অনলাইনের বিভিন্ন বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি পণ্য ও উপকরণের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে ক্রেতাদের আগ্রহও বাড়ছে—এমনটা দেখা যাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে মানুষ এখনো মানুষের তৈরি পণ্যের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।
ত্রিমাত্রিক নকশার অনলাইন বাজারের একটি সাম্প্রতিক চিত্র এ প্রবণতাকে স্পষ্ট করেছে। ওই বাজারে এক বছর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি উপকরণ বিক্রির সুযোগ চালু করা হয়। সেখানে স্থপতি, ভিডিও নির্মাতা, খেলাধুলাভিত্তিক নকশাকারীসহ বিভিন্ন সৃজনশীল পেশার মানুষ ব্যবহার করতে পারেন—এমন ২০ লাখের বেশি ত্রিমাত্রিক নকশা বিক্রি হয়।
কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি নকশার সংখ্যা বাড়লেও বিক্রিতে তার প্রতিফলন খুবই সামান্য।
পণ্যের ভিড় বাড়লেও বিক্রি কম
গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত বাজারের বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে জমা পড়া প্রতি ছয়টি নকশার মধ্যে প্রায় একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। কিন্তু এসব নকশা থেকে এসেছে প্রতি ৯০ ডলারের আয়ে মাত্র ১ ডলার। মোট বিক্রির হিসাবেও এসব পণ্যের অংশ মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ, তালিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি পণ্য দ্রুত জায়গা করে নিলেও ক্রেতারা সেগুলোর জন্য এখনো তেমন অর্থ খরচ করছেন না।
বাজারটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দালিয়া লাসাইতে মনে করেন, এর কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষ অপছন্দ করে—বিষয়টি এমন নয়। বরং ক্রেতারা এখনো মানুষের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বাড়তি মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তার ভাষায়, ক্রেতারা যখন কোনো বাজার থেকে পণ্য কেনেন, তখন তারা অত্যন্ত উন্নত মানের কাজ চান। সেই কারণেই অন্তত বর্তমান সময়ে মানুষের তৈরি ত্রিমাত্রিক নকশার প্রতি তাদের ঝোঁক বেশি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মানুষের মনোভাব বদলাচ্ছে
সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে মানুষের মনোভাব অবশ্য একরকম নয়।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, মানুষকে একই অনলাইন বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের তৈরি শিল্পকর্মের মধ্যে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি কাজের দিকে ঝুঁকেছিলেন। এর ফলে বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ছবির সংখ্যাও দ্রুত বেড়ে যায়।
কিন্তু অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক মানুষ জানিয়েছেন, কোনো চিত্রকর্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হয়েছে জানতে পারার পর সেটি তাদের কাছে আগের তুলনায় কম আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক জরিপে ৫২ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন, দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার বিষয়ে তারা উৎসাহের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ।
নতুন পণ্য বাড়ছে, কিন্তু ব্যবহারকারীর আগ্রহ কমছে
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট লুইস শাখার ব্যবসায় শিক্ষার অধ্যাপক ডেনিস ঝাং মনে করেন, অনলাইন বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি পণ্যের বিস্তার শুধু প্রযুক্তিটিকে মানুষ কীভাবে দেখছে, তার প্রতিফলন নয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে মানুষের ভূমিকারও একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি স্মার্টফোনের নতুন ধরনের সফটওয়্যার তৈরির প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। কোড লেখার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন সফটওয়্যার তৈরির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ দুই বছর আগের একই সময়ের তুলনায় নতুন সফটওয়্যার তৈরির হার প্রায় ১৬০ শতাংশ বেড়েছিল।
কিন্তু নতুন সফটওয়্যারের সংখ্যা বাড়লেও ব্যবহারকারীর আগ্রহ একই হারে বাড়েনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের পর ১০টির বেশি ব্যবহারকারী মতামত পাওয়া সফটওয়্যারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে ধারণা করা যায়, মানুষের তৈরি সফটওয়্যারের তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি অনেক পণ্যের প্রতি ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা কম ছিল।
তবে গবেষকরা এটিকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখেননি।
অভিজ্ঞতার ঘাটতিও বড় কারণ
ঝাংয়ের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি সব পণ্য যে মানুষ প্রত্যাখ্যান করছে, তা নয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে নতুন নির্মাতারা প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত পণ্য তৈরি করতে পারছেন, কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অভাবে সেই পণ্যের মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
বিশেষ করে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা, নকশার সূক্ষ্মতা এবং পণ্যের ব্যবহারযোগ্যতার মতো বিষয়গুলোতে অভিজ্ঞ নির্মাতারা এগিয়ে থাকেন।
অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন অনেক মানুষকে দ্রুত পণ্য তৈরির সুযোগ দিলেও তাদের অনেকের প্রয়োজনীয় পেশাগত অভিজ্ঞতা এখনো তৈরি হয়নি। ফলে পণ্যের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মান সবসময় সেই অনুপাতে বাড়ছে না।
মানুষ এখন মানবিক মূল্য খুঁজছে
আরেকটি কারণ হতে পারে মানুষের স্বাতন্ত্র্যের প্রতি আকর্ষণ। কোনো পণ্য যদি সম্পূর্ণভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি বলে মনে হয়, তাহলে ক্রেতা হয়তো সেটিতে মানুষের নিজস্ব চিন্তা, দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ছাপ কম দেখতে পান।
ঝাংয়ের ধারণা, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বেশি সাধারণ হয়ে উঠবে, মানুষ তত বেশি এমন বৈশিষ্ট্যকে মূল্য দেবে যা সহজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা যায় না।
অর্থাৎ প্রযুক্তি যত বেশি মানুষের কাজের জায়গা নেবে, মানুষের তৈরি অংশের মূল্যও হয়তো তত বাড়তে পারে।
কাজ হারানোর বদলে কাজের ধরন বদলাবে
ঝাং মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থান পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার চেয়ে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন মানুষকে নতুন দায়িত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি বাজারে ক্রেতাদের আচরণও মানুষের বিশেষ দক্ষতার মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে।
ত্রিমাত্রিক নকশার বাজারটির প্রধান নির্বাহীর পর্যবেক্ষণও প্রায় একই। শুরুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নির্মাতাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তারা বুঝেছেন, এই প্রযুক্তি জীবনেরই একটি অংশ হয়ে উঠবে।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজের সবকিছু কেড়ে নেওয়ার বদলে মানুষকে আরও উৎপাদনশীল হতে সাহায্য করতে পারে। মানুষ নিজের কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল অংশ নিজের কাছে রেখে অপেক্ষাকৃত সহজ কাজগুলো প্রযুক্তির সহায়তায় করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত অনলাইন বাজারের এই প্রবণতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত পণ্য তৈরির ক্ষমতা বাড়ালেও মানুষের সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও ব্যক্তিগত স্পর্শের মূল্য এখনো কমেনি। বরং প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















