নারীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় বেশি সক্রিয় হলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক দিক রয়েছে—অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নারীদের অনেক বেশি। নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন ১ হাজারের বেশি জেনেটিক ‘সুইচ’ শনাক্ত করেছেন, যা নারী ও পুরুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভিন্ন আচরণের কারণ ব্যাখ্যায় নতুন সূত্র দিতে পারে।
গারভান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চ ও নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান জার্নাল অব হিউম্যান জেনেটিকসে। গবেষকদের মতে, ফলাফলটি বিশেষ করে লুপাসের মতো অটোইমিউন রোগ নারীদের মধ্যে কেন অনেক বেশি দেখা যায়, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীদের লুপাসে আক্রান্ত হওয়ার হার নয় গুণ পর্যন্ত বেশি।
একই রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভিন্ন প্রতিক্রিয়া
অটোইমিউন রোগে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজের সুস্থ কোষ ও টিস্যুকেই আক্রমণ করে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও পুরুষের রোগপ্রতিরোধী কোষে এক হাজারের বেশি জেনেটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভিন্নভাবে কাজ করে। এসব পার্থক্যের বড় একটি অংশ প্রদাহজনিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এবং নারীদের রোগপ্রতিরোধী কোষে প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কার্যক্রম বেশি সক্রিয় ছিল।
গবেষণার প্রধান লেখক গারভানের ড. সেহান ইয়াজার বলেন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের লিঙ্গভিত্তিক জৈবিক পার্থক্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে একক-কোষ প্রযুক্তি, যা একই ধরনের দেখালেও আলাদা আলাদা রোগপ্রতিরোধী কোষের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করতে পারে। গবেষকরা প্রায় ১ হাজার সুস্থ মানুষের রক্ত থেকে সংগৃহীত ১২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রোগপ্রতিরোধী কোষ বিশ্লেষণ করেন। এসব অংশগ্রহণকারী ওয়ানকে১কে গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার লক্ষ্য জেনেটিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে রোগপ্রতিরোধী কোষকে প্রভাবিত করে তা বোঝা।
গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষদের রক্তে মনোসাইটের পরিমাণ বেশি। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই কোষ। অন্যদিকে নারীদের বি কোষ ও নিয়ন্ত্রক টি কোষের সংখ্যা বেশি ছিল। নারীদের রোগপ্রতিরোধী কোষে প্রদাহের সঙ্গে যুক্ত জিনগুলোর কার্যক্রমও তুলনামূলক বেশি সক্রিয় পাওয়া যায়।
প্রদাহ বেশি, অটোইমিউন ঝুঁকিও বেশি
গবেষকদের মতে, নারীদের তুলনামূলক শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া ভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে তাদের বেশি কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারে। তবে একই প্রবণতা শরীরের নিজস্ব টিস্যুর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া তৈরির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বিপরীতে, পুরুষদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রদাহের দিকে তুলনামূলক কম ঝুঁকে থাকায় তারা কিছু সংক্রমণ ও প্রজনন-সম্পর্কিত নয় এমন নির্দিষ্ট ক্যানসারের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
জেনেটিক নিয়ন্ত্রণের নতুন সূত্র
গবেষকরা ইকিউটিএল নামে পরিচিত জেনেটিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর বিশেষভাবে নজর দেন। এগুলোকে অনেকটা জিনের ‘ভলিউম সুইচ’ হিসেবে দেখা যায়, যা নির্দিষ্ট জিনের কার্যক্রম বাড়াতে বা কমাতে পারে।
এতদিন নারী-পুরুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পার্থক্যকে প্রধানত এক্স ও ওয়াই যৌন ক্রোমোজোমের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষের মধ্যে ভিন্নভাবে কাজ করা অধিকাংশ জেনেটিক সুইচ যৌন ক্রোমোজোমে নয়; বরং উভয় লিঙ্গের মধ্যেই থাকা অটোসোমে অবস্থিত।
গবেষকরা এমন এক হাজারের বেশি সুইচ শনাক্ত করেছেন, যার কয়েকটির সঙ্গে অটোইমিউন রোগের সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে দুটি জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী জেনেটিক পরিবর্তন সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস বা লুপাসের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পাওয়া গেছে। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, অটোইমিউন রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু জেনেটিক্স নয়, হরমোন, জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত নানা কারণও ভূমিকা রাখে।
ভবিষ্যতে আরও নির্দিষ্ট চিকিৎসার সম্ভাবনা
গবেষকদের মতে, এই ফলাফল ভবিষ্যতে লুপাসসহ অটোইমিউন রোগের চিকিৎসা আরও নির্দিষ্ট ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করার পথ খুলে দিতে পারে। বর্তমানে অনেক চিকিৎসাই পুরো রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে দমন করে, ফলে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই মাত্রায় কার্যকর হয় না।
গবেষণার সহ-প্রধান লেখক ড. সারা বালুজ বলেন, নারী ও পুরুষের অটোইমিউন রোগের জৈবিক প্রক্রিয়া সবসময় এক নয়। তাই চিকিৎসা পদ্ধতিও একই ধরনের হওয়া প্রয়োজন নাও হতে পারে। গারভানের ট্রান্সলেশনাল জিনোমিকস প্রোগ্রামের পরিচালক অধ্যাপক জোসেফ পাওয়েলের মতে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা আরও কার্যকর করতে রোগীর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে জেনেটিক স্তরে কাজ করে, তা বোঝা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















