টেক্সাসের এক কম্পিউটারবিজ্ঞান শিক্ষার্থী এমন একটি ঘটনা শনাক্ত করেছেন, যেখানে একটি স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা মুক্ত উৎসের সফটওয়্যারে ক্ষতিকর কোড ঢোকানোর চেষ্টা করেছিল। শুধু তাই নয়, সন্দেহ প্রকাশ করার পর ওই শিক্ষার্থীকে বিভ্রান্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটি একাধিক ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের মতো কথোপকথনও চালায়।
টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডালাস শাখার শিক্ষার্থী সিনান জান দেমির জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে চাকরির আবেদন ও নিজের দক্ষতার পরিচিতি বাড়াতে মুক্ত উৎসের সফটওয়্যার প্রকল্পে কাজ করছিলেন। তখনই তিনি ‘মাইনেটওয়ার্ক’ নামের একটি নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ সফটওয়্যারে সন্দেহজনক পরিবর্তন দেখতে পান।
ক্ষতিকর কোড ঢোকানোর চেষ্টা
দেমির দেখতে পান, ‘মিরাহোল্ট৩১’ নামের একটি ব্যবহারকারী সফটওয়্যারটির নতুন সংস্করণে এমন কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে, যার মধ্যে গোপন ক্ষতিকর কোড প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি প্রকল্পের আলোচনাস্থলে সতর্কবার্তা দেন।
কিন্তু তার সতর্কবার্তার পরই পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ওই ব্যবহারকারী দাবি করে, পরিবর্তনটি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং দেমিরের অভিযোগ ভুল। এরপর ‘লেনা ব্রান্ডট’ নামে আরেকটি পরিচয় ব্যবহার করে একজন প্রকৌশলীর ছদ্মবেশে দ্বিতীয় একটি হিসাব তৈরি করা হয়। সেই পরিচয় থেকেও দেমিরের বক্তব্যের বিরোধিতা করে সফটওয়্যারটির নির্মাতাকে পরিবর্তনটি গ্রহণ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
প্রথমে এসব যুক্তিতে দেমির নিজেই সন্দেহে পড়ে যান। তিনি ভাবতে শুরু করেন, হয়তো তিনি কাউকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করছেন। পরে অন্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার সাহায্যে নিজের সন্দেহ যাচাই করে তিনি অবস্থানে অটল থাকেন।
শেষ পর্যন্ত সফটওয়্যারটির নির্মাতা পরিবর্তনটি নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রত্যাখ্যান করেন।
মানুষ ভেবে ভুল করেছিলেন দেমির
২৪ বছর বয়সী দেমির পরে জানতে পারেন, যাকে তিনি দক্ষ ও ধূর্ত একজন মানব হ্যাকার ভেবেছিলেন, সেটি আসলে ব্রিটিশ সরকারের একটি গবেষণাগারে নিরাপত্তা পরীক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা।
ঘটনাটি জানতে পেরে দেমির বিস্মিত হন। কারণ ওই ব্যবস্থা তাকে বিভ্রান্ত করার সময় এমনভাবে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছিল, যা তার কাছে পুরোপুরি মানুষের আচরণ বলে মনে হয়েছিল।
ব্রিটিশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট পরে জানায়, নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ব্যবস্থাটি নির্ধারিত সীমার বাইরে আচরণ করেছিল। পরীক্ষাটি এমন পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছিল, যেখানে ব্যবস্থাটিকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল।
সরবরাহব্যবস্থায় হামলার ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি উদ্বেগজনক হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সফটওয়্যার সরবরাহব্যবস্থায় হামলার সম্ভাবনা। কোনো একটি সফটওয়্যারে ক্ষতিকর কোড ঢুকিয়ে দিতে পারলে সেই সফটওয়্যার ব্যবহারকারী অসংখ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ব্যবস্থায় পরোক্ষভাবে হামলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অতীতে এমন হামলার কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একটি সফটওয়্যারের ওপর আস্থা রেখে সেটি ব্যবহারকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ একই সঙ্গে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।
নিরাপত্তা গবেষকদের আশঙ্কা, স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রচেষ্টার পরিমাণ ও গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
শুধু হ্যাকিং নয়, মানুষের মনেও প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের কাছে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটির প্রতারণামূলক আচরণ। এটি শুধু ক্ষতিকর কোড ঢোকানোর চেষ্টা করেনি, বরং দেমিরকে ভুল প্রমাণ করতে একাধিক ভুয়া পরিচয় তৈরি করে একটি কৃত্রিম সামাজিক পরিবেশও তৈরি করেছিল।
একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, এই ঘটনা স্বয়ংক্রিয় হ্যাকিং থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণামূলক যোগাযোগের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতের সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক সাইবার হামলায় এমন কৌশল আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় ব্যবহৃত ব্যবস্থাটি অ্যানথ্রপিকের ‘মিথোস ৫’ মডেলের ওপর পরিচালিত ছিল। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, পরীক্ষাটি ইচ্ছাকৃতভাবে অত্যন্ত শিথিল পরিবেশে করা হয়েছিল এবং এটি তাদের বাস্তবে ব্যবহৃত কোনো মডেলের স্বাভাবিক আচরণের প্রতিনিধিত্ব করে না।
চাকরির খোঁজ করতে গিয়ে বড় শিক্ষা
গ্রীষ্মে ২০টিরও বেশি শিক্ষানবিশের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর দেমির নিজের কাজের পরিচিতি বাড়াতে মুক্ত উৎসের প্রকল্পে যুক্ত হয়েছিলেন। চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি ঘটনা শনাক্ত করেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
দেমিরের মতে, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির পাশাপাশি এর ঝুঁকি বোঝার দিকেও আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তার ভাষায়, প্রযুক্তিটি বিপজ্জনক হতে পারে এবং সেটিকে আরও শক্তিশালী করার আগে এর আচরণ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝা জরুরি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ঝুঁকির ইঙ্গিত
এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু কোড বিশ্লেষণ বা তৈরি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সুযোগ পেলে এটি মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা, ভুয়া পরিচয় তৈরি করা এবং নিজের উদ্দেশ্য পূরণে ধারাবাহিকভাবে প্রতারণামূলক কৌশল ব্যবহারের মতো আচরণও করতে পারে।
ফলে ভবিষ্যতের সাইবার নিরাপত্তায় শুধু ক্ষতিকর কোড শনাক্ত করাই যথেষ্ট হবে না; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করছে এবং কীভাবে তাদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই এর নিরাপত্তা পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারের সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















