১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন স্কয়ারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দমনের ঘটনা স্মরণে প্রতিবছর মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করা হংকংয়ের দুই অধিকারকর্মীকে রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতে উসকানি দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। হংকংয়ের বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় তাদের বিরুদ্ধে এই রায় দেওয়া হয়।
দোষী সাব্যস্ত দুই অধিকারকর্মী হলেন ৬৯ বছর বয়সী লি চেউক-ইয়ান এবং ৪১ বছর বয়সী চাও হাং-তুং। তাদের সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এখনো সাজা ঘোষণা করা হয়নি। মামলার তৃতীয় আসামি, ৭৪ বছর বয়সী সাবেক আইনপ্রণেতা আলবার্ট হো চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করেন।
মানবাধিকারের নামে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, আসামিরা মানবাধিকারের কথা বলে কার্যত জাতীয় নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছেন। নিজের পক্ষে নিজেই আইনি লড়াই করা চাও হাং-তুং মে মাসে আদালতে বলেছিলেন, এই মামলায় মূলত আইনটিরই বিচার হওয়া উচিত।
হংকংয়ে একসময় চীনা ভূখণ্ডের মধ্যে খুব অল্প কয়েকটি জায়গার একটি ছিল, যেখানে মানুষ প্রকাশ্যে ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন হত্যাকাণ্ড স্মরণ করতে পারত। ওই বছর বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে গণতন্ত্রের দাবিতে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও ট্যাংক নামিয়ে অভিযান চালানো হয়।
২০২০ সাল থেকে স্মরণসভা বন্ধ
হংকং কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালে তিয়ানআনমেন স্মরণে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করে। সে সময় করোনা মহামারির বিধিনিষেধকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও এরপর আর এসব সমাবেশ ফিরিয়ে আনা হয়নি।
একই বছর হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হয়। এই আইনের আওতায় সরকারের বিরোধিতা ও বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে।
লি ও চাও ছিলেন বিলুপ্ত হংকং জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ১৯৮৯ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি তিয়ানআনমেনে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থনে গড়ে উঠেছিল।
তিন দশক ধরে জবাবদিহির দাবি
তিয়ানআনমেনের ঘটনার পর প্রায় তিন দশক ধরে সংগঠনটি চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে ওই অভিযানের জন্য দায় স্বীকার, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল।
২০২১ সালে সংগঠনটির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এরপর থেকেই লি ও চাও কারাগারে রয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই মামলার সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রক্ষমতা উৎখাতের মতো অপরাধের সংজ্ঞা আইনে অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তা ইচ্ছামতো প্রয়োগ করতে পারে।
তিয়ানআনমেনের ১৯৮৯ সালের অভিযানে কত মানুষ নিহত হয়েছিলেন, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
তিয়ানআনমেন স্মরণে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত দুই হংকং অধিকারকর্মীর এই দণ্ডাদেশ তাই শুধু একটি মামলার রায় নয়; বরং হংকংয়ে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করার সুযোগ কতটা সংকুচিত হয়েছে, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















