চীনের আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অন্যতম প্রতীক এভারগ্রান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হুই কা ইয়ানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। বৃহস্পতিবার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনঝেনে দেওয়া এ রায়ে একসময় এশিয়ার শীর্ষ ধনী হিসেবে পরিচিত এই ব্যবসায়ীর উত্থান-পতনের নাটকীয় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। তবে এই সাজা এভারগ্রান্ডের বিপুল দেশি-বিদেশি ঋণদাতাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
হুই এপ্রিলে অর্থ আত্মসাৎ, তহবিল সংগ্রহে জালিয়াতি, অবৈধভাবে জনগণের আমানত গ্রহণ, বেআইনি ঋণ বিতরণ, প্রতারণামূলকভাবে সিকিউরিটিজ ইস্যু এবং ঘুষসহ আটটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন। আদালত তার সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দিয়েছে।
আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ
আদালত বলেছে, এভারগ্রান্ড, এর প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেংদা রিয়েল এস্টেট এবং হুই কা ইয়ানের অপরাধের সঙ্গে বিপুল অর্থ জড়িত ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এবং সমাজে গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। তাই আইন অনুযায়ী তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।
হুইয়ের সাজা ছাড়াও এভারগ্রান্ডকে ৮৮২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ১৩১ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছে। হেংদা রিয়েল এস্টেটকে জরিমানা করা হয়েছে ৭০০ কোটি ইউয়ান। প্রতিষ্ঠানটির আরও পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ছয় থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, হুই ছাড়া এভারগ্রান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৫৬ জনকে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
ঋণ, ক্ষতি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ
এভারগ্রান্ড একসময় চীনের সবচেয়ে বড় আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু বিপুল ঋণের ওপর নির্ভর করে দ্রুত সম্প্রসারণের পর প্রতিষ্ঠানটি সংকটে পড়ে। বর্তমানে এর মোট দায় প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার, যার বড় অংশই পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। কোম্পানিটির পতন চীনের আবাসন খাতের গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে।
এভারগ্রান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনা পণ্য থেকে অর্থ ফেরত না পাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ হারান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভারগ্রান্ডের কিছু গ্রাহক প্রশ্ন তুলেছেন—তাদের অর্থের কী হবে।
উত্থান থেকে পতন
হুই কা ইয়ান ১৯৯৬ সালে এভারগ্রান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। চীনের হেনান প্রদেশের একটি গ্রামীণ এলাকায় দাদির কাছে বড় হওয়া হুই আগে ইস্পাত কারখানায় প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করতেন। পরে আগ্রাসী ঋণনির্ভর ব্যবসায়িক কৌশলে এভারগ্রান্ডকে চীনের শীর্ষ আবাসন কোম্পানিতে পরিণত করেন।
২০১৭ সালে ফোর্বসের হিসাবে তার সম্পদের পরিমাণ ৪৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা তাকে তখন এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বানিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২০২৩ সালে কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করার পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
২০২৪ সালে হংকংয়ের একটি আদালত এভারগ্রান্ডকে অবসায়নের নির্দেশ দেন। পরের বছর হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে কোম্পানিটির শেয়ার তালিকাচ্যুত হয়। অবসায়ন প্রক্রিয়াও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। গত আগস্ট পর্যন্ত মাত্র প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব হয়েছিল, যেখানে ঋণদাতাদের দাবির পরিমাণ প্রায় ৪৫০০ কোটি ডলার।
এদিকে চীনের বাইরে এভারগ্রান্ডের অবসায়করা হুই ও তার সাবেক স্ত্রীর বিদেশি সম্পদ আটকে দেওয়ার জন্য আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। কোম্পানির সাবেক কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের লভ্যাংশ ও পারিশ্রমিক উদ্ধারের চেষ্টাও চলছে।
এর আগে ২০২৪ সালে চীনের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক এভারগ্রান্ডের প্রধান ইউনিটের বিরুদ্ধে আয় ফুলিয়ে দেখানো ও সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগে হুইকে ৬৬ লাখ ডলার জরিমানা করে এবং আজীবনের জন্য সিকিউরিটিজ বাজারে নিষিদ্ধ করে।
এভারগ্রান্ডের পতনের মধ্য দিয়ে চীনের ঋণনির্ভর আবাসন ব্যবসার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হুই কা ইয়ানের যাবজ্জীবন সাজা সেই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সামনে এলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















