নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার জন্য শুক্রবার বৈঠকে বসছেন চীন ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের মধ্যেই জাকার্তা দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দুই বছর পর প্রথমবারের মতো জাকার্তা সফরে গিয়ে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুগিওনোর সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে বিশেষ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া বিষয়ক কর্মকর্তা আরিফিয়ান্তো সোফিয়ানতো জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অর্থনৈতিক বিষয় ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্ব পাবে। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, বৈঠকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।
তাইওয়ান ঘিরে নতুন উদ্বেগ
আগস্টের শুরুতে চীন ও ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলের কাছে বিরল যৌথ সামরিক মহড়া চালায়। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। ওই মহড়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল তাইওয়ান।
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, এটি ছিল নিয়মিত সামরিক অনুশীলনের অংশ। একই ধরনের মহড়া তারা চীন ছাড়াও জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরিচালনা করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক কুরি মহারানি মনে করেন, ইন্দোনেশিয়া মহড়াটিকে নিয়মিত অনুশীলন হিসেবে দেখলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান চীনকে আলাদা রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তার মতে, এই ঘটনা থেকে ইন্দোনেশিয়া বুঝতে পেরেছে যে বড় শক্তিগুলো প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে।
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়েও মতপার্থক্য
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়েও চীন ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ওই সাগরের প্রায় পুরো অংশের ওপরই বেইজিংয়ের দাবি রয়েছে।
২০২৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো চীন সফরকালে দুই দেশ সমুদ্রসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে একটি চুক্তি করে। সেখানে বিরোধপূর্ণ দাবির এলাকায় যৌথভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন বোঝাপড়ার কথা বলা হয়েছিল।
তবে চুক্তির ভাষা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এর মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরে জাকার্তা স্পষ্ট করে জানায়, তারা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ভূখণ্ডগত দাবি স্বীকার করে না।
ইন্দোনেশিয়া পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করে প্রতিরক্ষা কূটনীতির মাধ্যমে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চীনের বড় বিনিয়োগ, বাড়ছে ব্যবসায়িক অসন্তোষ
ইন্দোনেশিয়ায় চীন অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯০ কোটি ডলার।
তবে চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ঘিরে কিছু অসন্তোষও তৈরি হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কর বৃদ্ধি এবং নিকেলের মূল্য নির্ধারণে নতুন নীতির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, এসব নীতির কারণে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়তে পারে।
চীনা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইন্দোনেশিয়ায় অতিরিক্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নিয়মের অতিরিক্ত প্রয়োগ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও তুলেছে।
ইন্দোনেশিয়ায় চীনের বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং ইস্পাত উৎপাদনকারী সংস্থা। দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিকেল মজুত থাকায় এসব খাতে চীনা বিনিয়োগের গুরুত্ব অনেক বেশি।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও নিজেও স্বীকার করেছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশটির অতিরিক্ত অনুমোদন ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ করছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে তিনি নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে চায় জাকার্তা
প্রবোও বারবার বলেছেন, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন ও সক্রিয় থাকবে। কোনো শক্তিধর দেশের পক্ষ না নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই জাকার্তার লক্ষ্য।
তবে দক্ষিণ চীন সাগর, সামরিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মতো ইস্যুতে চীন ও ইন্দোনেশিয়ার স্বার্থের পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে শুক্রবারের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
চীন ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে গত পাঁচ বছরে যোগাযোগ ও সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা সহযোগিতার তুলনায় চীনের সঙ্গে সেই সম্পর্ক এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখাই এখন জাকার্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















