ভেনেজুয়েলার নতুন পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী পাওলা হেনাও মার্কিন ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশটির তেল ও গ্যাস খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ভেনেজুয়েলা শুধু ভারী অপরিশোধিত তেলের জন্য পরিচিত একটি দেশ নয়; দেশটির স্থল ও সমুদ্রভাগে বিপুল পরিমাণ নতুন জ্বালানি সম্পদ এখনো অনাবিষ্কৃত ও অনুন্নত অবস্থায় রয়েছে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে এক জ্বালানি সম্মেলনে হেনাও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ভেনেজুয়েলায় ৯১৬টির বেশি অনুসন্ধান ও উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি নতুন তেলক্ষেত্রও রয়েছে। তাঁর হিসাবে, দেশটিতে প্রায় ১৯২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে প্রমাণিত তেলের মজুত ৩০ হাজার কোটি ব্যারেলেরও বেশি, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ।
‘আবিষ্কারের অপেক্ষায় পুরো একটি পৃথিবী’
হেনাও স্প্যানিশ ভাষায় বলেন, নতুন চুক্তি করে এসব এলাকায় উন্নয়ন শুরু করার অপেক্ষায় রয়েছে ভেনেজুয়েলা। তাঁর ভাষায়, এটি যেন আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা একটি পুরো পৃথিবী।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর শীর্ষ কর্মকর্তারাও মার্কিন বিনিয়োগকারীদের দেশটিতে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কোম্পানিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জোভান্নি মার্তিনেজ বলেন, ভেনেজুয়েলা বর্তমানে ইতিহাসের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রয়েছে, যখন বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করার সক্ষমতা দেশটির রয়েছে।
হিউস্টনের এই অনুষ্ঠানটি আগামী ফেব্রুয়ারিতে কারাকাসে অনুষ্ঠেয় বৃহত্তর ভেনেজুয়েলা জ্বালানি সপ্তাহের প্রস্তুতির অংশ।
পুরোনো আস্থার সংকট এখনো বড় বাধা
তবে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ফেরানো সহজ হবে না। কয়েক দশক ধরে দেশটি কখনো জ্বালানি খাত সংস্কার করেছে, আবার কখনো রাষ্ট্রায়ত্তকরণের পথে ফিরেছে। ২০০৭ সালে একাধিক বিদেশি কোম্পানির সম্পদ অধিগ্রহণের ঘটনাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অনাস্থা তৈরি করেছে।
মাদুরো সরকারের পতনের পর দেশটি আবারও জ্বালানি আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—আইন ও চুক্তির নিশ্চয়তা কতটা স্থায়ী হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ভেনেজুয়েলার ধসে পড়া জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই অপেক্ষা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ছোট মার্কিন কোম্পানিরাই আগে এগোচ্ছে
বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় ছোট ও বেসরকারি মার্কিন তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো অবশ্য ভেনেজুয়েলার বাজারে প্রবেশে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
হিউস্টনের অনুষ্ঠানের এক দিন আগে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসভিত্তিক হান্ট অয়েল এবং বড় তেলক্ষেত্র সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এসএলবির সঙ্গে নতুন উৎপাদন চুক্তি করেছে। হান্ট অয়েলের প্রধান নির্বাহী হান্টার হান্ট বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে পিডিভিএসএর সঙ্গে চুক্তি করা প্রথম দিকের মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হতে পেরে তারা গর্বিত।
এদিকে ডেনভারভিত্তিক ক্রসওভার এনার্জিও ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী এরিক ম্যাকক্র্যাডি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক ব্যয়বহুল শেল তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের চেয়ে ভেনেজুয়েলার পুরোনো এবং নতুন অনুসন্ধানযোগ্য তেলক্ষেত্রে সম্ভাবনা বেশি।
তিনি বলেন, ঝুঁকি নেওয়ার মাধ্যমে প্রথম সারিতে প্রবেশ করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বেশি তেলক্ষেত্র ও ব্যবসার সুযোগ পাওয়া যাবে।
জানুয়ারি থেকেই উৎপাদনের পরিকল্পনা
ক্রসওভার ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার একটি স্থানীয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে দেশটিতে নিজেদের কর্মী ও কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ম্যাকক্র্যাডির আশা, কয়েক দিনের মধ্যে অথবা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন উৎপাদন চুক্তি সই হতে পারে। আগামী জানুয়ারি থেকে ভেনেজুয়েলার কূপগুলো পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
তবে জুনে ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে সেই পরিকল্পনা কয়েক মাস পিছিয়ে গেছে।
ম্যাকক্র্যাডির মতে, ভেনেজুয়েলায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ভূগর্ভস্থ তেলসম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং শ্রমিক, যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোর ঘাটতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশটির বিদ্যুৎব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অবকাঠামো তৈরি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আইন ও চুক্তির নিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট করা জরুরি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আবারও ৩০ লাখ ব্যারেলের পথে?
ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন গত বছর যেখানে ১০ লাখ ব্যারেলের সামান্য নিচে ছিল, এখন তা বেড়ে ১২ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছে। দৈনিক প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল উৎপাদন বেড়েছে, যার বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান কূপগুলোর উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে।
তবে নতুন করে ব্যাপক হারে কূপ খনন বা নতুন উৎপাদন অবকাঠামো স্থাপনের মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি এখনো ঘটেনি।
একসময় ভেনেজুয়েলার দৈনিক তেল উৎপাদন ৩০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি ছিল। শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশটির উৎপাদন ওই পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং এক দশক আগেও দৈনিক উৎপাদন ২০ লাখ ব্যারেলের ওপরে ছিল।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্টাড এনার্জির অংশীদার সাইমন স্যোথুন মনে করেন, বিশ্বের তেলের চাহিদা দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে ভেনেজুয়েলার তেলের প্রয়োজন আবার বাড়বে। তাঁর ধারণা, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশটি দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি উৎপাদনে ফিরতে পারে।
তবে ক্রসওভারের প্রধান নির্বাহী আরও আশাবাদী। তাঁর মতে, মাত্র পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার দৈনিক উৎপাদন ৩৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছানো সম্ভব।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক তেল উত্তোলন প্রযুক্তি ভেনেজুয়েলায় ব্যবহার করা গেলে উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, প্রায় ২৫ বছর ধরে বিশ্ব জ্বালানি মঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর ভেনেজুয়েলার সামনে এখন বিপুল সম্ভাবনার দরজা খুলছে।
সঠিক আইনি কাঠামো এবং মার্কিন বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ৩৫ লাখ ব্যারেলের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ১৫ বছরও লাগবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















