরস্ক সিরিয়া ও ইরাকে পিকেকের বিরুদ্ধে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। ইসরায়েলও হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেছে। তবে গাজা ও লেবাননে এর মানবিক ও ধ্বংসাত্মক মূল্যও অত্যন্ত বড় হয়েছে।

কিন্তু প্রযুক্তি কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

কোনো সেনাবাহিনী অস্ত্রের গুদাম ধ্বংস করতে পারে, কমান্ডারদের হত্যা করতে পারে কিংবা একটি সংগঠনের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু কোনো জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তুরস্কের পরীক্ষার মূল প্রশ্ন এখানেই।

পিকেকে অস্ত্র ছাড়বে কি না, সেটি একমাত্র বিষয় নয়। আসল প্রশ্ন হলো—যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিগুলো একসময় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সামনে আনা হয়েছিল, সেগুলো কি এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গা পাবে, যেখানে বিরোধের সমাধান বন্দুক ছাড়াই সম্ভব?

Why the Kurdish Question Remains West Asia's Litmus Test to Embrace  Diversity in the Region - Frontline

পাহাড় থেকে পার্লামেন্টে

এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অস্ত্রের ভবিষ্যৎ নয়, রাজনীতির ভবিষ্যৎ।

দীর্ঘদিন ধরে কুর্দিদের কিছু দাবি সশস্ত্র সংগ্রাম ও গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো, একই বিরোধ কি নির্বাচন, পার্লামেন্ট, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে?

এর জন্য শুধু সাবেক যোদ্ধাদের অস্ত্র জমা দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাদের রাজনৈতিক পরিসরও প্রয়োজন।

এখানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের অধীনে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখবে। বৈধ কুর্দি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কতটা জায়গা রাখা হবে, সেটি এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

যদি সাবেক যোদ্ধা ও তাদের সমর্থকরা মনে করেন যে শান্তিপূর্ণ রাজনীতি তাদের বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির সুযোগ দিচ্ছে না, তাহলে অস্ত্র ত্যাগের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তাই পুনর্মিলনকে শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এমন একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হবে, যেখানে একসময় সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঝুঁকে পড়া মানুষও শান্তিপূর্ণ রাজনীতিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

হামাস ও হিজবুল্লাহর জন্যও কি শিক্ষা আছে?

তুরস্কের অভিজ্ঞতাকে হামাস বা হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না। তাদের ইতিহাস, সাংগঠনিক কাঠামো, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং সামরিক সক্ষমতা ভিন্ন। তারপরও একটি মৌলিক প্রশ্ন তিন ক্ষেত্রেই একই—কীভাবে কোনো সশস্ত্র সংগঠনকে তার অস্ত্র ত্যাগে রাজি করানো যায়, যদি তার সমর্থকরা মনে করে অস্ত্র ছাড়ার অর্থ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও হারিয়ে ফেলা?

লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ত্যাগের জন্য দেশটির শিয়া জনগোষ্ঠীকে বিশ্বাস করতে হবে যে সামরিক কাঠামো ছেড়ে দিলে তারা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল বা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে না। একই সঙ্গে লেবাননের রাষ্ট্রকে এমন পর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে হিজবুল্লাহর সমান্তরাল সামরিক কাঠামোর প্রয়োজন না থাকে।

রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেও এমন হতে হবে, যেখানে হিজবুল্লাহর সমর্থক জনগোষ্ঠী অস্ত্রের বাইরে থেকেও নিজেদের স্বার্থ ও দাবি সামনে আনতে পারে।

ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হামাসের

হামাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা রয়েছে।

গাজায় হামাসকে একটি পৃথক সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ দিলে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান কঠিন হবে। কিন্তু হামাসের অস্ত্র সরিয়ে ফেললেই ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যাবে না। তাই যেকোনো টেকসই ব্যবস্থায় ফিলিস্তিনিদের আত্মশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ থাকতে হবে।

সাবেক যোদ্ধাদের বিশ্বাস করতে হবে যে রাজনীতির মাধ্যমে এমন কিছু অর্জন করা সম্ভব, যা অস্ত্র দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

এই বিশ্বাস ছাড়া নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান সহজেই আত্মসমর্পণের দাবি হিসেবে দেখা হতে পারে।

খুব দ্রুত বিজয় ঘোষণা করাও বিপজ্জনক

তুরস্কের প্রক্রিয়া এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। অস্ত্র ত্যাগের অর্থ এই নয় যে কুর্দি প্রশ্নের সমাধান হয়ে গেছে। সাবেক যোদ্ধারা সফলভাবে সমাজে ফিরে যাবেন—এমন নিশ্চয়তাও নেই। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণ থাকবে, সেটিও নিশ্চিত নয়।

