পানি পানের পর বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় চা। বিশ্বজুড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ নিয়মিত চা পান করেন। আর চায়ের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে গত কয়েক দশকে শত শত গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, চায়ে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পলিফেনল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ যৌগ রক্তনালির স্বাস্থ্যে সহায়তা করতে পারে, প্রদাহ কমাতে পারে, শরীরকে শিথিল করতে পারে এবং অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্রিন, ব্ল্যাক, হোয়াইট ও উলং—সব ধরনের চা একই উদ্ভিদ ক্যামেলিয়া সিনেনসিস থেকে তৈরি। পাতার বয়স ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পার্থক্যেই মূলত এগুলোর স্বাদ, রং ও বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। অন্যদিকে ক্যামোমাইল, পুদিনা, হিবিস্কাস ও আদার মতো হারবাল চা তৈরি হয় বিভিন্ন ভেষজ, ফুল ও মসলা দিয়ে। এসব চায়ে সাধারণত ক্যাফেইন থাকে না।
দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক
চা পান ও দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় সবচেয়ে ধারাবাহিক যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা হলো—চা পানকারীরা চা না পানকারীদের তুলনায় কিছুটা বেশি দিন বাঁচতে পারেন। ২০২৩ সালে অ্যানালস অব ইন্টারনাল মেডিসিনে প্রকাশিত বড় এক গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রায় ৫ লাখ মানুষকে এক দশকের বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা দিনে দুই থেকে তিন কাপ চা পান করতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি খুব কম বা কখনোই চা না পান করা ব্যক্তিদের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম ছিল। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ মূলত ব্ল্যাক টি পান করতেন এবং প্রায় ৭ শতাংশ গ্রিন টি পান করতেন। তবে গবেষণাটি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করেনি; এটি কেবল একটি সম্পর্ক দেখিয়েছে।
হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির জন্য উপকারী
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, চা রক্তনালির কার্যকারিতা ও নমনীয়তা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। একটি গবেষণায় করোনারি ধমনির রোগে আক্রান্ত ৬৬ জনকে চার সপ্তাহ প্রতিদিন প্রায় তিন কাপ ব্ল্যাক টি পান করানো হয়। পরে একই ব্যক্তিদের শুধু পানি পান করানো হয়। ফলাফলে ব্ল্যাক টি পানের সময় রক্তনালির কার্যকারিতা উন্নত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ ছাড়া একাধিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস নিয়মিত ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি পান করলে রক্তচাপ সামান্য কমতে পারে।
বিপাকীয় স্বাস্থ্যেও সম্ভাব্য ভূমিকা
চা পান টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করবে—এমন প্রমাণ নেই। তবে এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের কিছু দিক উন্নত করতে পারে। ছোট পরিসরের কয়েকটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, ব্ল্যাক টি খাবারের পর রক্তে শর্করার আকস্মিক বৃদ্ধি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে আরেক গবেষণায় প্রতিদিন তিন কাপ ব্ল্যাক টি পানকারীদের শরীরে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণকারী নিয়ন্ত্রক টি-সেল বেড়ে যায়। একই সঙ্গে অনেক অংশগ্রহণকারীর সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিনের মাত্রাও কমে, যা শরীরে সংক্রমণ, আঘাত বা প্রদাহের মাত্রা বাড়লে বৃদ্ধি পায়।
অন্ত্রের উপকারী জীবাণু বাড়াতে পারে
ব্ল্যাক ও গ্রিন টি পলিফেনলের সমৃদ্ধ উৎস। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্ভিজ্জ যৌগ অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্ল্যাক টি পান করলে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বাড়তে পারে, যারা স্বল্প-শৃঙ্খল ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে। এসব যৌগ কোলনের সুরক্ষা, প্রদাহ কমানো এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন জিএলপি-১ নিঃসরণে ভূমিকা রাখে।
মনোযোগ ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় সহায়তা
চা ও কফি—দুটিতেই ক্যাফেইন রয়েছে, যা সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। তবে কফির তুলনায় চা ঘুমের ওপর তুলনামূলক কম নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি গবেষণায় ৩০ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে প্রতিদিন চার কাপ কফি অথবা চার কাপ ব্ল্যাক টি পান করতে দেওয়া হয়। দুই পানীয়ই সতর্কতা ও জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতায় একই ধরনের উন্নতি ঘটায়। তবে চা পানকারীদের রাতে ঘুমের ব্যাঘাত তুলনামূলক কম ছিল।
গ্রিন টি নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণা পর্যালোচনা করে বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, এটি উদ্বেগ কমাতে এবং স্মৃতি ও মনোযোগে সহায়তা করতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চায়ে থাকা এল-থিয়ানিনের কথা বলা হয়। এই অ্যামিনো অ্যাসিড মানসিক চাপ কমানো ও মেজাজ উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
চা নিয়ে গবেষণার এসব ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও সব গবেষণাই সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না। তাই চাকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা নিশ্চিত প্রতিরোধের উপায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















