যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বুধবার এই মাইলফলকে পৌঁছায় বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। কয়েক দশক ধরে সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং করছাড়ের অর্থ জোগাতে ধার নেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তির ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
চলতি বছরেই যুক্তরাষ্ট্রের ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন ঋণ নেওয়ার পথে রয়েছে। এর বড় অংশ যাচ্ছে ইরান যুদ্ধের ব্যয়, সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি এবং ২০২৫ সালে রিপাবলিকানদের পাস করা ব্যাপক করছাড়ের অর্থ মেটাতে। একই সময়ে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। নতুন ঋণের প্রায় অর্ধেক ঘাটতির পেছনেই এখন সুদ ব্যয়ের ভূমিকা রয়েছে।
ঋণ বাড়ার পেছনে দ্বিদলীয় দায়
মার্কিন ঋণ সংকটের জন্য শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা কঠিন। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের আমলেই ঋণ বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রণোদনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সরকারের নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিক্রি করতে হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে তিনি আট বছরের মধ্যে জাতীয় ঋণ শেষ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এরপর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ দ্বিগুণ হয়েছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ব্যয় কমানো ও রাজস্ব বাড়ানোর জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগও প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। ইলন মাস্কের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সরকারি দক্ষতা উদ্যোগ এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত তাদের দাবি অনুযায়ী সাশ্রয় হয়েছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। সরকারি জবাবদিহি দপ্তর চলতি মাসে এই হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
শুল্ক ফেরত ও ইরান যুদ্ধেও বাড়ছে চাপ
আমদানি শুল্কের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনাও বড় ধাক্কা খেয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট কিছু শুল্ককে অবৈধ ঘোষণার পর সরকারকে কোম্পানিগুলোর দেওয়া আমদানি শুল্কের ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ফেরত দিতে হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট স্বীকার করেছেন, চলতি বছর বাজেট ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, ইরান যুদ্ধের সামরিক ব্যয়, শুল্ক ফেরত এবং গত বছরের করছাড়—সবই ঘাটতি বাড়াচ্ছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দামও বেড়েছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে ব্যবসায়ীদের কারখানা ও সরঞ্জাম নির্মাণের ব্যয় তাৎক্ষণিকভাবে কর থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় চলতি বছর প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব প্রভাব পড়তে পারে বলে হিসাব করেছে যৌথ কর কমিটি। তবে বেসেন্টের দাবি, এসব করছাড় ভবিষ্যতে উৎপাদনশীল সম্পদ ও অতিরিক্ত রাজস্ব তৈরিতে সহায়তা করবে।
বন্ড বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
ঋণ বাড়ার প্রভাব মার্কিন ট্রেজারি বাজারেও দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড ধরে রাখার জন্য বেশি সুদ দাবি করছেন। চলতি সপ্তাহে ৩০ বছরের মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদ প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এর ফলে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ থাকলেও দেশটির ট্রেজারি বাজার এখনো বিশ্বের সবচেয়ে গভীর ও তরল বাজারগুলোর একটি। ফলে হঠাৎ করে মার্কিন ঋণের ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তবে ফেডারেল রিজার্ভের নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বর্তমানে প্রায় ৬ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের সরকারি বন্ড ও বন্ধকভিত্তিক সিকিউরিটি রয়েছে। ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন এম. ওয়ার্শ এই সম্পদ কমানোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বছরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে পর্যালোচনা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা, মেডিকেয়ার ও মেডিকেইডসহ সামরিক ব্যয়ের চাপ অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনের মুখে আইনপ্রণেতারা বড় ধরনের ব্যয় কমানো বা কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে অনাগ্রহী। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মার্কিন সরকারের আয় থেকে ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় এবং বাজেটের বড় খাতগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়তে থাকায় দেশটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন দ্বিদলীয় নীতি কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট মার্গারেট স্পেলিংস।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