পুনর্মিলনের সবচেয়ে কঠিন জায়গাগুলোর একটি হলো পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাষ্ট্র চায় নিশ্চয়তা যে সহিংসতা আর ফিরবে না। অন্যদিকে সাবেক বিদ্রোহী ও তাদের সমর্থকরা চান নিশ্চয়তা যে শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে প্রবেশ করলে তারা নিরাপত্তাহীন বা স্থায়ীভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়বেন না।

এ জন্য উভয় পক্ষেরই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা প্রয়োজন।

তুরস্কের পদ্ধতিটি ধাপে ধাপে সেই আস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। সাবেক পিকেকে সদস্যদের জন্য শর্তসাপেক্ষ আইনি সুরক্ষা যেমন রাখা হয়েছে, তেমনি সশস্ত্র কর্মকাণ্ড আবার শুরু হলে রাষ্ট্রের হাতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকছে।

এটি একবারে ক্ষমা করে দেওয়ার মডেল নয়। বরং ধারাবাহিকভাবে এক পক্ষের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অন্য পক্ষের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করার চেষ্টা।

এই ধীরগতির পদ্ধতিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সাধারণত একটি নাটকীয় ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয় না। বরং এমন ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এগোয়, যেখানে আবার সহিংসতায় ফেরার প্রণোদনা কমতে থাকে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মূল্য বাড়তে থাকে।

Why is Turkey trying to change its name to 'Türkiye'? | Euronews

মধ্যপ্রাচ্যে বহু বছর ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রধানত নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। কীভাবে মিলিশিয়া ধ্বংস করা যায়, কীভাবে তাদের নেতাদের হত্যা করা যায়, কীভাবে হামলা ঠেকানো যায়—এসব প্রশ্নই সামনে ছিল।

কিন্তু আরও কঠিন প্রশ্নটি হলো, অস্ত্র নীরব হওয়ার পর কী হবে?

কোনো সশস্ত্র সংগঠনের পেছনে যদি বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষোভ ও বঞ্চনা থাকে, তাহলে শুধু তার সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করলেই সংঘাতের মূল কারণ দূর হয় না। সংগঠনটি হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যে পরিস্থিতি তাকে জন্ম দিয়েছে, তা থেকে যেতে পারে।

তুরস্ক সেই চক্র ভাঙার চেষ্টা করছে।

এই পরীক্ষা সফল হলেই প্রমাণ হবে না যে বিশ্বের প্রতিটি বিদ্রোহকে একইভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা সম্ভব। গাজা, লেবানন কিংবা অন্য কোনো সংঘাতের জন্যও এটি প্রস্তুত কোনো ফর্মুলা নয়। প্রতিটি সংঘাতের নিজস্ব ইতিহাস, শক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে।

তবু তুরস্কের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সামনে আনে—নিরস্ত্রীকরণ তখনই টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, যখন তার সঙ্গে একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যুক্ত থাকে।

লক্ষ্য শুধু যোদ্ধাদের অস্ত্র ছেড়ে দিতে রাজি করানো নয়। এমন পরিস্থিতি তৈরি করাই আসল লক্ষ্য, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব অর্জনের জন্য অস্ত্র ধরে রাখার চেয়ে রাজনীতিতে অংশ নেওয়াকে বেশি কার্যকর মনে হবে।

সামরিকভাবে কোনো সশস্ত্র সংগঠনকে পরাজিত করার চেয়ে এটি অনেক কঠিন কাজ। কিন্তু এটিই হয়তো বিজয়ের আরও অর্থবহ সংজ্ঞা।

সংঘাত সত্যিকার অর্থে শেষ হয় না যখন শেষ যোদ্ধাটিও পরাজিত হয়। সংঘাত তখনই শেষ হওয়ার পথে যায়, যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এতটাই কার্যকর, বৈধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে যে একজন সাবেক যোদ্ধা মনে করেন—অস্ত্র হাতে থাকার চেয়ে রাজনীতিবিদ হওয়াই তার জন্য বেশি অর্থবহ।

তুরস্ক এখন সেই রূপান্তর সম্ভব কি না, তার পরীক্ষা চালাচ্ছে। ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু প্রায় পাঁচ দশকের সংঘাতের পর একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে রাজনীতিতে রূপান্তরের এই চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিটিএস তারকা আরএমের শিল্পভ্রমণ, কোরীয় আধুনিকতার সঙ্গে বিশ্বকে সেতুবন্ধনের প্রয়াস

তুরস্কের কুর্দি সমঝোতার পরীক্ষা: বন্দুকের বদলে কি রাজনীতিই হতে পারে সমাধান?

