ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কয়েক মাস পরও বড় প্রশ্ন উঠছে—সামরিক সাফল্য কি সত্যিই কৌশলগত বিজয়ে পরিণত হয়েছে? বাস্তবতা বলছে, যুদ্ধক্ষেত্রে কিছু সাফল্য মিললেও এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার পর ইরানকে ঘিরে সংঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের বীমা ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যায়। কয়েকটি নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান বিকল্প পথ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে শুরু করে। একই সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক অভিযান সফল হচ্ছে বলে দাবি করেছিলেন, সংঘাতটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে নিয়ে আসে। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য অর্জিত হলেও তার প্রভাব থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতি রেহাই পায় না।
সামরিক সাফল্য কেন কৌশলগত অর্জনে পরিণত হলো না

গত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক অর্জন কেন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধায় রূপ নিতে পারেনি, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ইচ্ছাকৃতভাবে শুরু করা যুদ্ধের ধারণার মধ্যে।
কোনো দেশ যখন সরাসরি অস্তিত্বের হুমকির মুখে না থেকেও সামরিক সংঘাতে জড়ায়, তখন সেই যুদ্ধের সাফল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ফল দিয়ে বিচার করা যায় না। কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন, অর্থনৈতিক ক্ষতি, মিত্রদের ওপর প্রভাব এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
ইরানের ক্ষেত্রে এই চারটি বিষয়ই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। শুরুতেই যদি যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকে, তাহলে সামরিক সাফল্যের মূল্য দ্রুত কমে যায়। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা সেই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
আঘাত ছিল ব্যাপক, কিন্তু ফল নির্ণায়ক নয়
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও অনুসন্ধান সক্ষমতা, সাইবার প্রযুক্তি এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার সমন্বয় ঘটিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে।
তবে সেই আঘাত পুরোপুরি একতরফা বা নির্ণায়ক ফল বয়ে আনেনি। ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের অবস্থান পিছিয়ে নেওয়া এবং একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার অব্যাহত রাখার খবরও দেখাচ্ছে যে প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালি হয়ে উঠেছে বড় চাপের জায়গা
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতাগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম পথ হওয়ায় এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই এর অর্থনৈতিক মূল্য বাড়ছে। যুদ্ধের লক্ষ্য যদি দ্রুত অর্জিত না হয়, তাহলে সামরিক শক্তির পাশাপাশি জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মিত্রদেশগুলোর অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ইরানের সামরিক সক্ষমতা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নয়। বরং এত বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য দিয়ে অর্জিত সামরিক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন মূল বিবেচনার বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















