এল নিনো-প্রভাবে মধ্য আমেরিকাজুড়ে তীব্র খরা দেখা দেওয়ায় পানামা খালে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাল কর্তৃপক্ষ। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযোগকারী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে আগামী মাস থেকে প্রতিদিন কমসংখ্যক জাহাজ চলাচল করতে পারবে।
সেপ্টেম্বর থেকে কমবে জাহাজ চলাচল
পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পানির স্তর কমে যাওয়ায় আগামী ৩ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩৪টি জাহাজ খাল অতিক্রম করতে পারবে। বর্তমানে প্রতিদিন ৩৬টি জাহাজ চলাচলের অনুমতি রয়েছে।
এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে ৩২টিতে নামিয়ে আনা হবে। কর্তৃপক্ষ বলছে, খালকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে এবং পানির মজুত রক্ষায় এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
খালের পানির প্রধান উৎস দুটি কৃত্রিম হ্রদে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত খাল এলাকায় ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় বৃষ্টিপাত ৩৪ শতাংশ কম হয়েছে। আগামী দিনগুলোতেও এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টিপাত আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্যে বড় প্রভাব
পানামা খাল দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশও এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জাহাজ চলাচল কমে গেলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে।
খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগে থেকে সংরক্ষণ না করা জাহাজগুলোর অপেক্ষার সময় নতুন করে বাড়তে পারে। খাল ব্যবহারকারী ১০টি জাহাজের মধ্যে প্রায় ৯টিই আগাম সময় সংরক্ষণ করে চলাচল করে। অবশিষ্ট সুযোগগুলো নিলামের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
নিলামে বেড়েছে পারাপারের খরচ
পানামা খাল দিয়ে দ্রুত পার হওয়ার সুযোগ পেতে নিলামে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে কিছু জাহাজ কোম্পানি। ইরান যুদ্ধের আগে এসব নিলামে গড় বিজয়ী দর ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার। তবে এপ্রিলে একটি জাহাজ কোম্পানি খাল ব্যবহারের সুযোগ পেতে প্রায় ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করে।
খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহে বৃষ্টিপাতের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে জাহাজ চলাচলে আরও বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এর আগেও কমেছিল জাহাজ চলাচল
২০২৩ সালে পানামা খালের পানির স্তর এতটাই কমে গিয়েছিল যে প্রতিদিন জাহাজ পারাপারের সংখ্যা ৩৮ থেকে কমিয়ে ২২-এ নামিয়ে আনতে হয়েছিল। একই সঙ্গে বড় জাহাজের পানিতে নিমজ্জিত থাকার সর্বোচ্চ গভীরতাও কমানো হয়েছিল।
এবারও পানি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। খালের মাধ্যমে যাতায়াতকারী বড় জাহাজের সর্বোচ্চ নিমজ্জন গভীরতা কমানোর মতো ব্যবস্থাও ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে।
পানির সংকটে পানামার জনজীবনও
পানামায় পানির সংকট শুধু আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের বিষয় নয়। যে হ্রদগুলো থেকে পানামা খালের জন্য পানি সরবরাহ করা হয়, সেগুলোই দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষের পানির চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। ফলে খালের জন্য পানি সংরক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের পানির প্রয়োজন—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পানামা খালের প্রধান ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, চিলি ও দক্ষিণ কোরিয়া।
শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব
সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয়। চলতি বছরের এল নিনোকে এখন পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর প্রভাবে মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশে খরা পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে।
এরই মধ্যে বুধবার হন্ডুরাস সরকার দেশটির ৮০ শতাংশ এলাকাকে খরা সতর্কতার আওতায় এনেছে। ফলে পানামা খালসহ পুরো মধ্য আমেরিকার পানি ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার ওপর জলবায়ু পরিস্থিতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