০১:০৮:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

তুরস্ক এমন এক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও প্রায় অকল্পনীয় মনে হতো। দেশটির পার্লামেন্ট এমন একটি আইন পাস করেছে, যার মাধ্যমে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের হাজারো সদস্য ও সমর্থক কারাগার কিংবা নির্বাসন থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে ফিরতে পারেন। প্রায় পাঁচ দশকের সংঘাতের পর এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসানের সম্ভাব্য পথ তৈরি করেছে।

আইনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কয়েক দশকের সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে ‘সাধারণ ক্ষমা’ শব্দটি তুরস্কে এখনো বিতর্কিত। তাই আঙ্কারা এটিকে সরাসরি সাধারণ ক্ষমা হিসেবে উপস্থাপন করছে না। একই সঙ্গে এটি কোনো বিস্তৃত গণতান্ত্রিক সংস্কার প্যাকেজও নয়। তবে এর গুরুত্ব অন্য জায়গায়—তুরস্ক প্রথমবারের মতো দীর্ঘদিনের একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিয়ে আসার বাস্তব পরীক্ষা শুরু করেছে।

এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুরস্কের সীমানার বাইরেও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকারগুলো বছরের পর বছর সামরিক অভিযান, লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পরাজিত করার চেষ্টা করেছে। তুরস্ক এখন অন্য একটি ধারণা পরীক্ষা করছে—প্রতিটি যোদ্ধাকে নির্মূল না করেও একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে পরাজিত করা সম্ভব, যদি এমন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করা যায় যেখানে অস্ত্রধারণের প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়।

সংঘাতের রাজনৈতিক সীমা

পিকেকে বহু দশক ধরে কুর্দিদের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে তুরস্কের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। এই সংঘাত তুরস্কের সীমান্ত ছাড়িয়ে ইরাক ও সিরিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষের মৃত্যু, কারাবরণ, বাস্তুচ্যুতি এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

Kurdish PKK Criticizes Bill on Fate of Its Fighters

গত বছর পিকেকে বিলুপ্তির পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং উত্তর ইরাকে অস্ত্র পুড়িয়ে প্রতীকী একটি অনুষ্ঠানও করে। সংগঠনটির কারাবন্দি প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা আবদুল্লাহ ওজালান পরে স্বীকার করেন, সশস্ত্র সংগ্রামের কার্যকারিতা শেষ হয়ে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, অস্ত্র ত্যাগের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বীকৃতি এবং একটি কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন।

তুরস্কের নতুন আইন সেই কাঠামোর একটি অংশ তৈরি করছে।

তবে এই আইনি সুরক্ষা সবার জন্য নিঃশর্ত নয়। তুরস্কের কর্তৃপক্ষকে প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে যে পিকেকে সত্যিই অস্ত্র ত্যাগ করেছে। গুরুতর অপরাধে জড়িতদের সঙ্গে সাধারণ সদস্যদের ক্ষেত্রেও আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সাধারণ যোদ্ধা, কারাবন্দি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং নির্বাসনে থাকা অনেকের জন্য এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক নাগরিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে বিচারিক কার্যক্রম পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত স্থগিত রাখার সুযোগ রয়েছে। শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নতুন করে সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া যাবে না।

এই সময়ের ব্যবস্থাটিও গুরুত্বপূর্ণ। এতে সাবেক যোদ্ধারা ধীরে ধীরে সমাজে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে তুরস্কের নিরাপত্তা কাঠামোও তাৎক্ষণিকভাবে সহিংসতা ফিরে আসার ঝুঁকি মোকাবিলায় কিছু সুরক্ষা ধরে রাখবে।

পিকেকের শীর্ষ কমান্ডাররা আপাতত এই ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়া তদারকির জন্য পার্লামেন্টারি কমিশনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আর কুর্দিদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দেশের রাজনৈতিক পরিসরের ওপর।

অর্থাৎ এটি কোনো একক শান্তিচুক্তি নয়। বরং সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যাওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা।

যুদ্ধের ধরন বদলে যাওয়ার প্রভাব

তুরস্কের এই উদ্যোগ আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

প্রথাগত গেরিলা যুদ্ধের বড় শক্তি ছিল আত্মগোপন, দুর্গম ভূখণ্ড ব্যবহার এবং দীর্ঘ সময় ধরে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলা। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন সেই সুবিধাকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে।

