তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেই দখল বা প্রতিরোধের সম্ভাব্য যুদ্ধে একটি নদী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাজধানীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তামসুই নদীকে ঘিরেই সাম্প্রতিক সামরিক মহড়ায় বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে তাইওয়ানের সেনাবাহিনী। সম্ভাব্য চীনা হামলার ক্ষেত্রে এই নদীপথ দিয়ে শত্রুপক্ষ রাজধানীর কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় নদীটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর একেবারে কাছে তামসুই নদী
তাইওয়ানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত তামসুই নদী রাজধানী তাইপেইয়ের কাছে এসে প্রশস্ত হয়ে প্রণালিতে মিশেছে। নদীর অবস্থান তাইপেইয়ের জন্য একই সঙ্গে কৌশলগত সুবিধা ও ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় নদী থেকে এক মাইলেরও কম দূরে হওয়ায় শত্রুপক্ষ নদীপথ ব্যবহার করে এগোতে পারলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রুত হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তাইওয়ানের বার্ষিক দশ দিনের সামরিক মহড়া ‘হান কুয়াং’-এর এবারের অনুশীলনে নদীটির প্রতিরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহড়ার বিভিন্ন পর্যায়ে সেনারা রাজধানীর দিকে সম্ভাব্য অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সড়ক অবরোধ, বালুর বস্তা, ধাতব প্রতিবন্ধক এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করে।
তামসুই নদীর মোহনা, বালি সৈকত ও তাইপেই বন্দরকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। নদীর কাছের বালি সৈকত সম্ভাব্য অবতরণস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে তাইপেই বন্দর ব্যবহার করে কোনো আক্রমণকারী বাহিনী দ্রুত সেনা ও সরঞ্জাম নামানোর সুযোগ পেতে পারে।
নদীপথে আকস্মিক হামলার আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সেনাবাহিনী নদীপথ ব্যবহার করে আকস্মিক আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা রাখে। দ্রুতগামী অবতরণযান কিংবা আকাশপথে নামানো সেনাদের মাধ্যমে তামসুই নদীর করিডর ব্যবহার করে রাজধানীর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।
এই আশঙ্কা থেকেই মহড়ায় নদীর মোহনায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধক স্থাপনের অনুশীলন করেছে তাইওয়ানের সেনারা। এক পর্যায়ে সেনা ও ডুবুরিরা বিস্ফোরকভর্তি ব্যারেল যুক্ত ভাসমান কাঠামো নদীতে স্থাপন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য আক্রমণকারী বাহিনীর অগ্রযাত্রা বিলম্বিত করা।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত সময় ধরে রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা রক্ষা করা। কারণ দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে বাইরের মিত্রদের সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
রাজধানী ঘিরে বাড়ছে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি
তাইওয়ানের সামরিক পরিকল্পনায় সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী অঞ্চলকে আরও শক্তিশালী করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিভিন্ন সামরিক ইউনিটকে রাজধানীর দিকে সরিয়ে আনার অনুশীলনও করা হয়েছে।
এর লক্ষ্য শুধু রাজধানী রক্ষা নয়, দ্বীপের অন্য কোনো অংশ শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেও তাইপেইকে ধরে রাখা। একই সঙ্গে রাজধানীর দিকে আকস্মিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
তামসুই নদীর দক্ষিণ দিক থেকেও তাইপেইয়ের দিকে অগ্রসর হতে হলে আক্রমণকারী বাহিনীকে নদী পার হতে হবে। ফলে নদীর ওপর থাকা সেতুগুলোও প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সেতুতে তৈরি হচ্ছে প্রতিরোধের স্তর
হান কুয়াং মহড়ার সময় নতুন দানজিয়াং সেতুতেও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। প্রকৌশলী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা সেখানে কংক্রিটের প্রতিবন্ধক, কাঁটাতার এবং যানবাহনের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর বিশেষ ধাতব কাঠামো নিয়ে তিন স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেন।
সামরিক মহড়ায় বাস্তব প্রতিরক্ষা অবস্থান ও মাঠপর্যায়ের দুর্গ নির্মাণের অনুশীলন থেকে স্পষ্ট, তাইওয়ান তামসুই নদীপথে সম্ভাব্য হামলাকে কেবল তাত্ত্বিক আশঙ্কা হিসেবে দেখছে না। বরং রাজধানীর প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই নদীটিকে বিবেচনা করছে।
আকস্মিক আক্রমণ ঠেকানোই মূল লক্ষ্য
তাইওয়ানের সামরিক নেতৃত্বের কাছে আশঙ্কার আরেকটি বিষয় হলো নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা। এবারের মহড়ার শুরুতেই প্রেসিডেন্ট লাই ছিং-তে ও তাঁর কর্মকর্তারা এমন একটি কাল্পনিক হামলার পরিস্থিতিতে সুরক্ষিত স্থানে সরে যাওয়ার অনুশীলন করেন।
সব মিলিয়ে তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় তামসুই নদী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরোধরেখা। চীনের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান যদি রাজধানীর দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে নদী, সেতু, বন্দর ও আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রতিরোধ গড়ে তুলে আক্রমণের গতি কমিয়ে দেওয়াই হতে পারে তাইওয়ানের অন্যতম প্রধান কৌশল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















