সংযুক্ত আরব আমিরাতে আবারও জরুরি সতর্কসংকেত বেজে উঠেছে। মঙ্গলবারের এই সতর্কবার্তা ছিল গত ১২ জুলাইয়ের পর প্রথম এমন জরুরি সতর্কতা। বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নিতে, জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকতে এবং খোলা জায়গা এড়িয়ে চলতে বলা হয়। প্রায় ১০ মিনিট পর সতর্কতা প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি নিরাপদ বলে জানানো হয়।
মুঠোফোনে হঠাৎ এমন সতর্কবার্তা ও তীব্র সংকেত শুনলে মনে হতে পারে, এটি সাধারণ খুদে বার্তার মতোই কোনো বার্তা। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে কাজ করে একটি বিস্তৃত জাতীয় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা।
সাধারণ খুদে বার্তা নয়
মুঠোফোনে পৌঁছানো এই সতর্কবার্তা সাধারণ খুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠানো হয় না। এর জন্য ব্যবহার করা হয় ‘সেল ব্রডকাস্ট’ প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতাধীন অসংখ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ মুঠোফোনে একই সময়ে সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব।
সাধারণ খুদে বার্তার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ফোন নম্বর ধরে বার্তা পাঠাতে হয়। কিন্তু সেল ব্রডকাস্টে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফোন নম্বর জানা প্রয়োজন হয় না। যে এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে, সেই এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা উপযুক্ত মুঠোফোনগুলোতেই বার্তাটি পৌঁছে যায়।
কয়েক সেকেন্ডেই পৌঁছে যায় সতর্কতা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সরকারি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, সতর্কবার্তা একটি মাত্র মোবাইল নেটওয়ার্ক এলাকা থেকে শুরু করে পুরো দেশের নেটওয়ার্কজুড়েও পাঠানো যেতে পারে।
জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালে জাতীয় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এই মোবাইল সতর্কতা চালু করে। এর লক্ষ্য হলো মানুষের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া, যাতে স্বাভাবিক মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের প্রভাব না পড়ে।
কেন এত তীব্র শব্দ হয়
জরুরি সতর্কতার সময় মুঠোফোনে যে বিশেষ শব্দ শোনা যায়, সেটি কোনো নির্দিষ্ট মুঠোফোন নির্মাতার তৈরি নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের জনসতর্কবার্তা পেলে মুঠোফোন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা নির্ধারিত থাকে।
জরুরি সতর্কতা সাধারণত আগে থেকেই সক্রিয় থাকে এবং ব্যবহারকারী তা বন্ধ করতে পারেন না। সতর্কবার্তা পর্দায় ভেসে ওঠার পাশাপাশি মুঠোফোন কেঁপে ওঠে এবং প্রায় সাড়ে ১০ সেকেন্ডের একটি বিশেষ জরুরি সংকেত বাজে। এমনকি মুঠোফোন নীরব অবস্থায় থাকলেও এই সংকেত কার্যকর হয়।
তবে সতর্কতা, মহড়া ও পরীক্ষামূলক বার্তার জন্য আলাদা শ্রেণি রয়েছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতি, সাধারণ সতর্কতা কিংবা মহড়ার মধ্যে পার্থক্য করা সম্ভব হয়।
এই ব্যবস্থা বিভিন্ন প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্কে কাজ করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট মোবাইল প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
মুঠোফোনে সতর্কতা আসার আগে কী ঘটে
মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পৌঁছানো পুরো প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ। এর আগে জাতীয় পর্যায়ে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে একাধিক স্তরের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে আগাম সতর্কতা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুতি বজায় রাখে।
অন্যদিকে জাতীয় জরুরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কতা ও জরুরি নির্দেশনা প্রচারের কাঠামো পরিচালনা করে।
১২ জুলাইয়ের ঘটনার পরও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, জাতীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দিনরাত কাজ করে এবং কোনো হুমকি দেশের নির্দিষ্ট এলাকায় আঘাত হানার সম্ভাবনা সীমিত হলেও সতর্কতামূলক বার্তা আগেভাগে পাঠানো হতে পারে।
সতর্কতা মানেই আঘাত নিশ্চিত নয়
মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পৌঁছানো মানেই সেই এলাকার ওপর কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো হুমকি নিশ্চিতভাবে আঘাত হানবে—এমন নয়।
বরং এই ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে হুমকি সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার আগেই মানুষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া যায়। একই সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে থাকে।
তবে সামরিক পর্যায়ে কোনো হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর ঠিক কীভাবে সেটি মূল্যায়ন করা হয়, কখন বেসামরিক জনগণকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এরপর কীভাবে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়—এই পুরো অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া জনসমক্ষে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
রাডার থেকে সরাসরি মুঠোফোনে নয়
উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, কোনো রাডার সরাসরি মুঠোফোনে সতর্কবার্তা পাঠায়—বিষয়টি এমন নয়।
বরং পুরো ব্যবস্থাটি কয়েকটি পৃথক স্তরে কাজ করে। প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে হুমকি শনাক্ত ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এরপর হুমকির মাত্রা মূল্যায়ন ও জরুরি সমন্বয় করা হয়। অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ সতর্কবার্তা জারির সিদ্ধান্ত নেয়। সবশেষে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মুঠোফোনে সেই সতর্কতা পৌঁছে দেয়।
সাধারণ মানুষের কাছে এই বিশাল ব্যবস্থার উপস্থিতি দৃশ্যমান হয় মূলত তখনই, যখন হঠাৎ মুঠোফোন কেঁপে ওঠে এবং বিশেষ জরুরি সংকেত বাজতে শুরু করে।
কিন্তু সাড়ে ১০ সেকেন্ডের সেই সংকেত শুরু হওয়ার আগেই সতর্কবার্তাটি একটি দীর্ঘ ও বহুস্তরীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছে। মুঠোফোন আসলে সেই পুরো ব্যবস্থার শেষ প্রান্ত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