ড্রোন, ব্যাপক নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আরও নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহারের ফলে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর গোপন চলাচল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে। তুরস্ক সিরিয়া ও ইরাকে পিকেকের বিরুদ্ধে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। ইসরায়েলও হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেছে। তবে গাজা ও লেবাননে এর মানবিক ও ধ্বংসাত্মক মূল্যও অত্যন্ত বড় হয়েছে।

কিন্তু প্রযুক্তি কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

কোনো সেনাবাহিনী অস্ত্রের গুদাম ধ্বংস করতে পারে, কমান্ডারদের হত্যা করতে পারে কিংবা একটি সংগঠনের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু কোনো জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তুরস্কের পরীক্ষার মূল প্রশ্ন এখানেই।

পিকেকে অস্ত্র ছাড়বে কি না, সেটি একমাত্র বিষয় নয়। আসল প্রশ্ন হলো—যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবিগুলো একসময় সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সামনে আনা হয়েছিল, সেগুলো কি এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জায়গা পাবে, যেখানে বিরোধের সমাধান বন্দুক ছাড়াই সম্ভব?

Why the Kurdish Question Remains West Asia's Litmus Test to Embrace  Diversity in the Region - Frontline

পাহাড় থেকে পার্লামেন্টে

এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অস্ত্রের ভবিষ্যৎ নয়, রাজনীতির ভবিষ্যৎ।

দীর্ঘদিন ধরে কুর্দিদের কিছু দাবি সশস্ত্র সংগ্রাম ও গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো, একই বিরোধ কি নির্বাচন, পার্লামেন্ট, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে?

এর জন্য শুধু সাবেক যোদ্ধাদের অস্ত্র জমা দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাদের রাজনৈতিক পরিসরও প্রয়োজন।

এখানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের অধীনে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখবে। বৈধ কুর্দি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য কতটা জায়গা রাখা হবে, সেটি এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।

যদি সাবেক যোদ্ধা ও তাদের সমর্থকরা মনে করেন যে শান্তিপূর্ণ রাজনীতি তাদের বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির সুযোগ দিচ্ছে না, তাহলে অস্ত্র ত্যাগের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তাই পুনর্মিলনকে শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এমন একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হবে, যেখানে একসময় সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে ঝুঁকে পড়া মানুষও শান্তিপূর্ণ রাজনীতিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

হামাস ও হিজবুল্লাহর জন্যও কি শিক্ষা আছে?

তুরস্কের অভিজ্ঞতাকে হামাস বা হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না। তাদের ইতিহাস, সাংগঠনিক কাঠামো, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং সামরিক সক্ষমতা ভিন্ন। তারপরও একটি মৌলিক প্রশ্ন তিন ক্ষেত্রেই একই—কীভাবে কোনো সশস্ত্র সংগঠনকে তার অস্ত্র ত্যাগে রাজি করানো যায়, যদি তার সমর্থকরা মনে করে অস্ত্র ছাড়ার অর্থ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও হারিয়ে ফেলা?

লেবাননে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ত্যাগের জন্য দেশটির শিয়া জনগোষ্ঠীকে বিশ্বাস করতে হবে যে সামরিক কাঠামো ছেড়ে দিলে তারা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল বা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে না। একই সঙ্গে লেবাননের রাষ্ট্রকে এমন পর্যায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে হিজবুল্লাহর সমান্তরাল সামরিক কাঠামোর প্রয়োজন না থাকে।

রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেও এমন হতে হবে, যেখানে হিজবুল্লাহর সমর্থক জনগোষ্ঠী অস্ত্রের বাইরে থেকেও নিজেদের স্বার্থ ও দাবি সামনে আনতে পারে।

ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হামাসের

হামাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা রয়েছে।

গাজায় হামাসকে একটি পৃথক সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ দিলে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান কঠিন হবে। কিন্তু হামাসের অস্ত্র সরিয়ে ফেললেই ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যাবে না। তাই যেকোনো টেকসই ব্যবস্থায় ফিলিস্তিনিদের আত্মশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ থাকতে হবে।

সাবেক যোদ্ধাদের বিশ্বাস করতে হবে যে রাজনীতির মাধ্যমে এমন কিছু অর্জন করা সম্ভব, যা অস্ত্র দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়।

এই বিশ্বাস ছাড়া নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান সহজেই আত্মসমর্পণের দাবি হিসেবে দেখা হতে পারে।

খুব দ্রুত বিজয় ঘোষণা করাও বিপজ্জনক

তুরস্কের প্রক্রিয়া এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত। অস্ত্র ত্যাগের অর্থ এই নয় যে কুর্দি প্রশ্নের সমাধান হয়ে গেছে। সাবেক যোদ্ধারা সফলভাবে সমাজে ফিরে যাবেন—এমন নিশ্চয়তাও নেই। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণ থাকবে, সেটিও নিশ্চিত নয়।

পুনর্মিলনের সবচেয়ে কঠিন জায়গাগুলোর একটি হলো পারস্পরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাষ্ট্র চায় নিশ্চয়তা যে সহিংসতা আর ফিরবে না। অন্যদিকে সাবেক বিদ্রোহী ও তাদের সমর্থকরা চান নিশ্চয়তা যে শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে প্রবেশ করলে তারা নিরাপত্তাহীন বা স্থায়ীভাবে প্রান্তিক হয়ে পড়বেন না।

এ জন্য উভয় পক্ষেরই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা প্রয়োজন।

তুরস্কের পদ্ধতিটি ধাপে ধাপে সেই আস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। সাবেক পিকেকে সদস্যদের জন্য শর্তসাপেক্ষ আইনি সুরক্ষা যেমন রাখা হয়েছে, তেমনি সশস্ত্র কর্মকাণ্ড আবার শুরু হলে রাষ্ট্রের হাতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকছে।

এটি একবারে ক্ষমা করে দেওয়ার মডেল নয়। বরং ধারাবাহিকভাবে এক পক্ষের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অন্য পক্ষের প্রতিশ্রুতি যুক্ত করার চেষ্টা।

এই ধীরগতির পদ্ধতিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সাধারণত একটি নাটকীয় ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয় না। বরং এমন ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এগোয়, যেখানে আবার সহিংসতায় ফেরার প্রণোদনা কমতে থাকে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মূল্য বাড়তে থাকে।

Why is Turkey trying to change its name to 'Türkiye'? | Euronews

মধ্যপ্রাচ্যে বহু বছর ধরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রধানত নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। কীভাবে মিলিশিয়া ধ্বংস করা যায়, কীভাবে তাদের নেতাদের হত্যা করা যায়, কীভাবে হামলা ঠেকানো যায়—এসব প্রশ্নই সামনে ছিল।

কিন্তু আরও কঠিন প্রশ্নটি হলো, অস্ত্র নীরব হওয়ার পর কী হবে?

কোনো সশস্ত্র সংগঠনের পেছনে যদি বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষোভ ও বঞ্চনা থাকে, তাহলে শুধু তার সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করলেই সংঘাতের মূল কারণ দূর হয় না। সংগঠনটি হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যে পরিস্থিতি তাকে জন্ম দিয়েছে, তা থেকে যেতে পারে।

তুরস্ক সেই চক্র ভাঙার চেষ্টা করছে।

এই পরীক্ষা সফল হলেই প্রমাণ হবে না যে বিশ্বের প্রতিটি বিদ্রোহকে একইভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তর করা সম্ভব। গাজা, লেবানন কিংবা অন্য কোনো সংঘাতের জন্যও এটি প্রস্তুত কোনো ফর্মুলা নয়। প্রতিটি সংঘাতের নিজস্ব ইতিহাস, শক্তির ভারসাম্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে।

তবু তুরস্কের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি সামনে আনে—নিরস্ত্রীকরণ তখনই টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, যখন তার সঙ্গে একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যুক্ত থাকে।

লক্ষ্য শুধু যোদ্ধাদের অস্ত্র ছেড়ে দিতে রাজি করানো নয়। এমন পরিস্থিতি তৈরি করাই আসল লক্ষ্য, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব অর্জনের জন্য অস্ত্র ধরে রাখার চেয়ে রাজনীতিতে অংশ নেওয়াকে বেশি কার্যকর মনে হবে।

সামরিকভাবে কোনো সশস্ত্র সংগঠনকে পরাজিত করার চেয়ে এটি অনেক কঠিন কাজ। কিন্তু এটিই হয়তো বিজয়ের আরও অর্থবহ সংজ্ঞা।

সংঘাত সত্যিকার অর্থে শেষ হয় না যখন শেষ যোদ্ধাটিও পরাজিত হয়। সংঘাত তখনই শেষ হওয়ার পথে যায়, যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এতটাই কার্যকর, বৈধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে যে একজন সাবেক যোদ্ধা মনে করেন—অস্ত্র হাতে থাকার চেয়ে রাজনীতিবিদ হওয়াই তার জন্য বেশি অর্থবহ।

তুরস্ক এখন সেই রূপান্তর সম্ভব কি না, তার পরীক্ষা চালাচ্ছে। ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু প্রায় পাঁচ দশকের সংঘাতের পর একটি সশস্ত্র আন্দোলনকে রাজনীতিতে রূপান্তরের এই চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।